রবিবার দিল্লিতে সিপিআইয়ের সদর দফতর অজয় ভবনে কানহাইয়ার পরিজনরা। —নিজস্ব চিত্র।
তিন বছর ধরে বেগুসরাইয়ের বাড়িতে বিছানায় শুয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত জয়শঙ্কর সিংহ। তিনি চান না, মেজ ছেলে রাজনীতি থেকে সরে আসুক।
ছেলে কেমন আছে, তাঁর নিরাপত্তার কথা ভেবে অস্থির মা মীনা দেবী। তা-ই বলে ছেলেকে রাজনীতি ছাড়ার কথা তিনিও কখনও বলবেন না।
বড় ভাই মণিকান্ত কুমারের চিন্তা, ভাইয়ের কেরিয়ার বরবাদ করে দেওয়া হতে পারে। তবু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেবেন না।
কানহাইয়াকে এক বার দেখার আশায় শনিবারই দিল্লি এসে গিয়েছেন মণিকান্ত, জ্যাঠা রাজেন্দ্র সিংহ এবং পরিবারের আরও তিন জন। অসুস্থ স্বামীকে ছেড়ে মীনা দেবী কোথাও যেতে পারেন না। কিন্তু টিভির পর্দায় ছেলেকে আদালতে মার খেতে দেখে স্থির থাকতে পারেননি। বড় ছেলে আর অন্যদের ঠেলে দিল্লি পাঠিয়েছেন। কিন্তু কানহাইয়ার দেখা মেলেনি। তিহাড় জেলে আবেদন জানানো হয়েছে। সোমবার দেখা মিললেও মিলতে পারে। এই দিন হাইকোর্টে কানহাইয়ার মামলার শুনানিও হতে পারে।
কিন্তু একটা বিষয় বাড়ি থেকেই ঠিক করে এসেছেন মণিকান্ত। ভাইকে রাজনীতি থেকে সরে আসার কথা কিছুতেই বলবেন না। তাঁর স্পষ্ট কথা, ‘‘কানহাইয়া একদম ঠিক রাস্তায় চলছে। ওর আত্মবিশ্বাস যথেষ্ট।
সেটাই ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে। ও সব নিয়ে চিন্তা করছি না। চিন্তা শুধু ভাইয়ের সুরক্ষা নিয়ে।’’
দিল্লিতে মণিকান্তরা আশ্রয় নিয়েছেন সিপিআইয়ের সদর দফতর অজয় ভবনে। জেএনইউ-তে ‘দক্ষিণ আফ্রিকার সামাজিক পরিবর্তন’ নিয়ে গবেষণা করতে করতেই সিপিআইয়ের ছাত্র সংগঠনের কাজ করতেন কানহাইয়া। সংগঠনের তেমন জোর না থাকলেও নিজের বক্তৃতার জোরেই ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় দিল্লি পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করার পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফের ছড়িয়ে পড়েছে কানহাইয়ার নির্বাচনী বক্তৃতার ভিডিও। সকলেই শুনতে চাইছেন, কানহাইয়া কী ভাবে বিজেপি-আরএসএসের ‘সাম্প্রদায়িক’ রাজনীতিকে নিশানা করেছিলেন। বাম রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে অন্য দলের নেতারাও মানছেন, এমন ঝাঁঝালো বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতা বহুদিন দেখা যায়নি। শুধু জেএনইউ ক্যাম্পাস নয়। বিহার নির্বাচনের সময়ও বেগুসরাই জেলায় সিপিআই প্রার্থীদের হয়ে প্রচার করেছিলেন কানহাইয়া। তাঁর দল জিততে পারেনি ঠিকই। কিন্তু তাঁর বক্তৃতা হইচই ফেলে দিয়েছিল।
কানহাইয়া এমন বক্তৃতা দিতে শিখলেন কোথায়? মণিকান্ত বলেন, ছোটবেলা থেকেই বক্তৃতা দেওয়ার প্রতিযোগিতা হতো বাড়িতে। ১৫ অগস্ট বা ২৬ জানুয়ারি কে কত ভাল বক্তৃতা দিতে পারে তার রেষারেষি চলত। বাবা কমিউনিস্ট পার্টির ভক্ত ছিলেন। ঠাকুরদা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। সব মিলিয়ে একটা পরিবেশ ছিলই। পড়াশোনার মতো কানহাইয়া বক্তৃতার প্রতিযোগিতাতেও বরাবর সব ভাই-বোনদের টেক্কা দিতেন। আর একই কারণে কানহাইয়া ভারত-বিরোধী কিছু বলতেই পারেন না বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে তাঁর পরিবার। কিন্তু সরকার বা দিল্লি পুলিশ সে কথা মানছে কি? মণিকান্ত বলেন, ‘‘সরকারের থেকে কিছু আশা করি না। পুলিশ বারবার বলছে, প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু কোথায় প্রমাণ! আদালতে তো কিছুই দেখাতে পারেনি ওরা।’’
কানহাইয়ার পাশে দাঁড়িয়ে জেএনইউ-র ঘটনার কড়া ভাষায় নিন্দা করেছেন চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি, নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিক ওরহান পামুকের মতো ব্যক্তিত্ব। আজ জেএনইউ-এর উপাচার্য জগদীশ কুমারকে ই-মেল করে চমস্কি জানতে চেয়েছেন, ক্যাম্পাসে পুলিশ কেন ডেকে এনেছিলেন তিনি।
কানহাইয়ার পাশাপাশি তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে এখন চিন্তিত এআইএসএফ-এর সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ কুমার। মণিকান্তদের নিরাপত্তার জন্য তাই এখন অজয় ভবনেও দিনরাত পাহারায় রয়েছেন কানহাইয়ার সঙ্গীরা। কানহাইয়ার সঙ্গেই রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে অভিযুক্ত উমর খলিদ-সহ ৫ ছাত্রকে এ দিনই সন্ধ্যায় দেখা গিয়েছে জেএনইউ ক্যাম্পাসে। উমরের দাবি, তিনি মোটেই জঙ্গি নন আর সেটা প্রমাণ করতেই ফিরে এসেছেন তিনি। খবর পেয়ে দল পাঠিয়েছে দিল্লি পুলিশ।