মন্দিরে হানাদারি বাঁদরের। — নিজস্ব চিত্র।
রাত-বিরেতে হুড়মুড়িয়ে ঘাড়ে এসে পড়ছে হাতির পাল। আছড়ে ভাঙছে ঘর। শুধু রাতের অন্ধকারেই নয়, দিনে-দুপুরেও আচমকা উড়ে আসছে থাবা। চিতাবাঘের হানায় বাড়ছে জখমের সংখ্যা। পাহাড় বেয়ে নেমে আসা হরিণকে আদর দেখাতে গিয়ে শিঙের ঢুঁসোয় আহত শিশু। পাহাড় চূড়ায় থাকা মন্দিরের রাস্তায় হিংস্র বাঁদরের আঁচ়়ড়ে জখম অনেকে। খাটের নীচে শুয়ে অজগর। বাড়ির সামনে চেয়ারে বসে চিতাবাঘ। এমন কী জনবসতি ঘেঁসা এলাকায় মেঘলা চিতাবাঘ, কালো চিতাবাঘও উঁকি মারছে। জংলি বেড়াল, সিভেট ক্যাটদের দেখে রজ্জুতে সর্পভ্রমের মতোই বাঘ বলে ভাবছে মানুষ।
কোনও অভয়ারণ্য বা জংলি গ্রামের ছবি নয়। রীতিমতো গুয়াহাটি মহানগরে এখন এমনই অবস্থা। সৌজন্যে অরণ্যধ্বংস আর যথেচ্ছ বসতি বিস্তার।
গুয়াহাটির আশপাশের পাহাড়ে জঙ্গল যত কমছে ততই জনবসতিতে বন্যপ্রাণীর আনাগোণা বাড়ছে। বৃহত্তর গুয়াহাটি ও তার আশপাশ মিলিয়ে সাতটি সংরক্ষিত অরণ্য আর দু’টি অভয়ারণ্য রয়েছে। আছে একটি ‘রামসার’ সরোবর। দেশের খুব কম মহানগরেই শহর-অরণ্য এতটা গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রয়েছে। কিন্তু কালাপাহাড়, নবগ্রহ, খারগুলি, শরণিয়া, ফাটাশিল, নীলাচল, গোটানগর, হেঙেরাবাড়ি, জালুকবাড়ি এলাকাগুলিতে পাহাড় কেটে একের পর এক বাড়ি ওঠায় এবং পাহাড়ের মাথায় জলাধার, বিদ্যুৎস্তম্ভ বসানোর জেরে বন্যপ্রাণীরা ঘরছাড়া। ফল, মানুষ ও প্রাণীদের লড়াই নৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে।
গত দু’সপ্তাহের মধ্যে মালিগাঁও এলাকায় চিতাবাঘের হানায় দু’জন জখম হন। ক’দিন আগেই উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের সদর দফতরে ঢুকে পড়েছিল চিতাবাঘ। রানি সংরক্ষিত অরণ্য থেকে দীপর বিল পার করে নিয়ম করে শহরে ঢুকে দাপিয়ে বেড়ায় হাতি। আমসাঙ থেকে হাতির পাল হানা দেয় সেনাছাউনিতে। চিড়িয়াখানার ভাঙা খাঁচার সৌজন্যে সম্বর, বার্কিং ডিয়াররা হামেসাই খোলা অবস্থায় ঘোরে। চিড়িয়াখানার পিছনের পাহাড়ে বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ, নীলগাই, চিতাবাঘের বসত। কালাপাহাড়, খারগুলি, চিত্রাচল, নবগ্রহ, ফাটাশিলের পাহাড়েও অনেক চিতাবাঘ আছে। একই ভাবে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, বিশেষ করে অজগর এখন বসতিতে ঠাঁই নিচ্ছে।
বর্তমানে, সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছেন নবগ্রহের বাসিন্দারা। বাঁদরের জন্য বরাবরই কুখ্যাত চিত্রাচল পাহাড়ে প্রাতর্ভ্রমণকারীরাও হাতে লাঠি নিয়ে যান। স্থানীয় বাসিন্দারা ঘরের জানালা খুলে রাখতে পারেন না। কিন্তু গত দু’দিনে যেমন মারকুটে হয়ে উঠেছে নবগ্রহ এলাকার ‘আসাম ম্যাকাক’-এর দল তা আগে দেখা যায়নি। বাঁদরের আঁচড়-কামড়ে জখমের সংখ্যা প্রায় ১০।
বনবিভাগের উপরেই ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন স্থানীয় মানুষ। কিন্তু ডিএফও দিব্যধর গগৈ বা চিড়িয়াখানার রেঞ্জার এল সি গগৈয়ের মতে, বন দফতর আগ বাড়িয়ে অভিযান চালিয়ে চিতাবাঘ, সিভেট বা অজগর ধরতে পারে না। কারণ, নিয়মানুযায়ী ওইসব পাহাড় আদতে ওদেরই আবাসস্থল ছিল। পরবর্তীকালে সেখানে জবরদখল করে থাকতে শুরু করেছে মানুষ। সেই জবরদখল হঠাতে গেলে আন্দোলন হয়। এ দিকে পাহাড় কেটে ঝুপড়ি তৈরির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এ নিয়ে প্রশাসনকে জানানো হলেও লাভ হয়নি। জেলাশাসক এম আঙ্গামুথু জানান, পাহাড় এবং জঙ্গলে জবরদখলকারীদের হঠাতে পুলিশকে কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে, বনরক্ষীরাও এ ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু প্রশাসন ও বনদফতর দু’পক্ষই পরোক্ষে জানায়, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই গুয়াহাটির আশপাশের পাহাড়-জঙ্গল জবরদখলমুক্ত করা যাচ্ছে না।
চিতাবাঘ লোকালয়ে এসে আক্রমণ করলে বনকর্মী ও পশুচিকিৎসকেরা যেতে বহু বিলম্ব করেন বলেও অভিযোগ। চিড়িয়াখানার তরফে জানানো হয়েছে, ঘুম পাড়ানি ওষুধ চিড়িয়াখানা থেকে নিয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসক যোগাড় করে ঘটনাস্থলে পাঠাতে সময় লাগে। বেশিরভাগ সময় মানুষের অতিরিক্ত ভিড়ে কাজ শুরু করতে দেরি হয়।
মানুষ ও প্রাণীর সংঘর্ষ ঠেকাতে ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া গুয়াহাটিতে এক কর্মশালার আয়োজন করে। পশুপ্রেমী সংগঠনগুলির অভিযোগ, বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও চিতাবাঘের আক্রমণ ঠেকাতে রাজ্য সরকার যে ‘র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স’ গড়েছিল তাও আর সক্রিয় নেই। তেমন কাজ করে না হেল্পলাইনও।
বন দফতরকে বাঁদরামি নিয়ে নালিশ ঠুকে লাভ না হওয়ায় নবগ্রহ এলাকার বাসিন্দারা এ দিন ‘জাগ্রত মন্দির’-এ বিরাট করে হনুমান পুজো আর যজ্ঞের আয়োজন করেন।