সংসদ চলবে না বুঝেই এত ঝাঁঝালো মোদী

প্রশ্নটা তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই! তবে কি তিনি ধরেই নিয়েছেন, সংসদের আসন্ন বাজেট অধিবেশনও ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে রাজনীতির কাজিয়ায়?

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০৩:৪১
Share:

প্রশ্নটা তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই! তবে কি তিনি ধরেই নিয়েছেন, সংসদের আসন্ন বাজেট অধিবেশনও ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে রাজনীতির কাজিয়ায়?

Advertisement

অসমে বিধানসভা ভোট সামনে। এ সময়ে সে রাজ্যে গিয়ে ক্ষমতাসীন বিরোধী দলকে বিঁধবেন, সেটা প্রত্যাশিত। কিন্তু গুয়াহাটিতে সরকারি অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী কাল যে ভাবে কংগ্রেসকে নিশানা করতে গিয়ে গাঁধী পরিবারকে তুলোধোনা করেছেন, তাতেই উঠে এসেছে প্রশ্নটা।

সাধারণ ও রেল বাজেট পাশ হওয়া ছাড়া এ বারের অধিবেশন কতটা সুষ্ঠু ভাবে চলবে, এমনিতেই তা নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু মোদীর ওই আক্রমণের পরে আজ কংগ্রেস সূত্রে কার্যত বুঝিয়েই দেওয়া হল, আগামী বাজেট অধিবেশন নির্বিঘ্নে চালানোর আশা এখনই ছেড়ে দিতে পারে সরকার। অধিবেশনের আগে খোদ প্রধানমন্ত্রীই যদি সংঘাতের লাইন নেন, তা হলে আর যা-ই হোক সংসদ সুষ্ঠু ভাবে চলতে পারে না। কংগ্রেসের এই মনোভাব মোটেই অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশেষ করে, সরকার যা যা করতে পারেনি তার জন্য মোদী ফের গাঁধী পরিবারকে দায়ী করার পরে এটা প্রত্যাশিতই বলা যায়। বিজেপির অন্দরেও তাই প্রশ্ন, জেনেবুঝে কেন অধিবেশনের আগে গাঁধী পরিবারকে নিশানা করছেন প্রধানমন্ত্রী?

Advertisement

এর পিছনে মোদীর নিজস্ব কী ভাবনা কাজ করছে, সেটা তিনি ঘনিষ্ঠ মহলে না ভাঙা পর্যন্ত স্পষ্ট হবে না। তবে একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও দলের শীর্ষ সারি নেতাদের আলোচনায় উঠে আসছে তিনটি সম্ভাব্য কারণের কথা।

l এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যেমন বললেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী কার্যত ভোটের প্রচার করছিলেন। তাই অসমে শাসক দলকে রাজনৈতিক আক্রমণ করাটা জরুরি ছিল।’’

l দ্বিতীয় একটি সম্ভাবনার কথাও উঠে আসছে বিজেপির নেতা-মন্ত্রীদের ঘরোয়া আলোচনায়। মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে বারবারই দেখা গিয়েছে, সঙ্ঘ ও বিজেপির নেতা-মন্ত্রীদের একটি অংশ বারবারই বেফাঁস মন্তব্য করে সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। মোদী নিজে বারবার তাঁদের সতর্ক করেছেন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, দলেরই নেতা-মন্ত্রীদের মন্তব্য নিয়ে সংসদে ঝড় তোলার সুযোগ পেয়ে গিয়েছেন বিরোধীরা। যেমন দলীয় সূত্রেই খবর, ন্যাশনাল হেরাল্ড বিতর্ক খুঁচিয়ে তোলার বিষয়টি নিয়ে রফা করতে এক সময় গোপনে অরুণ জেটলিকে আহমেদ পটেলের কাছে পাঠিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজেপি নেতারা ওই বিতর্ক নিয়ে এমন সব বেফাঁস মন্তব্য করতে শুরু করেন যে সেটাই রাজনৈতিক হাতিয়ার করে সংসদ অচল করে দেয় কংগ্রেস। মোদীর গত কালের ভূমিকা নিয়ে দলে এই প্রশ্নও উঠছে, তবে কি প্রধানমন্ত্রীও এ বার বলার ঝোঁকে বলে ফেলার প্রবণতায় গা ভাসালেন!

বিজেপির আর একটি অংশ কিন্তু এমন সম্ভাবনার কথা সাফ নাকচ করে দিচ্ছে। এই নেতাদের মতে, মোদীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও সুযোগই নেই এই ক্ষেত্রে। মোদী জেনেবুঝেই সনিয়া ও রাহুল গাঁধীকে নিশানা করে আক্রমণ শানিয়েছেন। বিজেপির এক নেতার কথায়, ‘‘আসলে কংগ্রেস এমনিতেই সংসদ চলতে দিত না। জিএসটি বিলও এ যাত্রায় পাশ হওয়ার আশা নেই। শুধু মাত্র বাজেট দু’টিই যা পাশ হবে। ফলে খামোখা কেন চুপ থাকবে বিজেপি? প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন ঠিক বলেছেন। কংগ্রেস যা পারে করুক!’’

বিজেপির নেতারা এ-ও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এর আগে অন্য কৌশল নিয়েও কিন্তু লাভ হয়নি। সংসদের আগের দু’টি অধিবেশন পণ্ড হয়েছে বিভিন্ন বিষয়ে কংগ্রেসের বিরোধিতায়। বাদল অধিবেশন ধুয়ে গিয়েছিল ললিত মোদী কাণ্ডে সুষমা স্বরাজ, বসুন্ধরা রাজেদের ইস্তফার দাবি ঘিরে হট্টগোলে। মন্ত্রীদের ইস্তফা না দেওয়া ও অন্যান্য প্রশ্নে সে যাত্রা অনড়ই ছিলেন মোদী। শীত অধিবেশনের মুখে কিন্তু বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনার দরজা খুলে দিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে সম্পর্ক অনেকটাই সহজ করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন মোদী। এমনকী শীত অধিবেশনের প্রথম দিনে কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গাঁধী ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে নিজের বাসভবনে চায়ের আসরে আপ্যায়ন করেছিলেন। প্রথম বার। জিএসটি নিয়ে আলোচনার দরজাও খুলেছিল তাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, বিজেপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে শীত অধিবেশনও পণ্ড করে দেয় কংগ্রেস।

সে দিক থেকে এ বার কংগ্রেসের ভাঁড়ারে এমনিতেই যথেষ্ট অস্ত্র মজুত রয়েছে। হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রের আত্মহত্যা থেকে শুরু করে পেট্রো পণ্যের ওপর অতিরিক্ত কর চাপানোর মতো বিষয় নিয়ে সংসদে সরব হবে, ভেবেই রেখেছে কংগ্রেস। সংসদ বসার মুখে এসে মোদী-ঘনিষ্ঠ গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী আনন্দীবেন পটেলের মেয়ে আনার পটেলের বিরুদ্ধে জমি কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠে আসায় আরও উৎফুল্ল কংগ্রেস।

বিজেপির অনেকে বলছেন, ওই সব অভিযোগ খণ্ডনের পথে গেলেই যে সংসদ মসৃণ ভাবে চালানো যাবে, পাশ করানো যাবে গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলি— এমন আশা প্রায় শিকেয়। এবং সে কারণেই দেশবাসীর কাছে গাঁধী পরিবারের ‘আসল’ ভূমিকাটি তুলে ধরার চেষ্টায় নেমেছেন প্রধানমন্ত্রী। এবং এ কারণেই গত কাল তিনি বলেছেন, ‘‘স্রেফ একটি পরিবার নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য দেশের তামাম গরিবকে ভাতে মারছে। কৃষক মজুরদের ভালর জন্য সরকারের আনা কোনও বিলই রাজ্যসভায় পাশ হতে দিচ্ছে না কংগ্রেস!’’

রাজ্যসভায় কংগ্রেসের উপ- দলনেতা আনন্দ শর্মা আজ এ নিয়ে বলেন, ‘‘মোদী নিজের ও সরকারের ব্যর্থতা ঢাকার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। তাই বিরোধীদের ঘাড়ে দায় চাপানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মানুষ এত বোকা নয়! ‘অচ্ছে দিন’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে কেন্দ্রে সরকার গড়লেও তার ছিঁটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না। মোদী জমানায় অর্থনীতিও অধোমুখী। স্রেফ ভাষণবাজিতে আর চিঁড়ে ভিজবে না। সংসদেও এ বার কৈফিয়ত চাওয়া হবে।’’ মোদীর বিরুদ্ধে পাওয়া নয়া অস্ত্রটি নিয়ে আজও সরব হন আনন্দ। বলেন, ‘‘গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী আনন্দীবেনের মেয়ে আনার পটেলের জমি কেলেঙ্কারির মধ্যে কোনও রহস্য আর নেই। দিনে ডাকাতি হয়েছে। তখন মোদীই ছিলেন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী। তাই প্রধানমন্ত্রীকেই এই দুর্নীতি নিয়ে জবাব দিতে হবে।’’

এই চাপানউতোর যত এগোবে, বাড়বে তিক্ততা, মসৃণ ভাবে সংসদে কাজকর্ম চলার আশা ততই ক্ষীণ হয়ে পড়বে, সেটা এখনই বেশ স্পষ্ট।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement