ফের ‘বিদেশি’-দের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। শুরু হবে পুলিশি ধরপাকড়। এতে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে বরাকে।
তালিকাভুক্তদের অধিকাংশই যে ভারতীয়, তা নিয়ে নিশ্চিত পুলিশও। গত ছ’মাসে ৪৩ জনকে বিদেশি সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাঁদের এক জনও এখন জেলে বন্দি নেই। ২৬ জনকে ভারতীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি ১৭ জন উপযুক্ত নথি দেখিয়ে জামিন পেয়েছেন। এই সপ্তাহেই ২ জন গৌহাটি হাইকোর্টে গিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখিয়েছেন।
এর পরও কাছাড় জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সীমান্ত) গায়ত্রী কোঁয়র জানিয়েছেন, তালিকায় নাম থাকা আরও অনেকের হদিস মিলেছে। দুর্গোৎসবের জন্য কয়েক দিন কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। এখন ফের সেই প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সেপ্টেম্বরের বিজ্ঞপ্তি যাঁদের স্বস্তি দিয়েছিল, তাঁরা ফের আশঙ্কায় পড়েছেন। ওই বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্র জানিয়েছিল— বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে ধর্মীয় কারণে নির্যাতনের শিকার হয়ে যাঁরা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাঁদের বিতাড়ন করা হবে না। কিন্তু অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, আদালত যাঁদের বিদেশি বলে রায় দিয়েছে, তাঁদের গ্রেফতার করতেই হবে। কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তি আইনি প্রক্রিয়ায় কোনও পরিবর্তন আনতে পারেনি। অন্তত পুলিশের কাছে এ সংক্রান্ত কোনও নির্দেশ আসেনি। তা ছাড়া নাগরিকত্ব আইন সংশোধন না হলে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের মামলা থেকেও ধর্মীয় কারণে নির্যাতিতরা রেহাই পাবেন না। সেগুলিও যথারীতি
চলতে থাকবে।
২০১৫ সালের শুরুতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্ট কড়া অবস্থান গ্রহণ করলে রাজ্য পুলিশ নড়েচড়ে বসে। বিভিন্ন সময়ে আদালত যাঁদের বিদেশি বলে রায় দিয়েছে, তাঁদের বড় অংশকে পুলিশ খুঁজে পাচ্ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ বা নির্বাচন শাখা সন্দেহের দরুণ তাঁদের নামে বিদেশি বলে মামলা ঠুকেছে। অভিযোগ, তাঁদের অনেকে মামলার নোটিস হাতে পাননি। অনেকে নাম-ঠিকানায় ভুল থাকায় গুরুত্ব দেননি। আদালত অভিযুক্তদের না পেয়ে একতরফা ভাবে তাঁদের বাংলাদেশি বলে রায় দিয়েছে। রাজ্য জুড়ে তাঁদেরই এখন খুঁজে বেড়াচ্ছে পুলিশ। কাছাড়েও কয়েক দিনের মধ্যে ফের
ধরপাকড় শুরু হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গায়ত্রীদেবী সে জন্য সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবকেই দায়ী করেন। দোষ দেন রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলিকেও। তিনি বলেন, ‘‘কাউকে ধরে জেলে পুরলে সবাই হইহল্লা করেন। কিন্তু তাঁরা ওই সব লোকেদের আগে থেকে আদালতে যেতে পরামর্শ দেয় না।’’ তাঁর বক্তব্য, পুলিশ যাঁদের বিদেশি বলে খুঁজে বেড়াচ্ছে, তাঁদের তালিকা এ নিয়ে দু’তিনবার প্রকাশিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ না জানলেও নেতাদের এ সব না জানার কথা নয়। ওই তালিকাভুক্তদের যাঁরা প্রকৃত ভারতীয়, তাঁদের সমস্ত নথিপত্র দিয়ে একটা বিবিধ মামলা (মিসলেনিয়াস কেস) করলেই হয়ে যায়। এ কথাটুকু দায়িত্ব নিয়ে কেউ জানাচ্ছে না। রাজ্য পুলিশের সীমান্ত শাখার সদ্য প্রকাশিত তালিকা দেখে অবশ্য অনেকের দুশ্চিন্তা বেড়ে গিয়েছে। প্রতিমা পাহাড়ির মতো যাঁদের একবার গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আদালত ভারতীয় বলে ঘোষণাও করেছে, তাঁদেরও নাম তাতে রয়ে গিয়েছে। গায়ত্রীদেবী বলেন, ‘‘আসলে ভারতীয় বলে ঘোষিত সবার নাম প্রক্রিয়াগত কারণে পুরনো তালিকা থেকে বাদ পড়েনি। তবে আদালত যাঁদের ভারতীয় বলে রায় দিয়েছে, তাঁদের ধরপাকড়ের প্রশ্নই ওঠে না।’’
বরাকবাসীর উদ্বেগের আরও কারণ, পুলিশ যে যাঁকে-তাঁকে বিদেশি বলে সন্দেহ করে আদালতে মামলা পাঠায়, ওই তালিকাতেই তা স্পষ্ট। প্রতিমা পাহাড়ির মত অনেক আদিবাসীর নাম রয়েছে তাতে। বিক্রমপুর-সহ বেশ কয়েকটি চা বাগানের শ্রমিককে বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। একই ভাবে সন্দেহের তালিকায় ছিলেন শরত খাসিয়া, পুতই নাগা, খন্তি রিয়াং, চন্দ্রলক্ষ্মী হালাম, চুঙ্গা মিজো, ছায়া মগের মতো উপজাতিরাও। একতরফা ভাবে আদালত তাঁদেরও বিদেশি বলে রায় দেয়।
তাঁদের মতো কাকে কখন পুলিশ বিদেশি বলে সন্দেহ করবে, আদালতের নোটিস পাঠাবে না আর বিদেশি বলে একতরফা রায়ে গ্রেফতার হতে হবে— তা ভাবিয়ে তুলছে সবাইকে। রাজ্যের পুলিশ প্রধান খগেন শর্মা জানিয়েছেন, এখন আর পুলিশ সে ভাবে সন্দেহভাজনদের নাম ট্রাইব্যুনালে পাঠায় না। কেউ ভারতীয় নাগরিকত্বের নথিপত্র দেখাতে না পারলেই মামলা হয়। তবে নির্বাচন কমিশন যাঁদের নামে অভিযোগ জানায়, তাঁদের মামলা নিতেই হয়।
গায়ত্রীদেবীও জানান, এই বছরের মার্চের পর এক জনকেও বিদেশি বলে সন্দেহ করে মামলা ঠোকা হয়নি। পুরনো মামলাগুলিই চলছে। সেই সঙ্গে জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘নোটিস না পাওয়া বা যে কারণেই হোক, আদালত যাঁদের বিদেশি বলে রায় দিয়েছে,
তাদের খুঁজে বের করে জেলে পাঠানো হবেই।’’বিজেপির প্রদেশ কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাজদীপ রায় বলেন, ‘‘শীঘ্র নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন চেয়ে সংসদে বিল পেশ করা হবে। সেটি পাশ হয়ে গেলে আর কোনও সমস্যা থাকবে না।’’