দিল্লির নির্ভয়া-কাণ্ডের পর নতুন আইনে গণধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি এখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। শুক্রবার মুম্বইয়ের শক্তি মিলসের দু’টি গণধর্ষণের মামলার একটিতে চার অভিযুক্তকে সেই সর্বোচ্চ শাস্তিই দিল আদালত। দোষীদের আমৃত্যু জেলেই থাকতে হবে বলে আদালত জানিয়ে দিয়েছে। এক টেলিফোন অপারেটর তরুণীকে ধর্ষণের সাজা ঘোষণা হয়েছে আজ। তারই কাছাকাছি সময়ে ওই পরিত্যক্ত মিলে ধর্ষিতা হন এক চিত্রসাংবাদিকও। সেই মামলারও শাস্তি ঘোষণার কথা ছিল আজ।
বিজয় যাদব, মহম্মদ কাসিম হাফিজ শেখ ও মহম্মদ আনসারি নামে তিন দোষী দু’টি ঘটনাতেই জড়িত। ধর্ষণের মামলায় কোনও ব্যক্তি একাধিক বার দোষী হলে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩৭৬(ই) ধারায় তার মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। আজ একটি মামলার রায় ঘোষণা হতেই সরকারি কৌঁসুলি উজ্জ্বল নিকম তাই নতুন একটি আবেদন পেশ করেন। তাতে ওই তিন জনের বিরুদ্ধে একাধিক বার ধর্ষণের অভিযোগে বাড়তি চার্জ গঠনের আর্জি জানিয়েছেন তিনি। এ বার দোষীদের মৃত্যুদণ্ড হতে পারে বলে জানিয়েছেন সরকারি কৌঁসুলি। নিকমের আর্জির পরে বিষয়টি নতুন ভাবে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নেন বিচারক শালিনী ফেনসালকর জোশী। তাই চিত্রসাংবাদিক ধর্ষণের মামলার সাজা ঘোষণা ২৪ মার্চ পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নির্ভয়ার ঘটনায় গণবিক্ষোভের ফলে বিপাকে পড়েছিল কেন্দ্র ও দিল্লির কংগ্রেস সরকার। একই ভাবে মুম্বইয়ের দু’টি ঘটনায় বিপাকে পড়ে শাসক কংগ্রেস-এনসিপি জোট। তাদের বিরুদ্ধে অপদার্থতার অভিযোগ নিয়ে সরব হয় বিজেপি। রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর আর পাটিলের ইস্তফারও দাবি ওঠে। এর ফলে, এই মামলা দু’টি মহারাষ্ট্র সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছিল। এ কারণে গোড়া থেকেই কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি হয়নি মহারাষ্ট্র সরকার। দ্রুত গ্রেফতার হয় অভিযুক্তরা। ২৮ দিনের মধ্যে ৬০০ পাতার চার্জশিট জমা দেয় পুলিশ। কয়েকটি শিবিরের মতে, যা সত্যিই রেকর্ড সময়। সরকার পক্ষের কৌঁসুলি নিয়োগ করা হয় মুম্বই বিস্ফোরণ মামলা খ্যাত উজ্জ্বল নিকমকে। গত ৭ মাসে দু’টি মামলা মিলিয়ে ৭৫ জন সাক্ষীর বক্তব্য শুনেছে আদালত।
এই সাত মাসের শুনানিতে বেদনাদায়ক দৃশ্যও দেখেছে দায়রা আদালত। সাক্ষ্য দিতে এসে জ্ঞান হারিয়েছিলেন চিত্রসাংবাদিক তরুণী। কিন্তু বক্তব্য থেকে একচুল সরেননি তিনি বা তাঁর পুরুষ বন্ধু। ফলে, আদালতের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায় বলেই মনে করা হচ্ছে।
গত কাল আদালতে হাজির ছিলেন রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাটিল। অনেকের মতে, বাণিজ্যিক রাজধানীর ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার একটা দায় স্থানীয় প্রশাসনের ছিলই। কারণ, বরাবরই দিল্লির মতো শহরের তুলনায় মুম্বইকে নিরাপদ বলেই মনে করা হয়েছে। মুম্বইয়ে রাত দু’টোর সময়েও এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে মহিলারা নিরাপদে যেতে পারেন বলেই ভাবতেন শহরের বাসিন্দারা। শক্তি মিলসের ঘটনায় তাই কড়া বার্তা দেওয়া একান্ত ভাবেই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক কাদা-ছোড়াছুড়িও কম হয়নি। অনেকের মতে, তাই ভোটের আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে আদালতে হাজির হয়ে বোঝাতে চাইলেন, তাঁরা বিষয়টিকে সত্যিই কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন।
আদালত থেকে বেরিয়ে পাটিল বলেন, “যত দ্রুত সম্ভব মামলার ফয়সালা হয়েছে। আশা করি ভবিষ্যতে অন্য কেউ এই ধরনের কাজ করার আগে দু’বার ভাববে।” স্বস্তির ছোঁয়া ছিল মুম্বই পুলিশের বক্তব্যেও। অপরাধ-দমন শাখার প্রধান হিসেবে এই ঘটনাগুলির তদন্ত করেছিলেন হিমাংশু রায়। তিনি এখন সন্ত্রাস-দমন শাখার (এটিএস) প্রধান। হিমাংশুবাবুর কথায়, “টেলিফোন অপারেটর তরুণীর ঘটনার কিনারা করাই বেশি কঠিন ছিল। কারণ, তিনি ঘটনার এক মাস পরে অভিযোগ জানান। তবে শক্তি মিলস চত্বর পরিত্যক্ত বলেই সব প্রমাণ সহজেই হাতে পাওয়া গিয়েছিল।”
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য মামলায় রাজনীতিকদের যাতায়াত দেখা গিয়েছে। কিন্তু মহারাষ্ট্র সাত মাসেই দোষীদের সাজা দিয়ে দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারলেও পশ্চিমবঙ্গের পার্ক স্ট্রিট, কাটোয়া, কামদুনি বা মধ্যমগ্রামের মতো শোরগোল ফেলা গণধর্ষণের মামলার ফয়সালা কেন করা গেল না তা নিয়ে এর মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। আইনজীবী মহলের ব্যাখ্যা, এ রাজ্যে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের সংখ্যা এতই কম যে, এই কোর্টগুলি মামলার চাপে কার্যত সাধারণ কোর্টের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্ক স্ট্রিট মামলার শুনানি মাসে গড়ে দু’দিন হয়। অন্য মামলাগুলিরও কার্যত একই অবস্থা। কামদুনি মামলা ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টেও নেই। এ ছাড়াও আইনজীবীদের একাংশের বক্তব্য, উজ্জ্বল নিকমের মতো জাঁদরেল আইনজীবীকে নিয়োগ করে মহারাষ্ট্র সরকার মামলাটিতে গতি এনেছিল। সেই সঙ্গে মহারাষ্ট্র সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতরও নিরন্তর মামলাটির দেখভাল করেছে।