ঠেকে শেখা মোদী সংস্কারই করুন, চায় শিল্পমহল

গরুকে খাওয়ালে দুধ দেবে, কিন্তু গরুকে ব্যবহার করলে গোবর মিলবে —এটাই প্রাচীন প্রবাদ। বিহার ভোটের ফলপ্রকাশের পরে বক্তা শিল্পপতি হর্ষ গোয়েন্কা।

Advertisement

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০১৫ ০৩:৫৪
Share:

গরুকে খাওয়ালে দুধ দেবে, কিন্তু গরুকে ব্যবহার করলে গোবর মিলবে —এটাই প্রাচীন প্রবাদ। বিহার ভোটের ফলপ্রকাশের পরে বক্তা শিল্পপতি হর্ষ গোয়েন্কা।

Advertisement

আর এক শিল্পপতি কিরণ মজুমদার শ’ স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, ‘‘বিহার ভোট পিছনে রেখে মোদী সরকার এখন শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে মন দিতে পারবে।’’

টি ভি মোহনদাস পাইয়ের কথায়, ‘‘এ বার সংস্কারের যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে আশা করছি। সরকার শিল্পমহলের সঙ্গে আরও বেশি করে যোগাযোগ রেখে চলুক।’’

Advertisement

ইনফোসিসের এস গোপালাকৃষ্ণণ বলছেন, ‘‘ভোটের পরে আর্থিক বৃদ্ধিতে নজর দিক সরকার।’’

নরেন্দ্র মোদীর জন্য বার্তা স্পষ্ট। বিহার ভোটে হেরেছেন। এ বার গোমাংস নিয়ে রাজনীতি ছাড়ুন। শুধু এবং শুধুমাত্র উন্নয়নের কাজে মন দিন। বিহারে বিজেপি গো-হারা হেরে যাওয়ার পরে শিল্পমহল একমত, গোমাংস বিতর্কের মতো অনাবশ্যক বিষয় থেকে নজর সরিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকারের উচিত আর্থিক সংস্কারে মন দেওয়া। ঔদ্ধত্য ছেড়ে শিল্প নিয়ে বিরোধী শিবিরের সঙ্গে কথা বললে সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তোলাও সহজ হবে বলে তাঁদের মত।

Advertisement

শিল্পমহলের এমন জোরালো বার্তার পিছনেও হয়তো কাজ করেছে আশঙ্কা। তাঁদের উদ্বেগের কারণ হল, বিহারের ফলাফলের পরে উল্টো পথে হেঁটে মোদী সরকার যেন খয়রাতির রাজনীতি শুরু না করেন। মোদী এখন যে ভাবে শিল্পের সুবিধায় সংস্কারের বদলে গরিব মানুষের সংস্কারের কথা বলতে শুরু করেছেন, তাতে তাঁদের চিন্তা বেড়েছে। এর পর পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, অসম, তামিলনাড়ুতে বিধানসভা নির্বাচন। সে দিকে তাকিয়ে খয়রাতির পালা শুরু হলে রাজকোষ ঘাটতি লাগামছাড়া হতে পারে। এমনিতেই যেখানে বেসরকারি লগ্নি আসছে না, সেখানে লগ্নিকারীরা আরও মুখ ফিরিয়ে নেবেন। শিল্পপতি মোহনদাস পাইয়ের তাই পরামর্শ, ‘‘এটা ‘ওয়েক আপ কল’ ছিল। মোদী সরকার এ বার শিল্প-বাণিজ্যের আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে
চেষ্টা করুক।’’

শিল্পমহলের আশঙ্কা, এই ফলাফলের পরে এক দিকে শেয়ার বাজারে ধস নামতে পারে। অন্য দিকে সংসদে বিল পাশ করানো আরও কঠিন হবে। এর ধাক্কায় যাতে মন্দার পরিবেশ তৈরি না হয়, তার জন্য মুখ বুজে সংস্কারের কাজ চালিয়ে যাওয়াটাই একমাত্র দাওয়াই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিহারে জিতলে মোদীর পক্ষে আর্থিক সংস্কারের গতি বাড়ানো সহজ হতো বলে শিল্পমহল একমত ছিলেন। কারণ তা হলে কংগ্রেস তথা বিরোধী শিবির আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে সরতে বাধ্য হতো। আর বিহারে জিতে ভবিষ্যতে রাজ্যসভায় কিছু আসন বাড়াতে পারলে বিল পাশ করানোও সহজ হতো। কিন্তু সে গুড়ে বালি। তা সত্ত্বেও ব্যাপারটা হয়তো এক দিক থেকে ভালই হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। হর্ষ গোয়েন্কা যেমন বলছেন, ‘‘বিহারের ফল উন্নয়নের কর্মসূচির জন্য হয়তো ভাল খবর নয়। কিন্তু আশা করা যায়, এই সব ছুটকোছাটকা, অসহিষ্ণু লোকজন নিয়ন্ত্রণে আসবে।’’

শিল্পমহল তথা অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, আসন্ন শীতকালীন অধিবেশনে বিরোধীরা মোদী সরকারের বিরুদ্ধে সুর আরও চড়াবেন। জমি বিল তো দূরের কথা, শ্রম আইনের সংস্কারও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। সেই আশঙ্কা থেকেই আজ কিরণ মজুমদার শ’ অর্থনৈতিক সংস্কারের বিলে সরকারকে সমর্থন করতে বিরোধীদের কাছে আর্জি জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, ‘‘কংগ্রেসকেও নিজের নীতি সংশোধন করতে হবে। না হলে সংস্কার বিলের বিরোধিতা ভোটারদের থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।’’ সংসদে দীর্ঘদিন আটকে রয়েছে জিএসটি বিল। আর্থিক সংস্কারের বিলগুলি তো বটেই, শীতকালীন অধিবেশনে এটি নিয়েও বিরোধীদের সঙ্গে কোনও সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বলেই শিল্পমহল মনে করছে।

বিহারের ফলাফলের পরে আর একটি আশঙ্কা প্রায় সব সংস্থার সিইও-দেরই চাপে ফেলছে। তা হল, শেয়ার বাজারে ধস। বিহার ভোটের ফলাফল কী হবে, সেই দুশ্চিন্তায় কয়েক দিন ধরেই শেয়ার বাজার থমথমে হয়ে ছিল। সোমবার বাজার খুললে শেয়ার সূচকের পতনের আশঙ্কায় রয়েছেন তাঁরা। লম্বা সময় ধরে না হলেও অন্তত সাময়িক ভাবে এই সঙ্কট আসতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। বিএসই-এনএসই-র সদস্য দীপন মেটার মতে, ‘‘বিজেপি শুধু হারেনি, বড় ব্যবধানে হেরেছে। সেই ব্যবধানটা লগ্নিকারীদের মাথায় ঘুরতে থাকবে।’’ শেয়ার বাজার বিশেষজ্ঞ অজয় শ্রীবাস্তবের যুক্তি, ‘‘এই ভাবে বিজেপির ভরাডুবি হবে, সেটা কেউই ভাবেনি। সামনে তাই যথেষ্ট সমস্যা।’’

যদিও এই পরিস্থিতিতেও সরকারের কাছে আর্থিক সংস্কারের সাহসী পদক্ষেপের জন্য চাপ বজায় রাখছে শিল্পমহল। একই সঙ্গে চাইছে শাসক শিবিরের একাংশের মনোভাবের পরিবর্তন। সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের অর্থনীতিবিদ রাজীব কুমারের মতে, ‘‘উন্নয়নে নজরের পাশাপাশি ঢাকঢোল কম পেটানো ও নম্র থাকা জরুরি। প্রধান সেবক (মোদী) শুধু কথা বললে হবে না, কাজ করেও দেখাতে হবে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement