Passive Euthanasia

হরিশের নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি মনে পড়াল অরুণার কথা! মুম্বইয়ের নার্সের জন্য সে দিন সম্মতি দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট

যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে বছরের পর বছর ধরে পড়ে ছিলেন হাসপাতালে। চোখে দেখতে পেতেন, কিন্তু তিনি কী দেখছেন তা তাঁর মস্তিষ্ক ঠাওর করতে পারত না। তিনি কথা বলার বা অনুভূতি প্রকাশ করার অবস্থাতেও ছিলেন না।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১১ মার্চ ২০২৬ ২০:২৪
Share:

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

হরিশ রানার নিষ্কৃতিমৃত্যুতে সায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এ দেশে নিষ্কৃতিমৃত্যুর প্রসঙ্গ যখনই উঠে আসে, তখনই উঠে আসে অরুণা শানবাগের কথাও। তাঁর নিষ্কৃতিমৃত্যুর আর্জি খারিজ হয়ে গিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে।

Advertisement

আজ থেকে ৫৩ বছর আগের কথা। ১৯৭৩ সালের ২৭ নভেম্বর। মুম্বইয়ের এক হাসপাতালে ২৫ বছর বয়সি নার্স অরুণাকে যৌন নির্যাতন করা হয়। কুকুর বাধার শিকল দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাঁর উপর নির্যাতন চলে। ওই অত্যাচারের ফলে তাঁর মস্তিষ্কে মারাত্মক ক্ষতি হয়। সেই থেকে চার দশক ধরে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন তিনি। নিউমোনিয়ায় ভুগতে ভুগতে ২০১৫ সালের ১৫ মে অরুণার মৃত্যু হয়। তার আগে অরুণার নিষ্কৃতিমৃত্যুর জন্য শীর্ষ আদালতে আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু তা খারিজ হয়ে যায়। ফলে মৃত্যুর আগে আরও চার বছর ধরে যন্ত্রণাভোগ করতে হয়েছিল অরুণাকে।

১৯৭৩ সালের নভেম্বরের সেই রাতে অরুণা শিফ্‌ট শেষ করে হাসপাতাল থেকে বেরোচ্ছিলেন। সেই সময়েই তাঁর উপর অত্যাচার চলে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তাঁকে। চারপাশে ছড়িয়ে রক্ত। গলায় পরানো কুকুর বাঁধার শিকল। মেডিক্যাল পরীক্ষায় দেখা যায়, শিকল দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাঁকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। অরুণার সহকর্মীদের কথায়, যখন তাঁকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, তিনি কিছু বলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পারেননি। পরে অজ্ঞান হয়ে যান।

Advertisement

শিকল দিয়ে শ্বাসরোধ করার ফলে তাঁর মস্কিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি হয়। এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যে অরুণা চোখে দেখতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু তিনি কী দেখছেন তা তাঁর মস্তিষ্ক ঠাওর করতে পারছিল না। তিনি কথা বলার বা অনুভূতি প্রকাশ করার অবস্থায় ছিলেন না। কোনও অঙ্গও ব্যবহার করতে পারতেন না।

অরুণারা আট ভাইবোন ছিল। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, অরুণার ওই পরিস্থিতি হওয়ার কয়েক দিন পর থেকেই পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য তাঁকে দেখতে আসা বন্ধ করে দেন। যদিও অরুণাকে নিজেদের দূরে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে পরিবার। তাদের পাল্টা দাবি, অরুণাকে দেখতে গেলেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চাপ দিত। বলত, তাঁকে ছুটি করিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু ওই সময়ে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে অরুণার দেখাশোনা করার সামর্থ্য তাদের ছিল না বলেই দাবি পরিবারের।

যৌন নির্যাতনের প্রায় সাড়ে তিন দশক পরে, ২০০৯ সালে অরুণার নিষ্কৃতিমৃত্যুর জন্য সুপ্রিম কোর্টে মামলা রুজু হয়। মামলাটি করেছিলেন লেখক-সাংবাদিক পিঙ্কি ভিরানি। অরুণাকে নিয়ে একটি বইও লেখেন তিনি। তাঁর মামলার প্রেক্ষিতে আদালত মেডিক্যাল প্যানেলের সঙ্গে আলোচনা করে। সেখানে বলা হয়, শারীরিক অবস্থার চিরস্থায়ী ভাবে অবনতির বেশির ভাগই দেখা গিয়েছে অরুণার ক্ষেত্রে। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালের মার্চে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, এমন কোনও রোগীর ‘লাইফ সাপোর্ট’ বন্ধ করার জন্য তাঁর বাবা-মা, কিংবা নিকটাত্মীয়ের সম্মতি থাকা উচিত। তাঁরা না-থাকলে পরবর্তী কোনও নিকট বন্ধুর থেকে এই সম্মতি নেওয়া যেতে পারে। এই মামলার ক্ষেত্রে ভিরানি নিজেকে সেই ‘পরবর্তী নিকট বন্ধু’ বলে দাবি করেন। কিন্তু তাতে আপত্তি জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের যে কর্মীরা গত সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অরুণার দেখাশোনা করে আসছিলেন, তাঁদের দাবি অরুণা বেঁচে থাকুক। ফলে তাঁর নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদন খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট।

আরও পরে, ২০১৪ সালে ফের নিষ্কৃতিমৃত্যুর বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে আদালতে। ‘কমন কজ়’ নামে এক সংস্থা মামলা করে সুপ্রিম কোর্টে। তাদের বক্তব্য, প্রত্যেককে সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করতে দেওয়া উচিত। ওই সময়ে নিষ্কৃতিমৃত্যু সংক্রান্ত মামলা পাঠানো হয় সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে। তখন কেন্দ্র এর বিরোধিতা করেছিল। বলেছিল, এর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। কেন্দ্রের বক্তব্য ছিল, “এক জন চিকিৎসকের কর্তব্য হল জীবন রক্ষা করা। জীবন কেড়ে নেওয়া নয়।” তারও এক বছর পরে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে অরুণার। শেষে ২০১৫ সালে নিউমোনিয়ায় ভুগতে ভুগতে মারা যান তিনি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement