দেশের মধ্যে ছোট ছোট আঞ্চলিক রুটে কম ভাড়ার বিমান পরিবহণে জোর দিতে চায় কেন্দ্রীয় সরকার।
তাতে এক দিকে দেশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন উন্নত হবে, তেমনই আরও বহু মানুষ বিমানে যাতায়াত করার সুবিধা পাবেন।
মালদহ-বালুরঘাট নয়, দেশের যে সব ছোট ছোট শহর থেকে নিয়মিত যাত্রী পাওয়া যাবে, যে সব শহর থেকে ইন্ডিগো-স্পাইসজেটের মতো নির্ধারিত বিমানসংস্থা উড়ান চালাতে আগ্রহী হবে, সেখানে বিমানবন্দর গড়ে তোলা হবে।
ইন্ডিগো-স্পাইস যেমন ছাপ মারা সস্তার বিমানসংস্থা, তেমনই নতুন এই ছোট বিমানবন্দরগুলিও হবে সস্তার বিমানবন্দর। বিশাল টাকা ব্যয় ঝকঝকে টার্মিনাল নয়, উদ্দেশ্য ন্যুনতম পরিষেবা থাকা একটি সাদা-মাটা বিল্ডিং। দিনের মধ্যে হয়তো একবারই সেখান থেকে বিমান ওঠানামা করবে। সে ক্ষেত্রে বিমান ওঠানামার দু’ঘন্টা আগে থেকে খোলা হবে বিমানবন্দর। ফলে, বিমানবন্দর রক্ষণাবেক্ষণের কাজেও খরচ কমে যাবে। সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার সেখানে পুলিশ, দমকল, অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি পরিষেবা দেবে। আর বিদ্যুৎ-জলের মতো প্রয়োজনীয় জিনিস তুলনায় কম দামে দেওয়া হবে বিমানসংস্থাগুলিকে।
এ দেশে বিমানবন্দর ও পরিত্যক্ত রানওয়ে মিলিয়ে সংখ্যাটি এখন ৪৩০। কিন্তু, তার মধ্যে নিয়মিত বিমান ওঠানামা করে ৯০টি বিমানবন্দর থেকে। কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, বাকিগুলির মধ্যে এমন প্রায় ৩০০ পরিত্যক্ত রানওয়ে বা বিমানবন্দর রয়েছে যেগুলিকে উন্নত করে সেখান থেকে নিয়মিত বিমান পরিষেবা চালু করা সম্ভব।
আঞ্চলিক রুটে বিমান পরিষেবার ক্ষেত্রে কেন্দ্রের প্রথম প্রস্তাব কম ভাড়ার টিকিট। কেন্দ্রের মতে, ছোট ছোট রুটে বিমান চালালে সেখানে মূলত মধ্যবিত্ত মানুষ চড়ার সুযোগ পাবেন। সে ক্ষেত্রে খেয়াল-খুশি মতো ভাড়া চাইতে পারবে না বিমানসংস্থাগুলি। তাই, প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, আঞ্চলিক রুটে এক ঘন্টার উড়ানের জন্য কোনওমতেই ভাড়া ২৫০০ টাকার বেশি নেওয়া যাবে না।
আগামী দিনে দেশের বিমান পরিবহনণর গতিপথ কী হবে, তারই একটি খসড়া পরিকল্পনা বানিয়েছে কেন্দ্র সরকার। শুক্রবার দিল্লিতে এই খসড়া রিপোর্ট প্রকাশ করেন বিমানমন্ত্রী অশোক গজপতি রাজু। তিনি জানান, ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে এই পরিকল্পনা কার্যকর করা হবে। তার আগে কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে বিমান পরিবহণ সংক্রান্ত যা যা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তার উপরে বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। সেই পরামর্শ যেমন বিমানসংস্থার তরফে চাওয়া হয়েছে, তেমনই বলা হয়েছে সাধারণ বিমানযাত্রীরাও তাঁদের পরামর্শ জানাতে পারবেন।
কোন কোন রুটকে আঞ্চলিক রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে?
কেন্দ্রের বিমানমন্ত্রকের এক কর্তার কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কলকাতা থেকে অন্ডালকে একটি আঞ্চলির রুট বলে গণ্য করা হবে। বিভিন্ন রাজ্যে এমন বহু শহর রয়েছে যেখান থেকে এখনও নিয়মিত বিমান ওঠানামা করে না। সেখান থেকে দেশের যে কোনও শহরে যাওয়ার ক্ষেত্রেই প্রয়োজ্য হবে আঞ্চলিক রুটের তত্ত্ব।’’ কেন্দ্র জানিয়েছে, সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের এমন বহু অকেজো হয়ে পড়ে থাকা বিমানবন্দরকে নতুন করে গড়ে তোলা হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে বেসরকারি সংস্থার সঙ্গেও গাঁটছড়া বাঁধতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার। নিয়মিত যাত্রী নিয়ে আকাশে উড়ে বেড়ানো বিমানসংস্থাগুলি এই সব ছোট বিমানবন্দরে উড়ান নিয়ে ওঠানামা করলে জ্বালানি, বিমানবন্দর কর সহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে ছাড় পাবে।
প্রশ্ন উঠেছে, এত অকেজো বিমানবন্দর নতুন করে গড়ে তুলতে গেলে যে বিশাল টাকার প্রয়োজন তা কোথা থেকে পাবে কেন্দ্র?
এই খসড়া প্রস্তাবেই তার সুরাহা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের প্রস্তাব, জানুয়ারি মাস থেকে দেশের সর্বত্র বিমান ভাড়ার উপরে ২ শতাংশ অতিরিক্ত কর নেবে কেন্দ্র সরকার। এ ভাবে বছরে ১৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আসবে কেন্দ্রের ঘরে। এই টাকাই ব্যায় করা হবে আঞ্চলিক বিমানবন্দর তৈরির কাজে।
স্পাইসজেট ও ইন্ডিগো কেন্দ্রীয় সরকারের এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে। দুই সংস্থার দুই কর্তা অজয় সিংহ এবং আদিত্য ঘোষ জানান, অতিরিক্ত ২ শতাংশ করের টাকা বিমান পরিবহণে বিনিয়োগ করলে লাভ হবে তাঁদেরই। আঞ্চলির রুটে যে ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেগুলি কার্যকর করা হলেও তাঁদের সুবিধা হবে।
এত দিন দেশের বিমানসংস্থায় বিদেশি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৪৯ শতাংশ। প্রস্তাবে তাও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এত দিন ন্যুনতম পাঁচ বছর দেশের মধ্যে উড়ান চালালে এবং হাতে কমপক্ষে ২০টি বিমান থাকলে তবেই আন্তর্জাতিক উড়ান চালানোর ছাডপত্র পেত দেশীয় বিমানসংস্থাগুলি। সেই নিয়মেই পরিবর্তন চায় কেন্দ্র। প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে তা নিয়েও। ভারতে বসে যাঁরা বিমান রক্ষণাবেক্ষণ ও সারাইয়ের কাজ করবেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও কর ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েচে।