—প্রতীকী চিত্র।
‘কংগ্রেসের রাজপুত্র’!
বৃষ্টির মতো তির উড়ে আসছে গেরুয়া শিবির থেকে। কোনওটায় লেখা ‘পাকিস্তানের চর’, কোনওটায় ‘মুসলিম তোষণকারী’ আর কোনওটায় লেখা ওই, ‘কংগ্রেসের রাজপুত্র’।
‘রাজপুত্র’ বলে হিমন্তবিশ্ব শর্মাদের আক্রমণের নিশানা যখন গৌরব গগৈ, তখন ‘রাজা’ বলতে যে তাঁর পিতা, অসমের প্রয়াত কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈকে বোঝানো হচ্ছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তা সেই ‘রাজা’ গত হলেও তাঁর জন্মভিটের রাজ্যপাট ২৫ বছর অক্ষতই ছিল। অবশ্য, বাবার বিদ্রোহী সৈনিক হিমন্ত রাজ্য ছিনিয়ে নিয়েছেন দশ বছর হল। পুত্র কিন্তু লড়ে চলেছেন। ছাব্বিশের যুদ্ধে নিজের কেন্দ্রে জয়ের সঙ্গে বাবার বিধানসভা কেন্দ্র বেহাত হতে না দেওয়াও গৌরবের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
অসম প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি তথা লোকসভায় কংগ্রেসের উপ-দলনেতা গৌরবের সময় গিয়েছে দল থেকে বিদ্রোহী ও গুপ্তচরদের খুঁজে বার করতে। গত ভোটে ১০ দলের মহাজোট গড়েও লাভ হয়নি। এ যাত্রায়, অন্তিম পর্বে ৬ দলের জোট গড়া হয়েছে বটে, কিন্তু হিমন্তের সঙ্গে টক্করে গৌরবই আসল মুখ।
বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে আসা পুত্র গৌরবকে যে দিন থেকে রাজ্য রাজনীতিতে এনেছিলেন তরুণ গগৈ, তখন থেকেই হিমন্ত বুঝে যান, তাঁর দক্ষতা যতই থাক, রাজ্যপাট হয়ত গৌরবই ছিনিয়ে নেবেন। অসমের রাজনীতিতে কান পাতলে শোনা যায়, ২০১৫ সালে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে আসা ও ২০১৬ সালে রাজ্যে পালাবদলের মূল কান্ডারি হিমন্তের সঙ্গে গৌরবের যুদ্ধটা কংগ্রেস-বিজেপির লড়াইয়ের চেয়েও বেশি ব্যক্তিগত লড়াই।
লোকসভা ভোটে গৌরবকে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও হারাতে পারেননি হিমন্ত। কিন্তু রাজ্যের যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে এ বার গৌরব যোরহাট বিধানসভা আসনে প্রার্থী হয়েছেন, যেখানে পাঁচ বারের বিধায়ক, বিজেপির হিতেন্দ্রনাথ গোস্বামী তাঁর শক্ত প্রতিপক্ষ। গৌরব ও হিতেন্দ্র অবশ্য আগেই জানিয়েছেন, এই কুরুক্ষেত্রে তাঁদের লড়াই হবে অর্জুন এবং ভীষ্মের মতোই সম্মান এবং শ্রদ্ধা বজায় রেখে। গৌরব বলেন, “পিতামহ ভীষ্মের মতো হিতেন্দ্রকে প্রণাম করে, আশীর্বাদ নিয়েই তাঁকে হারানোর লড়াইতে নেমেছি।” গোটা যোরহাটে কোনও রাজনৈতিক পোস্টার চোখে পড়ে না। দুই নেতাও কেউ কারও বিরুদ্ধে কুশব্দ ব্যবহার করেননি।
হিতেন্দ্রর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, প্রচুর কাজ করা এবং জনপ্রিয়তার বিরুদ্ধে গৌরবের লড়াই কঠিন। গৌরব অবশ্য যোগ্য সেনাপতির মতোই নিজের নয়, বিরোধী ঐক্যের জয় নিয়ে ভাবছেন। তিনি বলেন, “অনেক সংবেদনশীল বিষয় সামলে ৬ দল এক হয়েছি। এ বার আমাদের জোট অনেক জোরদার। প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়াও অনেক বেশি। টাকা ছড়িয়ে সরকার ধরে রাখার চেষ্টা করছে বিজেপি। কিন্তু মানুষ বুদ্ধিমান। তাঁরা সরকারের টাকাও নেবেন, আবার বিবেক ও বিবেচনা অনুযায়ী ভোটও দেবেন।
গৌরবকে ‘পাকিস্তানের চর’ বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বিরুদ্ধে সিট-এর তদন্ত প্রতিবেদনও কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে। গৌরব সে সব উড়িয়ে বলছেন, “হিমন্তের আতঙ্ক স্পষ্ট। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বেফাঁস, লঘু মন্তব্য করছেন। মানুষ তাই তাঁকে আর মুখ্যমন্ত্রী পদের যোগ্য মনে করে না। গত ১০ বছরে বিজেপি যত না বিদেশি তাড়িয়েছে, কংগ্রেস আমলে তাড়ানো হয়েছে তার অনেক বেশি। ইউপিএ আমলেই সীমান্তে বেড়া হয়, এনআরসি শুরু হয়।” প্রয়াত গায়ক জ়ুবিন গর্গও যোরহাটের মানুষ ছিলেন। তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী আবেগও সরকারের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে চান গৌরবরা।
হিমন্তের সঙ্গে যুদ্ধে গৌরব এখনও তুলে ধরেন পিতৃপরম্পরাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গেই চেহারায় আসছে বাবার আদল। গৌরব বলেন, ‘‘বাবা যাঁকে পুত্রসম দেখতেন, সেই হিমন্তই বাবার পিঠে ছুরি মেরেছেন। মানুষ দেখছে, হিমন্ত কী ভাবে দলবদল, ভয় ও ভ্রষ্টাচারের রাজনীতি চালাচ্ছেন। আমি, সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা তরুণ গগৈয়ের আদর্শে চলে অসমে ফের স্বচ্ছ, সুশীল রাজনীতির ঐতিহ্য ফেরাতে চাইছি।’’
কিন্তু যোরহাট জেলাতে তরুণ গগৈয়ের ভিটে তিতাবর কেন্দ্রও ছিনিয়ে নিতে কোমর বেঁধেছে বিজেপি। সীমানা পুনর্বিন্যাসের পরে সেখানে এখন চা বাগানের ভোটই বেশি। তাই দুই দলই বাগানের প্রতিনিধিকে প্রার্থী করেছে। রাগে কংগ্রেসের বর্তমান বিধায়ক ভাস্করজ্যোতি বরুয়া দল ছেড়ে নির্দল হয়ে লড়তে নেমেছেন। অসমিয়া ভোটের বড় অংশ তিনি পেতে পারেন। ভোট কাটার জেরে তিতাবরও হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় আছে কংগ্রেস।
অবশ্য, অসমের রাজনৈতিক ঐতিহ্যে ধর্ম বনাম রাষ্ট্রের মতোই ব্রাহ্মণ্যবাদ বনাম আহোমদের দ্বন্দ্বের চোরাস্রোত বহমান। দীর্ঘ ব্যবধানে এক ব্রাহ্মণসন্তান অসমের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু হিমন্ত যে ভাবে আহোমসন্তান গৌরবকে পাকিস্তানের চর বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং সর্বানন্দ সোনোয়ালকে সরিয়ে গদি দখল করেছেন, তা আহোমদের ক্ষুব্ধ করেছে। সেই আহোম আবেগও গৌরবের বড় হাতিয়ার।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে