I.N.D.I.A Meeting

দুর্বল কংগ্রেস ও একের পর এক ক্ষমতাচ্যুত দলের টলমলে জোট! ‘ইন্ডিয়া’র অস্তিত্বরক্ষার বৈঠকেও কাঁটা ডিএমকে, আপ, সিপিএম

গত ১০ মাসে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সর্বোচ্চ স্তরের কোনও ঘোষিত বৈঠক হয়নি। শেষ বার হয়েছিল গত বছরের অগস্টে। তখনও মমতা, স্ট্যালিনেরা শাসনক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন নিজ নিজ রাজ্যে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ ২১:৪১
Share:

রাহুল গান্ধীর সঙ্গে কথা বলছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাঁ দিকে বসে আছেন হেমন্ত সোরেন এবং ডান দিকে মল্লিকার্জুন খড়্গে। —ফাইল চিত্র।

পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোটের পর এই প্রথম বৈঠকে বসছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। সোমবার দুপুরে দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে বসবে বৈঠক। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী প্রথম বৈঠকের আগে দৃশ্যত নড়বড়ে বিরোধী শিবির। পূর্ণশক্তি প্রদর্শন তো দূর, আঞ্চলিক রাজনীতিতে বেআব্রু হয়ে পড়া শরিকি-দ্বন্দ্ব আড়াল করার চেষ্টাই বেশি প্রকট হল বৈঠকের আগে।

Advertisement

বিজেপি-বিরোধী দলগুলির এই জোট তৈরি হয়েছিল ২০২৩ সালে। ওই বছরের জুনে পটনায় প্রথম বৈঠক বসেছিল। বৈঠক ডেকেছিলেন জেডিইউ প্রধান নীতীশ কুমার (তখনও তিনি বিরোধী শিবিরেই)। তখন ১৫টি দল যোগ দিয়েছিল বৈঠকে। তার পরের মাসে বেঙ্গালুরু বৈঠকে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করে ‘ইন্ডিয়া’। দৃশ্যত দুর্বল হয়ে পড়া কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে ঘোষিত হয় ২৬টি বিরোধী দলের জোট। তবে ওই সময়ে বিরোধী জোটের বৈঠকে ‘প্রধান মুখ’ হিসাবে রাহুল গান্ধী, সনিয়া গান্ধী, মল্লিকার্জুন খড়্গেদের পাশাপাশি থাকতেন নীতীশ কুমার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরীবাল, এমকে স্ট্যালিন, সীতারাম ইয়েচুরিরা। তাঁদের দল তখন বিজেপি-বিরোধী শক্তি হিসাবে কোনও না কোনও রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু গত তিন বছরে ক্রমে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে এই আঞ্চলিক দলগুলি (শুধু পঞ্জাবে এবং ঝাড়খণ্ডে ক্ষমতায় রয়েছে আপ এবং জেএমএম। তবে কেজরীকে অনেক আগেই দিল্লি থেকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে বিজেপি)। কেউ আবার শিবির বদলে শাসক জোট এনডিএ-তে গিয়েছে। কংগ্রেসও তাদের ‘দুর্বল’ ভাবমূর্তি বদলাতে পারেনি।

অন্য দিকে, বর্তমান আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষিতে কংগ্রেসের সঙ্গে শরিকদের দ্বন্দ্ব ক্রমশ প্রকট হয়েছে। কংগ্রেসের সঙ্গে বনিবনা না-হওয়ার কারণে ‘ইন্ডিয়া’র থেকে দূরত্ব বৃদ্ধি করতে শুরু করে কেজরীবালের দল। সিপিএম এবং ডিএমকে-র সঙ্গেও কংগ্রেসের দ্বন্দ্ব সম্প্রতি প্রকট হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকট হয়েছে বিরোধী জোটের টলমল দশাও। পাঁচ রাজ্যে নির্বাচনের আগে পর্যন্ত বিজেপি-বিরোধী জোটের ‘মুখ’ হিসাবে যে দু’জনের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত— মমতা এবং স্ট্যালিন, উভয়েই নিজ আসনে পরাস্ত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে তৃণমূল, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে। তামিলনাড়ুর ভোটে স্ট্যালিনদের ভরাডুবি হতে না হতেই সে রাজ্যে ডিএমকে-র হাত ছেড়েছে কংগ্রেস। জোট বেঁধেছে টিভিকে-র সঙ্গে। এখন তামিলনাড়ুতে টিভিকে-র শাসকজোটের অন্যতম শরিক কংগ্রেস। ভোটের পর থেকেই ডিএমকে এবং কংগ্রেসের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। এ বার বিরোধী জোটের বৈঠকও বয়কট করল স্ট্যালিনের দল।

Advertisement

আবার কেরলের ভোটের সময়ে সিপিএম এবং বিজেপির মধ্যে ‘সমঝোতার’ তত্ত্ব উস্কে দিয়েছিল কংগ্রেস। কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বাম নেতা পিনরাই বিজয়নের সঙ্গে মোদীর গোপন আঁতাতের অভিযোগ তুলেছিল তারা। এ নিয়ে কংগ্রেসের উপর অসন্তুষ্ট সিপিএম। সম্প্রতি কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গেকে চিঠি পাঠিয়ে তা নিয়ে সিপিএম সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি। কংগ্রেসের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য বলেছেন তিনি। সোমবারের বৈঠকে তারা প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে ঠিকই, তবে কংগ্রেসের আচরণে যে অসন্তুোষ রয়েছে— তা-ও বুঝিয়ে দিচ্ছে। অতীতে এই ধরনের বৈঠকগুলিতে সিপিএমের তরফে প্রয়াত প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক ইয়েচুরিকে দেখা যেত। তবে এ বার সিপিএম সাধারণ সম্পাদক বেবি বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন না। কোনও গুরুত্বপূর্ণ নেতাকেও পাঠানো হচ্ছে না। রাজ্যসভার সাংসদ জন ব্রিটাসকে সোমবারের বৈঠকে পাঠাচ্ছে সিপিএম। একই ভাবে আরেক বাম দল আরএসপি-র সাধারণ সম্পাদক মনোজ ভট্টাচার্যও যোগ দিচ্ছেন না ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে। তাঁর বদলে যাবেন সাংসদ রামচন্দ্রন। বিরোধী জোটের কার্যপ্রণালি নিয়েও অতীতে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে বৈঠকের ‘ধারাবাহিকতার অভাব’ নিয়েও। গত ১০ মাসে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সর্বোচ্চ স্তরের কোনও ঘোষিত বৈঠক হয়নি। শেষ হয়েছিল গত বছরের অগস্টে। দিল্লিতে রাহুলের বাসভবনে আয়োজিত ওই বৈঠকে ২৫টি দলের প্রায় ৫০ জন নেতা যোগ দিয়েছিলেন। ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, মেহবুবা মুফতি। বেবিও ছিলেন ওই বৈঠকে। তার আগে বিরোধী জোটের নেতাদের শেষ মুখোমুখি বৈঠক হয়েছিল ২০২৪ সালে জুনে। মাঝের এই দীর্ঘ ব্যবধান কেন, তা নিয়ে ‘ইন্ডিয়া’কে মাঝে মাঝেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। তিন বছর আগে যে দলগুলি জোট ছিল, তাদের অনেকেই এখন ‘ইন্ডিয়া’র সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছে। এর মধ্যে জেডিইউ শিবির বদলে শাসক জোটে চলে গিয়েছে। আপ প্রকাশ্যে বিরোধী জোটের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখছে। ডিএমকে-ও কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।

এ অবস্থায় সোমবারের বৈঠকে কতগুলি দল যোগ দেবে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। রবিবার বিকেলে কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ সমাজমাধ্যমে জানান, ২৩টি দল বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে। তাঁর দাবি, বিরোধী জোট ঐক্যবদ্ধই রয়েছে। কয়েকটি দল নিজস্ব কারণে বৈঠকে যোগ দিতে পারছে না বলে জানান জয়রাম। তবে বৈঠকে অনুপস্থিত থাকা ওই দলগুলিও কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি এবং কাজকর্মের বিরুদ্ধে বলে দাবি কংগ্রেস নেতার। জয়রামের পোস্টে তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনও লেখেন, “একটি অভিন্ন উদ্দেশ্য এবং স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এই বৈঠক বসছে। ‘ইন্ডিয়া’ ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।” উল্লেখ্য, তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক আগে থেকেই দিল্লিতে রয়েছেন। রবিবার দিল্লিতে পৌঁছে গিয়েছেন মমতাও। সোমবার দিল্লির বৈঠকে তাঁরা দু’জনেই থাকবেন। তার আগে রবিবার কেজরীবালের সঙ্গে দেখা করতে যান মমতা-অভিষেক। তিন জন মিলে পৃথক বৈঠকও সারেন তাঁরা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement