অমর একুশে

মাতৃভাষা নিয়ে লিখতে বসেছি। না, কোনও তত্ত্বকথার মধ্যে যাব না। মনের আবেগ জড়ো করেই আজ মাতৃভাষার জয়গান গাইব। জন্মেছি কলকাতায় ঠিকই, কিন্তু শৈশবকাল যাকে বলে, তা কাটিয়েছি এক পাড়াগাঁয়ে। সেটি নিতান্ত ‘অজ’ পাড়াগাঁ না হলেও এমন এক গ্রাম তো বটেই, যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ছিল মাটির, যেখানে ছিল না স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ছোট ছেলেমেয়েদের অসুখে ভরসা ছিল প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের হাতযশ। ছেলেবেলায় ঠাকুমাকে বলতে শুনেছি, মিহির ডাক্তার হল গিয়ে দেবতা। ওঁকে দেখলেই রোগ পালায়। আর একজন অ্যালোপ্যাথি ডাক্তার অবিশ্য ছিলেন আমাদের পাশের পাড়ায়। তবে ওঁর পাগলা ডাক্তার নামেই পরিচিতি ছিল বেশি। ছোটদের অসুখ বিসুখে লোকে মিহির ডাক্তারকেই ভরসা করত। আর রাতবিরেতে কারও কিছু হলে তো কথাই নেই, সকাল হওয়া অবধি অপেক্ষা। না আছে গাড়ি, না আছে ঘোড়া। আছে সাইকেল রিক্সো, তা-ও সকালের আগে যার দেখা পাওয়া? নৈব নৈব চ। গাঁ থেকে স্টেশন বা বাস রাস্তা প্রায় দু’তিন কিলোমিটার করে দূর। টেলিভিশন ছিল না, ফ্রিজ ছিল না, ফোন ছিল না। এমনই অপ্রতুলতার মধ্যেই বড় হয়ে ওঠা আমাদের।মাতৃভাষা নিয়ে লিখতে বসেছি। না, কোনও তত্ত্বকথার মধ্যে যাব না। মনের আবেগ জড়ো করেই আজ মাতৃভাষার জয়গান গাইব। জন্মেছি কলকাতায় ঠিকই, কিন্তু শৈশবকাল যাকে বলে, তা কাটিয়েছি এক পাড়াগাঁয়ে। সেটি নিতান্ত ‘অজ’ পাড়াগাঁ না হলেও এমন এক গ্রাম তো বটেই, যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ছিল মাটির, যেখানে ছিল না স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ছোট ছেলেমেয়েদের অসুখে ভরসা ছিল প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের হাতযশ। ছেলেবেলায় ঠাকুমাকে বলতে শুনেছি, মিহির ডাক্তার হল গিয়ে দেবতা। ওঁকে দেখলেই রোগ পালায়।

Advertisement

পারমিতা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:৪২
Share:

তবু বেড়ে ওঠার (শুধু শরীরে নয়, মনেও) উপকরণের কোন অভাব ছিল না। বেড়ানোর জন্য ছিল আম, জাম, কাঁঠাল, জামরুল, বট, অশ্বত্থ গাছে ছাওয়া মাটির রাস্তা, যে রাস্তা বর্ষায় তার খেল দেখাত – কাদায় জুতো যেত আটকে। ছিল অবারিত মাঠ, ধানক্ষেত – মাথার ওপর ছাদ অনন্ত আকাশ। আর ছিল অজস্র পাখি, পুকুরের মাছ, গোয়ালের গাভি – তার তিড়িং তিড়িং করে খেলে বেড়ানো বাছুর, যে বাছুরের কপালে লোমের মাঝে হাত বুলিয়ে আদর করতাম। সন্ধে নামলে বাড়ির উঠোনে তুলসীতলায় ঠাকুমা প্রদীপ দেখাতেন। অন্ধকারে রান্নাঘরের টালির চালের ওপর ঝুঁকে আসা আমগাছটাকে দেখে কেমন ভয় ভয় করত। মনে মনে আওড়াতাম, ‘ভূত আমার পূত, পেত্নী আমার ঝি, রাম লক্ষ্মণ বুকে আছে, করবি আমার কি?’

Advertisement

আরো একটু রাত বাড়লে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক আর মাথার ওপর এক আকাশ তারার চাঁদোয়া। এই ছিল আমার ছোটবেলার গ্রাম – গ্রামবাংলা – বাংলার গ্রাম। রূপসী বাংলার এই রূপ দেখেই কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন,

‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ

Advertisement

খুঁজিতে যাই না আর; অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে

চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে ব’সে আছে

ভোরের দোয়েল পাখি – চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ

জাম – বট – কাঁঠালের – হিজলের – অশ্বত্থের ক’রে আছে চুপ;’

কিংবা এই কবিতাটা

‘আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে – এই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয় – হয়তো বা শংখচিল শালিখের বেশে;

হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে

কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়ায়;’

এই রূপসী বাংলার গ্রাম থেকে তুলে নেওয়া কত রূপকল্প ছড়িয়ে আছে তাঁর কবিতায়। সজনে ফুল, আকন্দ, আম, জাম, বট, হিজলের মায়াময় আবেশে ভরে ওঠে মন। এই সোনার বাংলা ছাড়া আর কোথায় পাব মায়ের হাতের স্পর্শ। এই গ্রামবাংলায় কাটিয়েছি শৈশব। প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শুরু হয়েছে গ্রামের একপাশে মাটির প্রাথমিক স্কুলে। প্রথমে বাংলা, অংক, ইতিহাস ভূগোলের পাঠ। না, ঐ স্কুলে ইংরেজি শিখি নি আমরা। আমরাই ছিলাম প্রথম যাদের সময় প্রাথমিক শিক্ষার পর্যায়ে ইংরেজি তুলে দেওয়া হয়েছিল। এখন বাবা মায়েরা যা কল্পনাতেও আনতে পারবেন না। তা সে যাই হোক, পুরনো ক্ষত খুঁচিয়ে লাভ নেই কিছু। কালে দিনে সব ক্ষতর ওপরেই প্রলেপ পড়ে। এও হতে পারে যে বাড়তি একটা ভাষার বোঝা বইতে হয় নি বলে বাংলা অর্থাৎ মাতৃভাষাটাই হৃদয় জুড়ে ছিল। ক্লাস টু বা থ্রিতে যখন পড়ি অটল স্যার বাংলা পড়াতেন আর চাচা স্যারের কাছে আমরা শিখতাম বাংলা অক্ষর মকশো করা। কি সুন্দর বাংলা হাতের লেখা ছিল ওঁর। স্যারেদের কাছে গল্পের ছলে পড়া শুনতে শুনতে মনটা কেমন উদাস হয়ে যেত। ঢুকে যেতাম বিষয়ের মধ্যে। এ কি স্যারেদের পড়ানোর গুণ না কি মাতৃভাষার গুণ না কি দুটোই ছিল! স্কুলে ভর্তির আগে থেকেই বই পড়ার নেশা ছিল; যা গল্পের বই পেতাম হাতের কাছে, গোগ্রাসে গিলতাম। অবশ্যই বাংলা বই।

আজ কতদূরে...যে মাটিতে বড় হয়েছি, বেড়ে উঠেছি...সেই মাটি থেকে আজ আমরা কতদূরে। চারপাশে নানা ভাষাভাষীর মানুষের ভিড়। তবু নিজের মাতৃভাষাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কি অসীম প্রচেষ্টা তাদের! আছি আমরাও তাদের দলে। আমাদের নিজের ভাষাটিকে আঁকড়ে ধ’রে। বাড়িতে বাংলায় কথা বলি, বাংলায় লিখি। ছেলেমেয়েরা হয়তো কিছুটা মিশ্র সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে যায়। ওদের দোষ দিই না। ওরাই বা কি করবে। স্কুলে, খেলার জায়গায় – সবখানেই তো বিবিধের মাঝে ঐক্যের সন্ধান করে ফেরা। তবু যতটা সম্ভব বাংলা সংস্কৃতির মুখোমুখি বসাই তাদের - বাংলা গান, বাংলা নাটক, বাংলা ভাষা শিক্ষা – শিকড়টা যেন কোনমতেই হারিয়ে না যায়। শিকড় হারিয়ে গেলে মাটি থেকে জল টেনে নেবে কি করে, তখন যে শুকিয়ে মরতে হবে! ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’।

মাতৃভাষার সঙ্গে আমাদের নাড়ির টান, আত্মার যোগ। এই ভাষায় প্রথম কথা বলতে শিখেছি। এই ভাষাই প্রথম আমাদের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছে সারা পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডার। আমরা যেন অকৃতজ্ঞ না হই। মাতৃভাষাকে যেন ভুলে না যাই। আসুন গলা মেলাই এই কবিতাটির সঙ্গে; মেহবুব আলম চৌধুরির একুশের প্রথম কবিতা।

‘এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে রমনার ঊর্ধমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলে

যেখানে আগুনের ফুলকির মত এখানে ওখানে জ্বলছে অসংখ্য রক্তের ছাপ

সেখানে আমি কাঁদতে আসি নি।

আজ আমি শোকে বিহ্বল নই,

আজ আমি ক্রোধে উন্মক্ত নই,

আজ আমি প্রতিজ্ঞায় অবিচল...।

......সেইসব শহীদ ভাইরা আমার

যেখানে তোমরা প্রাণ দিয়েছ,

যেখানে হাজার বছর পরেও সেই নিস্তব্ধতার মধ্য থেকে

তোমাদের কন্ঠস্বর স্বাধীনতার বলিষ্ঠ চীৎকার ভেসে আসবে।

তোমাদের আশা অগ্নিশিখার মত জ্বলবে

প্রতিশোধ এবং বিজয়ের আনন্দে।’

কেন মাতৃভাষা নিয়ে লিখছি, তার একটা কারণ তো আছে নিশ্চই। আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এর অন্তরালে যে ইতিহাস রক্তের অক্ষরে লেখা হয়ে রয়েছে তার কিছুটা পরিচয় আমরা পেয়েছি উপরের কবিতাটিতে।

১৯৪৭ সাল। বহু সংগ্রামের পর এল কাংখিত স্বাধীনতা। কিন্তু আমাদের ভারতবর্ষ ভেঙে হল তিন টুকরো। ভাগের মা। পশ্চিম পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তান ও ভারত। পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ অধুনা বাংলাদেশ। ১৯৪৮ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে মহম্মদ আলি জিন্নাহ ঘোষণা করলেন যে, পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের অফিসিয়াল ভাষা হবে উর্দু। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা, রীতি নীতি, আচার ব্যবহার – সব কিছুই আলাদা। জোর করে যদি কেউ এই দুই ভূখণ্ডকে এক করতে চায়, জোর করে এক ভূখণ্ডের ভাষা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে সেটি কে-ই বা মেনে নিতে পারে। হলও তাই। বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠল পূর্ব পাকিস্তান। মাতৃভাষা বাংলার জন্য এই আন্দোলন চলল কয়েক বছর ধরে। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পুলিস জারি করল কার্ফু ও ১৪৪ ধারা। ওই সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি অনেক মানুষ প্রধানত ছাত্ররা একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করে ঢাকা শহরে। কিন্তু এই সমাবেশে মানুষকে ছত্রভঙ্গ করতে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। অনেক প্রাণ ঝরে যায় অকালে। মৃত্যু হয় বেশ কিছু ছাত্রের। এরপরই আগুন জ্বলে ওঠে। আওয়ামি মুসলিম লীগের নেতৃত্বে শুরু হয় লাগাতার বিরোধিতা। অবশেষে ১৯৫৬ সালে পশ্চিম পাকিস্তান মেনে নেয় তাদের দাবি। বাংলা ভাষাকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। প্রাণের মূল্যে বাঙালি আদায় করে নেয় তার মাতৃভাষার দাবি। মাতৃভাষার জন্য বাঙালির এই আত্মত্যাগ বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা দেয়। ইউনেস্কো দুহাজার সাল থেকে এই দিনটিকে অর্থাৎ ২১শে ফেব্রুয়ারিকেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশের ঢাকা শহরে মেডিক্যাল কলেজের কাছে বাংলা ভাষা শহিদদের উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে শহিদ মিনার – মনুমেন্ট।

আমরাও গর্ববোধ করি বাঙালি হিসেবে যে বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, যে ভাষার স্বীকৃতি আদায়ের জন্য লড়াই করেছে একটা দেশ। মাতৃভাষা, নিজের দেশ, নিজের মাটি – এসবই তো বড় আবেগের, বড় ভালবাসার তাই না?

এই মুম্বইয়ে ২০০০ সাল থেকে মাতৃভাষা দিবস পালন করে চলেছে ‘সংলাপ’, যার কর্ণধার তাপস কর। মুম্বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় মাতৃভাষা আন্দোলনের বিষয়ে মানুষকে বিশেষত পরবর্তী প্রজন্মকে সচেতন করতে তাঁর এই প্রয়াস। এইবার ২১শে ফেব্রুয়ারি এই অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে সন্ধে সাড়ে সাতটায় চেম্বুরের ইউথ কাউন্সিল হলে আর সি এফ স্পোর্টস ক্লাব এর উল্টোদিকে।

লালমাটি উৎসব ও গান মেলা ২

এবার আসুন সুধিজন আমার সাথে, আপনাদের মনের ক্যানভাসে এঁকে দিই একটি ছবি। নিজের মাটির সাথে যে আবেগ জড়ানো, সেই আবেগের আর ভালবাসার একটা নিটোল ছবি। ‘লালমাটি উৎসব ও গান মেলা ২’ সম্প্রতি জানুয়ারির বাইশ থেকে চব্বিশ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সিবিডি বেলাপুরের আরবান হাটে। আয়োজক সংস্থা ‘রঞ্জিৎ ঝর্ণা কাঁসাই ইকো ফাউণ্ডেশন’, যে সংস্থা পুরুলিয়ার লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে তথা পুরুলিয়ার মানুষের উন্নতিকল্পে কাজ করে চলেছে। এটি এই উৎসবের দ্বিতীয় বছর। জানুয়ারির বাইশ তারিখে সন্ধ্যায় অনেক গুণী মানুষের উপস্থিতিতে প্রদীপ জ্বালিয়ে উদ্বোধন করা হল এই ‘লালমাটি উৎসবের’। উপস্থিত ছিলেন পদ্মশ্রী শেখর সেন, কবি অরুণ চক্রবর্তী, লেখিকা জয়া মিত্র এবং আরো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। অনুষ্ঠান জমজমাট হয়ে ওঠে সেদিন সন্ধ্যায় পুণে থেকে আগত ‘উপাসনা’ দলটির নাচ, গান, কবিতায় – ‘পুরুলিয়ার পাঁচালি’। পুরুলিয়া – ‘লালমাটি উৎসবের’ লালমাটির দেশ – যে মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে রয়েছে পুরুলিয়ার লোকগান, লোকনৃত্য, লোকশিল্প। সেই ‘মাটি’র স্পর্শ – ‘মা’ টির স্পর্শ পেতেই এই ‘লালমাটি উৎসব’। ‘লালমাটি উৎসব’ একটা সাঁকো মুম্বইয়ের সঙ্গে পুরুলিয়ার। আমরা এই সাঁকো দিয়ে চলে গিয়েছিলাম আমাদের পশ্চিমবঙ্গের সেই পশ্চিমের জেলাটায় যেখানে ডুংরি পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা জঙ্গলমহলে ছড়িয়ে রয়েছে ভারতের চিরন্তন লোককথা। অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছিল নানা ধরণের নাচ, গান, কবিতা, নৃত্যনাট্যে। ধ্রুপদী আঙ্গিকেও আমরা পেয়েছি বিখ্যাত শিল্পীদের। নানা রঙের বাহারে, নানা সুরের মূর্চ্ছনায় সেজেছিল এই ‘লালমাটি উৎসব’। কিন্তু এখানে আমি কেবল তাঁদের কথাই বলব যাঁরা ছিলেন এই ‘লালমাটি উৎসব’ এর প্রাণ। পুরুলিয়া থেকে এসেছিলেন নরেন হাঁসদা তাঁর সাঁওতালি নাচ ও গানের দল নিয়ে। পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের ঢালি ডুংরিতে তাঁর বাস। সেখানে ঘর বেঁধে গড়ে তুলেছেন স্কুল। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পাঠ দেওয়া হয় সেখানে। সাঁওতালি মাধ্যমের এই স্কুলে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দিও শেখানো হয়। প্রায় শ’খানেক বাচ্চা পড়াশোনা করে সেখানে। শনি রবিবারে হয় সাঁওতালি নাচ, গানের ক্লাস। নরেন হাঁসদা ও তার দলের সাঁওতালি নাচ গান গতবারেই মুগ্ধ করেছিল আমাদের। সেই ধামসা মাদলের দ্রিমি দ্রিমি আওয়াজ আর তার সাথে মেয়েদের নাচের তালে পা মেলানো এক অনবদ্য ভঙ্গিমায় শৈল্পিক হয়ে ওঠে। নরেন হাঁসদার বাদ্যযন্ত্রটির নাম বানাম। সেই বানাম বাজিয়ে তিনি যখন গান ধরেন, তখন সেই গানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই আমরাও। ‘বীর বিসম অহৈ হেরিঙ, টিঙা জনম দিশম...’ অর্থাৎ ‘এই আমার জন্মভূমি জঙ্গলমহল, একে কি আমি ভুলতে পারি’? এই গান সত্যি আমাদের মনকে আকুল করে তোলে। মনে পড়ে যায় ছেলেবেলার গ্রামজীবনের কথা!

ছৌ নাচের দলে যে চোদ্দ জন এসেছিল, তাদের কথা একটু বলে নিই। এরা বেশির ভাগই পুরুলিয়ার রঞ্জিৎ ঝর্ণা কাঁসাই ইকো ফাউণ্ডেশনের ‘ছৌ এ্যাকাডেমি’র সদস্য। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ পালা অভিনয় করে দেখিয়েছিলেন তাঁরা। শিব সেজেছিলেন গৌরীশ রায় (মাস্টারদা সিং ভুঁইঞা), উত্তমকুমার মাহাতো সেজেছিলেন মহিষাসুর এবং কার্তিক। উত্তমকুমার মাহাতো আমেরিকার মাস্ক ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে যাবেন। বিকাশ মাহাতো সেজেছিলেন গণেশ, ভগত রায় কার্তিক, দুর্গা সেজেছিলেন মৃত্যুঞ্জয় বাউরি, সিংহের পোশাকে আনন্দ মাহাতো। লক্ষ্মী, সরস্বতী সেজেছিলেন যথাক্রমে শক্তিপদ ওরাং এবং যুধিষ্ঠির বাউরি। বাদ্যযন্ত্রে ঢোল বাজিয়েছেন নিমাই মাহাতো, নাগরা বা ধামসা তপনানন্দ মাহাতো, মেরাকস মদন বাউরি এবং সানাই অবিনাশ কালিন্দী। এঁদের মধ্যে তপনানন্দ মাহাতো ও মদন বাউরি গানও গেয়েছেন। ছৌ নাচের মুখোশ বানিয়েছেন সঞ্জয় শীল ও সুনীল শীল। চড়া বাজনা এবং গানের সাথে যখন ছৌনৃত্যশিল্পীদের মার্শাল আর্ট – ‘উলফা’ দেখছিলাম, মন আপনা হতেই বিনম্র শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসছিল। আমাদের দেশকে অলিম্পিকে পদকের জন্য মাথা খুঁড়ে মরতে হয় আর এঁদের মধ্যে কত সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে, আমরা তার খবর রাখি না। দারিদ্রের অন্ধকারে বিলীন হয়ে যায় এমনই কত প্রতিভা।

আর একজনের কথা বলে শেষ করব। সেই গুণী মানুষটির নাম আশীর্বাদ কর্মকার। ঝুমুর গান পরিবেশন করেছেন এই বৃদ্ধ মানুষটি। ঝুমুর আদতে চাষের গান। কৃষি সংস্কৃতির গান। আশীর্বাদ কর্মকারের দাদামশাই চামু কর্মকার ছিলেন বিখ্যাত ঝুমুরিয়া। ভবপ্রীতানন্দ ওঝা - ঝুমুর গানের প্রবাদপুরুষ ছিলেন রাজদরবারের গায়ক। দরবারী ঝুমুর যেমন রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গানেই ছিল তাঁর দক্ষতা। আর চামু কর্মকারের গানে ফুটে উঠত সমাজের নানা কাহিনি, সমাজের অন্যায় অবিচারের বিরূদ্ধে তিনি গান বাঁধতেন। সাঁওতালদের গ্রামে একঘর করে কর্মকার সম্প্রদায় থাকতেন। ফসল রোয়ার সময় তাঁরা সাঁওতালদের যোগান দিতেন চাষের যন্ত্রপাতি। এভাবেই দরিদ্র চামু কর্মকার উঠে এসেছিলেন সাঁওতালদের গ্রামে। ঝুমুর গানে তাঁর স্বাভাবিক দক্ষতা তাঁকে অন্য সকলের থেকে স্বতন্ত্র করেছিল। সেই চামু কর্মকারেরই দৌহিত্র আশীর্বাদ কর্মকার তাঁর গলার সুরে প্রমাণ করলেন তিনি চামু কর্মকারের যোগ্য উত্তরপুরুষ।

এই যে মাটির থেকে উঠে আসা এইসব মানুষ এঁদের কথা বলতে শুরু করলে শেষ হয় না। এই সংক্ষিপ্ত পরিচয়ে এঁদেরকে চেনা যায় না। এঁদের সরলতা, মাটির প্রতি ভালবাসা এসব ভালভাবে বুঝতে হলে নিজেকেও একাত্ম করতে হবে এঁদের সঙ্গে। আমরা শহুরে খোলস থেকে যতক্ষণ না বেরিয়ে আসছি, ততক্ষণ তা সম্ভব নয়। কিন্তু এঁরাই তো ভারতবর্ষ আর আমাদের নিজেদের মধ্যেও তো লুকিয়ে রয়েছে এক একটি গ্রাম। আমরা পারব না আমাদের ভেতরের গ্রামগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement