ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে সনিয়া ও রাহুল গাঁধী। মঙ্গলবার দিল্লিতে কংগ্রেস কার্যালয়ে। ছবি: পিটিআই।
আপাতত যেমন চলছে, তেমনটাই চলবে কংগ্রেসে। আরও এক বছর দলের সভাপতি থাকছেন সনিয়া গাঁধী। সহসভাপতি রাহুল। মা-ছেলে দু’জনেই হবেন দলের আক্রমণের মুখ। তবে জমিতে রাজনৈতিক লড়াই থেকে শুরু করে দলীয় সংগঠন সামলাবেন রাহুল। আর সভানেত্রী হিসেবে সময়-সময় সনিয়া সরকার ও বিজেপিকে তুলোধোনা করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেবেন। যেমনটা আজও করেছেন তিনি।
খাদ্যপণ্যের দাম বাড়া ও অর্থনীতির নড়বড়ে অবস্থা নিয়ে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ছে বুঝেই সেটাকে রাজনৈতিক ভাবে কাজে লাগাতে চাইছেন সনিয়া। তাঁর বক্তব্য, ‘‘প্রধানমন্ত্রী ভোট প্রচারে যে সব বড় বড় কথা বলেছিলেন, এখন বোঝা যাচ্ছে সব ছিল হাওয়াবাজি। খবরের শিরোনামে থাকতে প্রধানমন্ত্রী যে সব লম্বা-চওড়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার একটিরও বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টে জিনিসের দাম বেড়েছে, অর্থনীতির অবস্থা খারাপ, তৈরি হয়নি কাজের সুযোগ। সরকারের মেক ইন ইন্ডিয়া প্রচারও একেবারেই ফাঁপা!’’
সনিয়ার আক্রমণের জবাবে কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী স্মৃতি ইরানি বলেন, ‘‘হুমড়ি খেয়ে পড়া দল ও নেতৃত্বের ব্যর্থতা লুকোতেই সনিয়া গাঁধী প্রধানমন্ত্রীকে নিশানা করছেন। হাওয়াবাজির কথা তাঁর মুখে মানায় না। চল্লিশ বছর ধরে হাওয়াবাজি করে সেনাকর্মীদের পেনশন নীতি ঝুলিয়ে রেখেছিল কংগ্রেসই!’’ পরে ‘কংগ্রেস কেন রাহুল গাঁধীর নেতৃত্বের উপরে ভরসা রাখতে পারছে না, টুইটারে সেই প্রশ্নও তোলেন স্মৃতি।
বিজেপি শিবিরে ধারণা, এই প্রশ্ন উঠবে বুঝেই নজর ঘোরাতে সনিয়া এ দিন তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন মোদী সরকারের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া, শিল্প মহলের আস্থা অর্জন করতে এ দিনই বড় ব্যবসায়ীদের বৈঠকে ডেকেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে মুখর হয়ে সনিয়া ওই বৈঠকের আবহটাই কৌশলে ঘেঁটে দিতে চেয়েছেন এ দিন। কংগ্রেস নেতাদের অবশ্য বক্তব্য, সনিয়ার লক্ষ্য দলের নেতা-কর্মীদের লড়াইয়ে উজ্জীবিত করা। এরই পাশাপাশি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি আজ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা-ও দলের পক্ষে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যার মোদ্দা কথাটি হল, দলে রাহুলের পদোন্নতি পিছিয়ে গেল আরও এক বছর। সভানেত্রী পদে সনিয়ার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল আগামী ডিসেম্বরে। ঠিক ছিল, তার আগেই সাংগঠনিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সভাপতি পদের দায়িত্ব নেবেন রাহুল। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সেই প্রক্রিয়া সেরে ফেলার পরিকল্পনাও তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এখন কেন পিছিয়ে এল দল?
কংগ্রেস শীর্ষ সূত্রে বলা হচ্ছে, কারণ অনেকগুলি।
• লোকসভা ভোটের পরপর দলে রাহুলের কর্তৃত্ব নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছিল সে সময় তাঁকে সভাপতি করা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু মাস দুই ছুটি কাটিয়ে আসার পর থেকে নব-অবতারে রাহুল যে ভাবে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে সরব থেকেছেন, তাতে কর্তৃত্বের প্রশ্নটি আর সে ভাবে উঠছে না।
• সনিয়া-রাহুল দ্বৈত নেতৃত্বের যে কাঠামো এখন সামনে রেখেছেন, আগে তা কংগ্রেস ভাবতেই পারত না। এখন দেখা যাচ্ছে স্বচ্ছন্দে চলছে এই ব্যবস্থা। আলঙ্কারিক সভাপতি কখনও কখনও মাঠে নামছেন। জমিতে লড়াই ও সংগঠন চালাচ্ছেন রাহুল।
• চাপিয়ে দেওয়া সভাপতি না হয়ে রাহুল সাংগঠনিক ভোটের মাধ্যমে দলের শীর্ষপদ অর্জন করতে চান। তারই জমি তৈরি করছেন তিনি।
• মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আগ্রাসী প্রচারে নেমে রাহুল একটা রাজনৈতিক উচ্চতা অর্জন করেছেন। এখন সভাপতি হলে বাড়তি কোনও উচ্চতা যোগ হবে না। বরং বছরখানেক বাদে যখন মোদী সরকার প্রায় মধ্যমেয়াদে পৌঁছে যাবে ও পরের লোকসভা ভোটের হাওয়া উঠবে, তখন তাঁকে সভাপতি নির্বাচিত করলে বরং দলেও নতুন শক্তিসঞ্চার ঘটবে।
এই সব কারণে ওয়ার্কিং কমিটি দলে স্থিতাবস্থা রাখার পক্ষেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ। আর একটি ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না কংগ্রেসে। নেতা হিসেবে রাহুলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে দলীয় সাফল্যের ঝোল তাঁর কোলে টানার চেষ্টা বারবারই দেখা গিয়েছে কংগ্রেসে। এ বারেও ব্যতিক্রম হচ্ছে না। এই দফায় শুরুটা করে দিয়েছেন খোদ সভানেত্রীই। ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে সনিয়া আজ বলেন, ‘‘রাহুলের গতিশীল নেতৃত্বে কংগ্রেস কর্মীদের আন্দোলনের জন্যই জমি অধ্যাদেশ থেকে পিছু হটেছে সরকার।’’ জমি আইন সংশোধন রুখে দেওয়ার কৃতিত্ব আনুষ্ঠানিক ভাবে রাহুলকে দেওয়ার ব্যবস্থাও শুরু হয়েছে দলে। স্থির হয়েছে, আগামী ২০ সেপ্টেম্বর দিল্লি বা হরিয়ানায় কৃষকসভা হবে জমি আন্দোলনের সাফল্য উদযাপনে। সন্দেহ নেই, রাহুলই হবেন সেই সভার মুখ।