হরিপুর ভুলে লগ্নিতে উৎসাহী মস্কো

রাশিয়ার সহযোগিতায় পূর্ব মেদিনীপুরের হরিপুরে প্রস্তাবিত পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটা স্থানীয় রাজনৈতিক বাধায় হয়নি। কে জানে বাঙালি হিসেবে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের এ নিয়ে কতটা আক্ষেপ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে নয়াদিল্লি-মস্কো কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আজ আরও গতি দেওয়ার চেষ্টা করলেন প্রণববাবু।

Advertisement

শঙ্খদীপ দাস

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০১৫ ০২:৪২
Share:

জন্মদিনের প্রণাম। মস্কোয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। ছবি: এএফপি।

রাশিয়ার সহযোগিতায় পূর্ব মেদিনীপুরের হরিপুরে প্রস্তাবিত পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটা স্থানীয় রাজনৈতিক বাধায় হয়নি। কে জানে বাঙালি হিসেবে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের এ নিয়ে কতটা আক্ষেপ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে নয়াদিল্লি-মস্কো কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আজ আরও গতি দেওয়ার চেষ্টা করলেন প্রণববাবু।

Advertisement

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সাত দশক পূর্তি উপলক্ষে মস্কোর বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে সামিল হতেই মূলত পাঁচ দিনের রাশিয়া সফরে এসেছেন প্রণববাবু। ক্রেমলিনের প্রাসাদ লাগোয়া রেড স্কোয়ারে আজ সকালে সেই অনুষ্ঠানে পুতিনের সঙ্গে একমঞ্চে ছিলেন ভারতীয় রাষ্ট্রপতি। তবে এই বিজয়োৎসবে সামিল হওয়ার মোড়কে নয়াদিল্লি সাজিয়ে রেখেছিল কূটনীতির বাকি সব উপকরণ। বিকেলে ক্রেমলিনের প্রাসাদে পুতিন-প্রণব দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়। তার পর সাংবাদিক বৈঠক করে বিদেশসচিব জয়শঙ্কর বলেন, ‘‘বৈঠকে নয়াদিল্লির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিতে অংশীদার হওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে রাশিয়া। সেই সঙ্গে ভারতে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রসার, শক্তি ক্ষেত্রে সুরক্ষা বাড়াতে সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক শান্তি কায়েম রাখতে বোঝাপড়া অটুট রাখার বার্তাও দিয়েছে মস্কো।’’

সংবিধান অনুযায়ী ভারতের রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। আসলে কেন্দ্রে মোদী সরকারের কর্মসূচি ও নীতি সামনে রেখেই দৌত্য চালালেন তিনি। আর মোদী সরকার পুঁজি করল পুতিনের সঙ্গে প্রণবের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সখ্যকে। যে সম্পর্কের বয়স প্রায় দু’দশক ছুঁতে চলেছে।

Advertisement

শনিবার মস্কোয় বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। ছবি: পিটিআই।

ক্রেমলিনের এই প্রাসাদেই পাঁচ বছর আগে রাশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মেদভেদেভের সঙ্গে ভারতে পরমাণু চুল্লি নির্মাণ সংক্রান্ত সমঝোতা করেছিলেন মনমোহন সিংহ। মেদভেদেভ-মনমোহন যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা হয়েছিল, মেদিনীপুরের হরিপুরে রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় একটি পরমাণু চুল্লি তৈরি হবে। অন্তত দশ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু হরিপুরে জমি অধিগ্রহণে আপত্তি করেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। সাউথ ব্লক সূত্র জানাচ্ছে, ভারত-রাশিয়া পরমাণু সহযোগিতার ক্ষেত্রে হরিপুর একটা যতিচিহ্ন তৈরি করেছিল ঠিকই। তবে তা এখন অতীত। হরিপুর পর্ব ছাড়াও পরমাণু দায়বদ্ধতার শর্ত চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রেও কিছুটা দেরি হয়। তবে এখন চাকা ফের গড়াতে শুরু করেছে। গত ডিসেম্বরে পুতিনের ভারত সফরের সময়ে এই বিষয়ে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি হয়েছে। আজ প্রণব-পুতিন বৈঠকে সেই ওয়ার্কিং গ্রুপের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।

Advertisement

প্রণববাবুর মতে, ভারতে পরমাণু শক্তি উৎপাদনে রাশিয়ার মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। তবে ভারতের শক্তি চাহিদা বিপুল। রাশিয়া প্রাকৃতিক তেল ও গ্যাস উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম সারিতে রয়েছে। তেল ও গ্যাস উৎপাদনে রাশিয়ায় ভারতের বৃহত্তম বিনিয়োগও রয়েছে। এই সহযোগিতার পরিধি বাড়াতে চায় দু’দেশ।

কূটনৈতিক সূত্রের খবর, শক্তি ক্ষেত্রে এই আদানপ্রদানের সঙ্গেই বৈঠকে উঠে আসে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রসঙ্গ। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ককে অংশীদারিতে তুলে আনার প্রস্তাব দিয়েছে নয়াদিল্লি। পরে বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে বলা হয়, নয়াদিল্লির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নিয়ে উৎসাহী মস্কো। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নির রাস্তা ইতিমধ্যে খুলে দিয়েছে মোদী সরকার। ভারতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, যৌথ উৎপাদন, রেলের আধুনিকীকরণ, স্মার্ট সিটি নির্মাণ, শিল্প তালুক তৈরিতে আগ্রহী রাশিয়া। ভারতে আধুনিক প্রযুক্তি প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহী রাশিয়ার প্রযুক্তি সংস্থা রুশানো। তা ছাড়া, রাশিয়া ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড, সিসটেমা, রেনোভা গোষ্ঠীও বিনিয়োগ করতে চায়।

কূটনীতিকদের মতে, এই বিষয়ে পুতিন প্রশাসনের উৎসাহের কারণও রয়েছে। ইউক্রেন বিবাদের জেরে রাশিয়ার উপরে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে কার্যত গোটা পশ্চিমী দুনিয়া। এমনকী, রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমেই কেউ কেউ তাঁকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করে নাম দিয়েছেন অ্যাডলফ পুতিন।

পুরনো মিত্র দেশের দুঃসময়ে নয়াদিল্লিও সহানুভূতির অবস্থান নিচ্ছে কৌশলগত ভাবেই। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘পুতিনকে ভারতের মহান বন্ধু হিসেবেই স্বীকৃতি দেয় নয়াদিল্লি।’’ ইরানের পরমাণু প্রকল্পে রাশিয়ার সমর্থন নিয়ে ওয়াশিংটন যখন সমালোচনা করছে, তখন প্রণব আজ বলেন, ‘‘সিরিয়ায় স্থিরতা আনা ও ইরানের পরমাণু বিতর্কের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির জন্য রাশিয়াকে অভিনন্দন জানাচ্ছে ভারত।’’

বিদেশ মন্ত্রকের শীর্ষ সারির এক কূটনীতিকের কথায়, ‘‘চলতি বছরেই ভারত-রাশিয়া শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে মস্কো সফরে আসবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সম্ভবত, সেই সফরে দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রসারে কিছু চুক্তি স্বাক্ষর হবে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement