তেলের সঙ্গেই কমার কথা, রেলে চিন্তা ভাড়া বাড়ানোর

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে নেমে এসেছে গত দেড় বছরে। কিন্তু পাল্লা দিয়ে কমা তো দূর, রেলের যাত্রিভাড়া এক চুলও কমেনি। বরং রেল চালানোর অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়া ও সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ মানতে গিয়ে আগামী বাজেটে ভাড়া একপ্রস্ত বাড়ানোর কথা ভাবতে হচ্ছে রেলকে।

Advertisement

অনমিত্র সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০১৫ ০৩:০৩
Share:

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে নেমে এসেছে গত দেড় বছরে। কিন্তু পাল্লা দিয়ে কমা তো দূর, রেলের যাত্রিভাড়া এক চুলও কমেনি। বরং রেল চালানোর অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়া ও সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ মানতে গিয়ে আগামী বাজেটে ভাড়া একপ্রস্ত বাড়ানোর কথা ভাবতে হচ্ছে রেলকে।

Advertisement

সঙ্গে রয়েছে অস্বস্তির কাঁটা। কারণ ভাড়া কেন কমছে না, এই নিয়ে তথ্যের অধিকার আইনে কেউ প্রশ্ন তুললে কিংবা আদালতের দ্বারস্থ হলেই মুখ পুড়তে পারে রেলের। কারণ, নিয়ম বলছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে ট্রেনের টিকিটের দাম বাড়বে। আর নেমে এলে কমবে রেলের ভাড়া। এবং সেই লক্ষ্যেই ইউপিএ জমানায় ঘটা করে ‘ফুয়েল অ্যাডজাস্টমেন্ট কম্পোনেন্ট (এফএসি)’ নীতি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু হিসেব যে সব সময় সমানুপাতিক হয় না, সুরেশ প্রভুর রেল এখন তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

এফএসি নীতি মেনে গত দেড় বছরে তেলের দাম কমে আসার অনুপাতে রেলের ভাড়া কমার কথা থাকলেও, এখন সেই সমীকরণ মানা তো দূর, উল্টে ওই নীতি বাতিল করতে পারলে বাঁচেন প্রভুরা। রেল মন্ত্রকের বক্তব্য, ক্রমাগত ক্ষতিতে চলা রেলের যা আর্থিক হাল, তাতে ভাড়া কমানোর কথা ভাবাই যায় না। তারই মধ্যে গত কাল সপ্তম বেতন কমিশনের রিপোর্ট জমা পড়ায় ৩০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত চাপ আসছে রেলের ঘাড়ে। এই পরিস্থিতিতে আগামী বাজেটে সব শ্রেণিতে ভাড়া বাড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না শীর্ষ রেলকর্তারা।

Advertisement

এমন উলটপুরাণ যে হতে পারে, ঝানু রেলকর্তারাও তা ভাবেননি। তেলের দাম এ ভাবে তলানিতে এসে ঠেকবে, এফএসি নীতি চালু করার সময় তা আঁচ করতে পারেননি কেউই। তৃণমূলের দীনেশ ত্রিবেদী তখন রেলমন্ত্রী। তাঁর আগে লালুপ্রসাদ ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় ভাড়া না বাড়ায় এমনিতেই নাভিশ্বাস উঠছিল রেলের। এর উপরে আন্তর্জাতিক বাজারে তখন তেলের হু হু করে দাম চড়ছে। খরচ সামলাতে নাজেহাল দশা রেলের। অখচ দীনেশের দলনেত্রী মমতা ভাড়া বাড়ানোর ঘোর বিপক্ষে। এই অবস্থায় রেলকে ভরাডুবির হাত থেকে

বাঁচাতে ঘুরপথ নেন দীনেশ ও তাঁর আমলারা। টিকিটের মোট ভাড়ার ত্রিশ শতাংশ খরচ হয় জ্বালানি খাতে। রেলের মূল ভাড়া থেকে সেই জ্বালানি খরচকে আলাদা করে দেখিয়ে সেটিকে বাজারে তেলের দামের ওঠানামার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। যাতে অন্তত কিছু টাকা আসে রেলের কোষাগারে। অথচ ভাড়া বাড়ানোর রাজনৈতিক দায় না চাপে সরকার বা শাসক শিবিরের উপরে। মানুষের ঘাড়ে বাড়তি বোঝা চাপানোর বিরোধিতা হয়েছিল তখনও। কিন্তু রেলে এই নীতির প্রয়োগকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছিলেন তখন। বিমানের ভাড়া এ ভাবেই ঠিক হয়। রেলেও সেই নিয়মের প্রয়োগকে সঙ্গত বলেই দাবি করেছিল রেল মন্ত্রক। এফএসি চালু করার পরে ইউপিএ জমানার শেষ পর্বে বছরে দু’বার দাম বাড়ে টিকিটের। কিন্তু মোদীর আমলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ক্রমাগত কমছে। তেল খরচ বাবদ সাশ্রয়ও হচ্ছে। কোষাগার ভরতে বিকল্প পথও খুঁজছে রেলও। বাড়ানো হয়েছে প্রিমিয়ার ট্রেন। যার ভাড়া অনেক বেশি। বেড়েছে টিকিট বাতিল করার খরচ। দিন দু’য়েক আগে বেড়েছে প্যাসেঞ্জার ট্রেনের ন্যূনতম ভাড়াও। তবু এফএসি মেনে টিকিটের দাম কমানো অসম্ভব, বলছেন রেল-কর্তারা।

Advertisement

কেন?

তাঁদের যুক্তি, রেলের অন্যান্য খরচ (ইনপুট কস্ট) বেড়ে গিয়েছে অনেকটাই। এক রেলকর্তা হিসেব দিলেন, ‘‘বছরে দু’বার মহার্ঘভাতার দায় নিতে হয়েছে রেলকে। বিদ্যুৎ খাতে খরচ বেড়েছে। নতুন-পুরোনো প্রকল্পের দায় রয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি আর্থিক বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতিতে চলছে রেল। এই অবস্থায় এফএসি নীতি মেনে ভাড়া কমানো অসম্ভব।’’ বোঝার উপর সপ্তম বেতন কমিশন এখন শাকের আঁটি। মন্ত্রকের মতে, প্রায় ২৭ লক্ষ কর্মী ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মীকে নতুন হারে বেতন ও পেনশন দিতে চলতি আর্থিক বছরেই প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বাড়তি বোঝা চাপবে। এই অবস্থায় এফএসি মেনে ভাড়া কমাতে না পারার জন্য রেল যে নীতিগত ভাবে অস্বস্তিতে, সে কথা কবুল করেই এক রেলকর্তা বললেন, ‘‘কে জানত, এ ভাবে তেলের দাম কমে আসবে!’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement