করিমগঞ্জে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিআসএফ শিবিরে রাজনাথ সিংহ। রবিবার। —উত্তম মুহরী
অসম ও বাংলাদেশের সীমান্ত এ বছরের মধ্যেই পুরোপুরি কাঁটাতারে ঘিরে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ। সেই সঙ্গে তিনি জানালেন, শুধু ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা নয়, বরাকের উন্নয়নেও কেন্দ্র সমান আগ্রহী। রাজনাথ বলেন, ‘‘সামনেই বিহু উৎসব। আশা করি অসমবাসী তার আগেই ক্ষমতাসীন দলের বদলে নতুন সরকার গড়বেন।’’
আজ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে করিমগঞ্জের নীলমণি রোড সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন প্রদেশ বিজেপির সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল, অসমে দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মহেন্দ্র সিংহ, রাজ্য বিজেপির নির্বাচন কমিটির মুখ্য আহ্বায়ক হিমন্তবিশ্ব শর্মা এবং ছাত্র সংগঠন আসুর মুখ্য উপদেষ্টা সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্য। এই প্রথম কোনও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করিমগঞ্জ সফরে এলেন। তাই সফর নিয়ে আম-জনতার উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
সমুজ্জ্বল রাজনাথের কাছে অভিযোগ করেন— ‘‘দেশের পশ্চিম প্রান্তের সীমান্ত মাত্র তিন বছরে মধ্যে পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে। অসমে জল এবং স্থলসীমান্তের দৈর্ঘ্য মাত্র ২৬৮ কিলোমিটার। কিন্তু অসম চুক্তির তিরিশ বছর পরেও সেখানে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর কাজ শেষ হল না।’’ উত্তরে রাজনাথ জানান, করিমগঞ্জে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের যে সাড়ে তিন কিলোমিটার অংশে এখনও কাঁটাতারের বেড়া বসানো হয়নি, সেখানে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করা হবে। বাংলাদেশ ভারতকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে করিমগঞ্জে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর সময় তারা আর আপত্তি করবে না। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, বাংলাদেশ থেকে জাল নোট যাতে ভারতে আসতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ করবে কেন্দ্র। নদী-সীমান্তে বসানো হবে ফ্লাডলাইট। অসমের সন্ত্রাস প্রসঙ্গে রাজনাথ বলেন, ‘‘এখনও যারা মূলস্রোতে ফিরে আসেনি, তাদের আলোচনায় স্বাগত। অস্ত্র নয়, রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই বড় সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।’’
সীমান্ত ঘুরে এসে রামকৃষ্ণনগরে জনসভা করেন রাজনাথ। দশ হাজার মানুষের ভিড়ে ঠাসা জনসভায় অসম তথা উত্তর-পূর্বের অনুন্নয়নের দায় কংগ্রেস তথা ইউপিএ সরকারের উপরে চাপান রাজনাথ। তিনি বলেন, ‘‘বিজেপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখনই অসম-সহ উত্তর-পূর্বের কথা চিন্তা করেছে। অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে শিলচর-সৌরাষ্ট্র মহাসড়কের কাজ শুরু হয়েছিল। তা খুব শীঘ্রই শেষ করবে বিজেপি সরকার।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘বরাক উপত্যকায় প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। বরাকের লোক অত্যন্ত পরিশ্রমী। এখানকার মানুষ যাতে ভারতের অন্যান্য বিকশিত রাজ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেন, সে ব্যবস্থা করবে কেন্দ্রীয় সরকার।’’ রাজনাথ আরও জানান, কেন্দ্র অসম তথা উত্তর-পূর্বে সড়ক নির্মাণ ও মেরামতির জন্য ৯২ হাজার কোটি টাকা খরচ করবে। তার সিংহভাগ পাবে অসম। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে অভ্যন্তরীণ সড়ক ও জলপথ পরিবহণের উন্নয়নে। রাজ্যে ইন্টারনেট যোগাযোগে বিকাশের উদ্দেশে ‘ফাইবার অপটিক্স কেব্ল’ পাতার জন্য কেন্দ্র বরাদ্দ করেছে ৭ হাজার কোটি টাকা। তাঁর দাবি, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি ঢেলে সাজার জন্য যে পরিমাণ টাকার প্রয়োজন ছিল, তা বরাদ্দ করেছে কেন্দ্র। নতুন নাগরিক পঞ্জি প্রস্তুত হলে অনুপ্রবেশ সমস্যা অনেকাংশেই মিটে যাবে। তিনি জানান, কেন্দ্র বাংলাদেশ থেকে আসা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আগেও আশ্রয় দিয়েছে, ভবিষ্যতেও দেবে।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সীমান্ত-সফর নিয়ে ক্ষুব্ধ। তাঁর অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সীমান্ত পরিদর্শনে গেলে রাজ্যের সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্তা, জেলাশাসক এবং ডিজিপি তাঁর সঙ্গী হন। তাঁরাই বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে মন্ত্রীকে অবহিত করেন। গগৈয়ের দাবি, রাজ্য সরকার এ নিয়ে রাজনাথকে প্রস্তাব দেওয়ার পরেও তিনি তা অগ্রাহ্য করে সীমান্ত ভ্রমণ করলেন। গগৈ বলেন, ‘‘রাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে রাজনাথের সঙ্গে আইজি (এসবি) এইচ সি নাথের যাওয়ার কথা ছিল। তাঁকেও ছেঁটে ফেলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এমন ঘটনা আমার রাজনৈতিক জীবনে আগে কখনও দেখিনি। দলের নেতাদের নিয়ে সীমান্ত-সফরের নামে আসলে রাজনীতি করতে এসেছেন রাজনাথ।’’ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অঞ্জন দত্তও রাজনাথের সফরকে ‘সরকারি খরচে লোকদেখানো ভ্রমণ’ বলে মন্তব্য করেন।
জনসভায় কংগ্রেস সরকারের কড়া সমালোচনা করেন হিমন্ত ও সর্বানন্দ। হিমন্ত বলেন, ‘‘কেন্দ্রের কাছ থেকে মোটা টাকা পেয়েও রাজ্য সরকার শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছে না।’’ সর্বানন্দ জানান, পাঁচগ্রামে কাছাড় কাগজ কল বাঁচিয়ে রাখতে কেন্দ্র বদ্ধপরিকর। তিনি বরাকের তিনটি জেলায় উন্নতমানের খেলার মাঠ তৈরি করার কথা ঘোষণা করেন এবং স্বামী বিবেকানন্দের নামে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের কথাও বলেন।
এ নিয়ে গগৈ বলেছেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে অসমকে দেওয়া কোনও প্রতিশ্রুতিই রাখতে পারেননি নরেন্দ্র মোদী। তাঁর প্রদেশ নেতৃত্বও ব্যর্থ। তাই কেন্দ্রীয় নেতারা নির্বাচনে বিজেপিকে
জেতানোর জন্য বার বার দিল্লি থেকে আসছেন।’’ এ দিন বিকেলে বিএসএফের বিশেষ বিমানে রাজনাথ গুয়াহাটিতে আসেন। আগামী কাল তিনি ধুবুরি সীমান্ত ঘুরে দেখবেন। সন্ধ্যায় প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির নেতৃত্বে কংগ্রেসের পাঁচ প্রতিনিধি ব্রহ্মপুত্র রাজ্য অতিথিশালায় রাজনাথের সঙ্গে দেখা করেন। পরে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি বলেন, ‘‘সম্প্রতি বিজেপি কর্মীরা যে ভাবে রাজীব ভবনে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর চালিয়ে কংগ্রেস কর্মীদের জখম করেন, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিযোগ জানিয়েছি। রাজনাথ জানিয়েছেন, এ নিয়ে কোনও খবর তাঁর জানা নেই। আমরা আর্জি জানিয়েছি, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে।’’ সেই সঙ্গে অসমকে বিশেষ মর্য্যাদাপ্রাপ্ত রাজ্যের তালিকায় রাখা ও সরকারি অনুদানে আগের নীতি বজায় রাখার আবেদনও জানায় কংগ্রেস। পাশাপাশি অঞ্জনবাবু আরও জানান, কেন্দ্র গ্রাম সড়ক যোজনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ-সহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা বকেয়া রেখেছে। অবিলম্বে টাকা মঞ্জুর করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কংগ্রেস আগামী কাল দীঘলিপুখুরির তীরে ধর্না কর্মসূচি নিচ্ছে।