প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
ভারতীয় বিমান চলাচল নিয়ামক সংস্থা ডিজিসিএ (ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন) মার্কিন বিমান নির্মাতা সংস্থা বোয়িং-এর কারখানায় জ্বালানি (ফুয়েল) সুইচ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংবাদসংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়ে বলেছে, আমেরিকার সিয়াটলে বোয়িং-এর দফতরে ওই বিশেষ পরীক্ষার আয়োজন করা হচ্ছে।
গত বছরের ৩১ জুলাই লন্ডন বিমানবন্দর থেকে উড়ানের আগে এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তার আগে ১২ জুন গুজরাতের আমদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার (ফ্লাইট এআই১৭১) বিমান দুর্ঘটনায় মোট ২৬০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সে ক্ষেত্রেও রিপোর্টে সামনে এসেছিল ফুয়েল সুইচে সমস্যার কথা।
আমদাবাদ-কাণ্ডের পরে তদন্তকারী সংস্থা এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি) ১৫ পাতার যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তাতে দুর্ঘটনার মুহূর্তে ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে কী কথা হয়েছে, তার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে এক পাইলট বলছেন, ‘‘কেন তুমি বন্ধ (জ্বালানি সুইচ) করে দিলে?’’ জবাবে আর এক জন বলছেন, ‘‘আমি কিছু বন্ধ করিনি।’’ এয়ার ইন্ডিয়ার এই বিমানটিতে ক্যাপ্টেন ছিলেন সুমিত সবরওয়াল (৫৬)। কো-পাইলট ছিলেন ক্লাইভ কুন্দর (৩২)। দু’জনেই দুর্ঘটনার মারা গিয়েছিলেন। কে কাকে ওই প্রশ্ন করেছিলেন আর কে উত্তর দিয়েছিলেন, তা স্পষ্ট নয় রিপোর্টে। কিন্তু, বিমান বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত, কোনও সুস্থ, স্বাভাবিক চালক ওড়ার সময় ওই জ্বালানি সুইচ বন্ধ করে দেবেন না কখনওই। এটা সম্ভব নয়।
সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে এক পাইলট বলেন, ‘‘ভুল করেও জ্বালানি সুইচের অবস্থান বদল সম্ভব নয়। এর একটা পদ্ধতি রয়েছে।’’ ওই বিমানচালক জানান, বিমানের ইঞ্জিনে জ্বালানি যাবে কি যাবে না, তা নিয়ন্ত্রিত হয় জ্বালানি সুইচ দিয়ে। এই সুইচের দু’টি অবস্থান হয়। একটিকে বলে ‘রান’। অন্যটি ‘কাট অফ’। সুইচ ‘রান’-এ নিয়ে যাওয়া মানে ইঞ্জিনে জ্বালানি যাবে। আর ‘কাট অফ’-এর অর্থ ইঞ্জিনে জ্বালানি পৌঁছোনো বন্ধ হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে জ্বালানি সুইচ দাগ দিয়ে চিহ্নিত করা থাকে। সুইচের অবস্থান বদলের আগে সেটি টানতেও হয়। ফলে দুর্ঘটনাবশত সুইচের অবস্থা বদলাতে পারে না বলেই মত ওই বিমানচালকের।
জ্বালানি সুইচের উপরেই থাকে ‘থ্রাস্ট লিভার’। বিমানচালক বলেন, ‘‘থ্রাস্ট লিভার হল গাড়ির অ্যাক্সিলারেটর প্যাডেলের মতো। যত খুলবেন, তত গতি বাড়বে। বিমানে ইঞ্জিন চালু করার দু’টি ধাপ হয়। প্রথমে স্টার্ট সিলেক্টর ‘অন’ করতে হয়। তার পর চালু করা হয় জ্বালানি সুইচ।’’ বিমানের ইঞ্জিন চালু হওয়া মানে একসঙ্গে অনেক কিছু ঘটতে শুরু করে। ইঞ্জিন চলছে মানে ইঞ্জিনে জ্বালানি পৌঁছোচ্ছে। তখন ‘থ্রাস্ট লিভার’ নীচের দিকে নামানো থাকে। অর্থাৎ, গতি কম থাকে। ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। বিমানচালক বলেন, ‘‘বিমান যখন মাটি ছেড়ে উড়তে শুরু করে, টায়ারে থাকা সেন্সর জানান দেয়, বিমানটি এখন হাওয়ায় রয়েছে। সেই সময় পাইলটের ‘গিয়ার আপ’ বলার কথা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যে কথোপকথনের রিপোর্ট প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে পাইলটকে ‘গিয়ার আপ’ বলতে শোনা যায়নি। কেন গিয়ার লিভার নীচে নামানো ছিল? সম্ভবত গিয়ার আপ করতে গিয়েই জ্বালানির সুইচ কাট অফ করা হয়েছিল।’’
বিমানচালকের অনুমান, তখনই অন্য জন জিজ্ঞাসা করেন, ‘কেন বন্ধ করলে এটা?’ বিষয়টা বুঝতে পেরে সুইচ অন করা হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু তত ক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, পাইলটেরা সেই মুহূর্তে দু’টি জ্বালানির সুইচই আবার ‘কাটঅফ’ থেকে ‘রান’-এ নিয়ে এসেছিলেন। ইঞ্জিন চালু করার মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। ইঞ্জিন-২ সাময়িক ভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরেওছিল। কিন্তু ইঞ্জিন-১ আর চালু করা যায়নি। ঠিক কী কারণে জ্বালানির সুইচ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তা জানতেই এ বার বোয়িং-এর দফতরে যাচ্ছেন ডিজিসিএ-র বিশেষজ্ঞেরা।