শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
কেন্দ্রীয় পঞ্চায়েত মন্ত্রী রাজীবরঞ্জন সিংহ বলেন, “আমাদের দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া গোটা বিশ্বের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আজ আমাদের দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ার আলোচনা গোটা বিশ্বে হয়। বলা হয়, নিরপেক্ষ ভাবে নির্বাচন হয় এখানে। তা-ও এই প্রক্রিয়াকে কী ভাবে আরও উন্নত করা যায়, তা নিয়ে আমাদের আলোচনা হওয়া উচিত।”
বিরোধী শিবিরকে নিশানা করে তিনি আরও বলেন, “মনীশ তিওয়ারি একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী। তিনি যখন আলোচনা শুরু করলেন, আমি ভেবেছিলাম ইতিবাচক কোনও প্রস্তাব আসবে। কিন্তু তাঁর বক্তৃতায় আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছি। এক জন বর্ষীয়ান বক্তা হয়েও তিনি কী ভাবে এই কথাগুলি বললেন, যার সঙ্গে লোকসভার কোনও যোগ নেই। তিনি আলোচনা শুরুই করলেন নির্বাচন কমিশন নিয়। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করতে পারি না। কিন্তু তিনি মন্তব্য করে গিয়েছেন।”
বীরভূমের বাসিন্দা সোনালি বিবিকে দেশ থেকে তাড়ানোর প্রসঙ্গও লোকসভায় তুলে ধরেন কল্যাণ। তিনি বলেন, “দিল্লিতে কেউ বাংলায় কথা বললেই তাঁকে গ্রেফতার করে নেওয়া হবে! আপনারা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ নিশ্চয়ই দেখেছেন। আদালত বলেছে, আগে তাঁদের ফেরত নিয়ে আসো। তার পরে বিচার হবে। সেই নির্দেশ সোনালি বিবিদের ফেরত নিয়ে এসেছে কেন্দ্র।” তিনি আরও বলেন, “সব বাঙালিকে কি রোহিঙ্গা বলে তাড়িয়ে দেওয়া হবে! রোহিঙ্গারা কোথায় আসছে? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে তারা আসছে মিজ়োরামে। আসলে বিজেপি বাঙালি বিদ্বেষী। সেই কারণেই বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে দেওয়া হয়। সেই কারণেই রামমোহন রায়ের সমালোচনা করা হয়। সেই কারণেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলে দেন ‘বঙ্কিমদা’। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের যখন জন্ম হয়েছিল, মোদীর তিন প্রজন্ম আগের সময়ের মানুষ— তাঁকেও দাদা বলে দেন। কখনও কোনও গুজরাতিকে তো দাদা বলেন না। বল্লভভাই পটেলদা বলেন কি! তাঁরা বাঙালিদের ঘৃণা করেন।”
কল্যাণ বলেন, “বিহারে তো আপনারা অনেক কিছু বলেছিলেন। আপনারা বলেছিলেন, বিহার থেকে অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দেবেন। কিন্তু এক জন অনুপ্রবেশকারীকেও খুঁজে পাননি। যদি অনুপ্রবেশকারী এসে থাকে, বিএসএফ, সিআইএসএফ তাদের ধরতে পারেনি। এটি তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর খামতি। আর কোনও ত্রুটি নয়।”
শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণের অভিযোগ, ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্যই এসআইআর করা হচ্ছে। কিন্তু নতুন ভোটারদের কী ভাবে তালিকায় যুক্ত করা হবে, তা নিয়ে এসআইআরে কেন কোনও আলোকপাত করা হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন কল্যাণের। তিনি বলেন, “ভোটারদেরই যখন রাখছেন না, তা হলে ভোট করিয়ে কী হবে। ভোটারেরাই সরকার ঠিক করেন। কিন্তু এখন নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে মোদী সরকার ঠিক করে, তাদের ভোটার কারা থাকবে।”
তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বলেন, “নির্বাচন কমিশন সব সময় বলে যাচ্ছে, তাদের কাছে তদারকির ক্ষমতা আছে। তারা যা খুশি করতে পারে। কিন্তু তদারকির ক্ষমতা কখনোই সংসদের তৈরি করা কোনও আইনের ক্ষমতার চেয়ে বেশি হতে পারে না।”
বিএলও-দের উপর কাজের চাপের অভিযোগে সংসদে সরব হন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তিনিও বলেন, “এসআইআর কাজ শুরু হওয়ার পরে বিএলও-দের উপর অমানবিক কাজের চাপ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে ২০ জন আত্মহত্যা করেছেন। সুইসাইড নোটও রয়েছে। পাঁচ জন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ১৯ জন মারা গিয়েছেন। তিন জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এর জন্য দায়ী কে! নির্বাচন কমিশন?”
উত্তরপ্রদেশের পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। কল্যাণ বলেন, “এটি শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি নয়। অখিলেশও একটু আগেই বললেন। সেখানে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেটি বিজেপি শাসিত রাজ্য। মধ্যপ্রদেশে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এটিও বিজেপি শাসিত রাজ্য। গুজরাতে ৬ জন, রাজস্থানে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। কেউ তাঁদের কাছে গিয়েছেন? বিজেপির কোনও সাংসদ, মুখ্যমন্ত্রী গিয়েছেন খোঁজ নিতে যে কেন মৃত্যু হয়েছে? আমরা গিয়েছিলাম। সিপিএম শাসিত কেরলে এক জনের মৃত্যু হয়েছে। ডিএমকে শাসিত তামিলনাড়ুতে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।”
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও লোকসভায় প্রশ্ন তুললেন এসআইআর নিয়ে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ‘কাজের চাপে’ বুথ স্তরের আধিকারিক (বিএলও)-দের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিএলও-দের মৃত্যুর প্রসঙ্গ লোকসভায় তুলে ধরেন তিনি।এসপি সাংসদের বক্তব্য, ইভিএম যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে অতীতে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে। তাই ব্যালট পেপারে নির্বাচন করানোর দাবি তোলেন তিনি। ব্যালট পেপারে ভোটের দাবি তুলেছেন কংগ্রেস সাংসদ মণীশ তিওয়ারিও।
মণীশ তিওয়ারির বক্তৃতার পরেই লোকসভায় বক্তৃতা করেন বিজেপি সাংসদ সঞ্জয় জয়সওয়াল। সাম্প্রতিক সময়ে ‘ভোট চুরি’ বিতর্কে কেন্দ্রকে বার বার নিশানা করেছে কংগ্রেস। এ বার সেই অস্ত্রকে কংগ্রেসকে নিশানার চেষ্টা করেন বিজেপি সাংসদ। সঞ্জয় বলেন, “প্রথম ভোট চুরি হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। তখন কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী কমিটি সর্দার পটেলের সঙ্গে ছিল। কিন্তু নেহরুকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। ১৯৭৫ সালে যখন ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন, তখনও ভোট চুরি হয়েছে।”
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনারদের বাছাইয়ের জন্য বর্তমানে তিন সদস্যের একটি প্যানেল রয়েছে। ওই প্যানেলে রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা এবং দেশের প্রধান বিচারপতিকেও যুক্ত করার প্রস্তাব দেন মণীশ। তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন কমিশনের কাজ নিরপেক্ষ আম্পায়ারের মতো হওয়ার কথা। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখন বিরোধীরা এবং সাধারণ জনতাকে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হচ্ছে।”
এসআইআর সংস্কারের কাজ করার জন্য নির্বাচন কমিশনের কোনও আইনি অধিকার নেই। লোকসভায় এমনটাই দাবি করলেন মণীশ তিওয়ারি। তিনি আরও বলেন, “ভোটদানের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৮ বছরে করে সবচেয়ে বড় নির্বাচনী সংস্কার করেছিলেন রাজীব গান্ধী।”
মঙ্গলবার দুপুর ১২টার কিছু পরে লোকসভায় এসআইআর নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রারম্ভিক ভাবে আলোচনায় বক্তৃতা রাখছেন কংগ্রেস সাংসদ মণীশ তিওয়ারি।
লোকসভায় এসআইআর নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে কংগ্রেস সাংসদ উজ্জ্বল রমন বলেন, “আলোচনার সময় আমরা ইতিবাচক কিছু পরামর্শ দেব। নির্বাচন কমিশনের উপর যাতে সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় থাকে, তা নিশ্চিত করা উচিত।”
সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, “আজ, লোকসভায় নির্বাচনী সংস্কার নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। রাজ্যসভায়, বন্দে মাতরমের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। বিরোধী দলের সাংসদেরাও নিজেদের বক্তব্য জানাবেন। যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে তা দূর করার সুযোগ পাবে সরকারও।” তিনি আরও বলেন, “সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রের উপরে ভরসা রাখেন। তাঁরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন। তাই কেউ যাতে মিথ্যা ব্যাখ্যার দ্বারা বিভ্রান্ত না হন, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই বিতর্কে আমারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরার সুযোগ পাব।”
এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। বিরোধী শাসিত একাধিক রাজ্য সুপ্রিম কোর্টে মামলাও করেছে। সেই মামলাগুলি এখনও বিচারাধীন রয়েছে আদালতে। এ অবস্থায় মঙ্গলবার সংসদের আলোচনায় কী কী বিষয় উঠে আসে, তা নিয়ে কৌতূহল বৃদ্ধি পেয়েছে জনমানসে।