স্নেহের পরশ। কাজিরাঙায় ডাচেস অব কেমব্রিজ। বুধবার। ছবি: পিটিআই।
সারা দিন খুব ধকল গিয়েছিল রাজদম্পতির। সকাল বেলা জঙ্গল সাফারি থেকে শুরু করে বিকেল পর্যন্ত চা-বাগানে ঘোরা, বিহু নাচের অনুষ্ঠান। তার পর জঙ্গল রিসর্টে ফিরে সবে একটু বিশ্রাম নিতে বসেছেন। এমন সময়ে দুলে উঠল পায়ের তলার মাটি।
কাজিরাঙা অভয়ারণ্যের যে রিসর্টটিতে রাজকুমার উইলিয়াম ও রাজকুমারি কেট রয়েছেন, সেটি কাঠের এক তলা বাড়ি। অভয়ারণ্য সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার সন্ধের ভূমিকম্পে প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও একটু পরে নিজেদের সামলে নেন। রাতে দিল্লির ব্রিটিশ দূতাবাস সূত্রেও জানানো হয়েছে, উইলিয়াম-কেট ঠিক আছেন। তাঁদের সফরসূচিও বদলাচ্ছে না।
আজকের দিনটি কেমন কাটল রাজদম্পতির?
সকাল শুরু হয়েছিল জিপ সাফারি। খোলা জিপে গন্ডার, মোষ, হরিণ আর পাখি দেখা। দুপুরে নামঘরে প্রার্থনা, বিহু। পরে, পশু উদ্ধার কেন্দ্র ও হাতি ক্লিনিক সফর। গন্ডারশাবক আর হাতিশাবককে দুধ খাওয়ানো। কাজিরাঙার দ্বিতীয় দিনের সফরকে এক কথায় ‘ইনক্রেডিবল’ বলছেন ডিউক ও ডাচেস অব কেমব্রিজ।
আজ সকাল সাতটা নাগাদ বাগরির প্রধান ফটকে তাঁদের রেঞ্জ রোভার এসে থামে। এক দিকে জঙ্গলের আবহ, অন্য দিকে রোদ। তাই দু’জনই ভেবেচিন্তে পোশাক বেছে নিয়েছিলেন। কেটের পরনে কালো ফুটকি দেওয়া সাদা ফুলহাতা ব্লাউজ। সঙ্গে ‘বাইকার ট্রাউজার’। উইলিয়ামের হালকা বাদামি জামা আর খাকি প্যান্ট। দু’জনেরই চোখে রোদচশমা। রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব (পর্যটন) ভি এস ভাস্কর, বন-পরিবেশ দফতরের প্রধানসচিব সঞ্জীব কুমার, প্রধান মুখ্য বনপাল ও পি পাণ্ডে, ডিএফও শুভাশিস দাস তাঁদের অভ্যর্থনা জানিয়ে পরিয়ে দেন টুপি আর গলায় ফুলাম গামোসা। ছয় জিপের কনভয়ে এএস০৫জি ৪৬৩৪ নম্বরের সবুজ, খোলা জিপসিতে প্রায় লাফিয়ে উঠে পড়েন উইলিয়াম। সামনের আসনেই বসেন। পাশে কেট। শুরু হয় সাফারি।
‘ইউনাইটেড ফর ওয়াইল্ডলাইফ’-এর সভাপতি ডিউক অব কেমব্রিজের অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল কাজিরাঙা ঘোরার। ইচ্ছেপূরণের সকালে দু’জনে চুটিয়ে উপভোগ করেন সাফারি। গন্ডার দেখেন বিস্তর। সঙ্গে ওয়াটার বাফেলো, ইস্টার্ন সোয়াম্প ডিয়ার বা বারাশিঙা, হগ ও বার্কিং ডিয়ার এবং বিভিন্ন ধরনের পাখি।
জঙ্গলের ভিতরেই বিমনি বন শিবিরে সরু কাঠের বেঞ্চে বসে প্রায় মিনিট কুড়ি পার্ক রেঞ্জারদের সঙ্গে কথাও বলেন তাঁরা। জানতে চান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই কাজ কেমন লাগে? রাজদম্পতিকে অনেক পুরনো একটা গল্পও শোনানো হয়। ১৯০৫ সালে নাহারজান চা বাগানে ঘুরতে আসা ভাইসরয়পত্নী লেডি মেরি লেইটার কার্জনকে জঙ্গলের ভিতরে প্রথম গন্ডার দেখিয়ে চমকে দিয়েছিলেন নিগনা শিকারি। তিনিই লেডিকে বোঝান, ‘‘সাহেবদের বলুন গন্ডারবধ বন্ধ না হলে বিপদ।’’ মেরি কলকাতায় ফিরে স্বামীকে অনুরোধ করেন। তারপর কাজিরাঙার ৫৭,২৭৩ একর অরণ্যভূমিকে সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা করেন কার্জন। সেই ঘটনার শতবর্ষপূর্তিতে ২০০৫-এ কার্জনের নাতি ও নাতবৌ কাজিরাঙায়
এসেছিলেন। চোরাশিকারিদের কথা রাজদম্পতিকে জানান ডিএফও এবং রেঞ্জাররা। উইলিয়াম আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কেট জানান, তিনিও শুনেছেন যে আন্তর্জাতিক বাজারে গুজব ছড়ানো হয়েছে, আফ্রিকার গন্ডারের চেয়ে ভারতের গন্ডারের খড়্গে প্রজননক্ষমতা বাড়ানোর ওষধিগুণ বেশি। ব্রহ্মপুত্রের বন্যা, পরিবেশের পরিবর্তন ও কাজিরাঙার আশপাশে লোকালয়বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তা প্রকাশ করেন কেট-উইলিয়াম। জেনে নেন কাজিরাঙা ‘ইকো ডেভেলপমেন্ট কমিটি’র কর্মকাণ্ড। ঘুরে নেন ডুঙ্গা ও রৌমারি বন শিবিরও।
এর পর খানিক বিশ্রাম ও প্রাতরাশ সেরে নেওয়ার পালা। তার পরেই পোশাক পাল্টে নেন দু’জনে। এ বার কেট পরলেন গোলাপি ছাপের উপরে কালো সুতোর এমব্রয়ডারি করা ড্রেস আর উইলিয়ামের পরনে হালকা নীল শার্ট ও ছাই ছাই ফুলপ্যান্ট। রওনা দিলেন পানবাড়ি আদর্শ গ্রামের দিকে। প্রথমে তাঁত বোনার কায়দা দেখে নেন তাঁরা। পরে জুতো খুলে নামঘরে ঢুকে সত্রাধিকারের আশীর্বাদ নেন। চাটাইয়ে বসে শোনেন শঙ্করদেবের মাহাত্ম্য।
পরের গন্তব্য ছিল ডব্লিউটিআই পরিচালিত কাজিরাঙা পশু উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। হাতি ক্লিনিকে গিয়ে একটি হাতির বাচ্চাকে আদর করে তার মুখে দুধের বোতল ধরেন কেট। পশু উদ্ধারকেন্দ্রের অধিকর্তা রথীন বর্মন জানান, কী ভাবে প্রাণীদের আনা, চিকিৎসা করা ও ফের জঙ্গলে ছাড়া হয়। পশু উদ্ধারকেন্দ্রে একটি গন্ডারশাবককেও ফিডিং বোতলে দুধ খাইয়ে দেন কেট। এই কেন্দ্রে চারটি অনাথ চিতাবাঘ আছে। সে ব্যাপারেও খোঁজ নেন কেটরা। হাতি করিডর সংরক্ষণের বার্তা দিতে চিত্রশিল্পী বুলবুল শর্মা হাতির প্রতিকৃতি আঁকছিলেন। তাতে শেষ তুলির টান দেন ডিউক ও ডাচেস। স্থানীয় বাচ্চারাও সেখানে হাতির ছবি আঁকে। কেট জানান, বাচ্চাদের দেখলেই নিজের ছোট্ট সন্তানদের কথা মনে পড়ে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
অবশেষে বিকেলবেলায় একটু হাঁফ ছাড়ার অবকাশ পান রাজদম্পতি। চা বাগান, জঙ্গল আর বিহুর মধ্যে বাকি সময়টা কাটান দু’জনে। কথা বলেন স্থানীয়দের সঙ্গে। তার পরেই ভূমিকম্প! অঘটন অবশ্য কিছু ঘটেনি। রাতেই জানান যায়, সূচিমাফিক কাল ভুটান পাড়ি দেবেন রাজদম্পতি।