জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠনের দিন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে অন্য নেতারা। ফাইল চিত্র।
বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম হোতা এনসিপি ভেঙে নতুন মঞ্চ তৈরি হচ্ছে। শেষ মুহূর্তে বদল না হলে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি সৌধ শহীদ মিনারে আজ, শুক্রবার নতুন রাজনৈতিক মঞ্চের ঘোষণা করতে চলেছেন বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এনসিপি থেকে বেরিয়ে যাওয়া বিক্ষুব্ধ ছাত্র নেতা-কর্মীরা। বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা হতে পারে। এখনও পর্যন্ত স্থির রয়েছে, এর নাম দেওয়া হবে, ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ (এনপিএ)।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে ছোট আকারে শুরু হওয়া এই ঘটনাকে বড় তাৎপর্যবাহী বলেই মনে করছে সে দেশের বিশেষজ্ঞ মহল। আপাতত মঞ্চ হিসেবে শুরু করলেও, ক্রমশ রাজনৈতিক দল তৈরির পথে হাঁটবেন তাঁরা। ওই মঞ্চের নেতাদের উদ্দেশ্য, আগামী নির্বাচনের আগে নিজেদের তৈরি করে ভোটে দাঁড়ানো। তাঁদের দাবি, এনসিপি-র ‘বিকিয়ে যাওয়া’ রাজনৈতিক পরিসরকে দখল করতে চান তাঁরা।
অন্য দিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির তৈরি রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি, যা এর মধ্যেই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত, নির্বাচনে যাচ্ছে জামাতের সঙ্গে সমঝোতা করে। এতে অনেকেই ক্রমশ এনসিপি ছেড়েছেন। অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যে শুদ্ধতা ছিল, তা তারা হারিয়েছে সুবিধাবাদী ক্ষমতালোভী রাজনীতির বৃত্তে ঢুকে গিয়ে। প্রতিবাদকারীরা এক চিঠিতে জামাতের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার প্রসঙ্গ এনে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বাধীনতা-বিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রশ্নে তাদের অবস্থান, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও আমাদের দলের মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিক ভাবে সংঘর্ষের।’ জুলাই আন্দোলনের পরিচিত মুখ, এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা এনসিপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজে লড়ছেন। জানালেন, ‘বাস্তবের প্রেক্ষাপট বিচার করে’ তিনি এনসিপি-র সঙ্গে বা কোনও জোটে থাকতে পারছেন না। লড়বেন একাই। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে জামাতের সঙ্গে সমঝোতা সম্বন্ধে বলেছেন, ‘‘এই জিনিস হজম করে মরতেও পারব না আমি।’’
অথচ বাংলাদেশের মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল জুলাই অভ্যত্থান এবং তার জেরে রাস্তায় নামা ছাত্ররা। ‘‘গত বছর ফেব্রুয়ারিতে এনসিপি তৈরি হওয়ার পরে জুলাইয়ে আমরা গোটা দেশ জুড়ে পদযাত্রা করেছিলাম। ৬২টি জেলায় গিয়েছি। মনে আছে, পাবনায় যখন পৌঁছেছি, অনেক রাত। অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। তার মধ্যেও মাঠে মানুষ বসে রয়েছেন ছাত্র নেতাদের দেখবেন বলে। এতটাই সাড়া আর আবেগ ছিল তখন,’’ জানাচ্ছেন গত অক্টোবরে এনসিপি ছেড়ে নতুন মঞ্চ তৈরির অন্যতম কান্ডারি অনীক রায়। ‘‘পরে যখন আমরা বুঝলাম, এনসিপি ভোট ও জোট রাজনীতিতে ঢুকে গিয়ে আর একটা জামাত বা বিএনপি হতে চলেছে, আমি এবং আমার মতো অনেকেই বেরিয়ে আসি।’’
অনেক গর্জনে শুরু করেও কেন বাংলাদেশের মাটিতে তেমন বর্ষণ হল না এনসিপি-র? কেন আসন্ন নির্বাচনে তারা জামাতের এক দুর্বল জোটসঙ্গী হিসেবেই আটকে গেল? দলের ভিতরের বিক্ষুব্ধ অংশ তার নানা কারণ দেখাচ্ছে। তাজের মতে, প্রথমত, এনসিপি-র রাজনৈতিক নিজস্ব পরিচয়চিহ্ন তৈরি করতে না পারা। কেন তাদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রয়োজন, সেই বয়ান তারা তৈরি করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, তাদের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ছিল শূন্য। তিন, হাতে গোনা কয়েক জনের উপরে নির্ভরশীলতা। চার, বাংলাদেশের ইতিমধ্যেই পচন লেগে যাওয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে ক্রমশ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়া।এনসিপি-র বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ এটাই যে, যেখানে প্রায় তিন কোটি মানুষ জুলাই অভ্যুত্থানে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছেন, পুলিশের লাঠি-গুলি খেয়েছেন, সেখানে মাত্র জনা পনেরো ছাত্রনেতা তাঁদের প্রতিনিধি হতে পারেন না। যাঁদের নিজেদের মধ্যেই না-ছিল কোনও সমন্বয়, না-ছিল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। সাম্প্রতিক সব ক’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, ওই অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত ছাত্রদের কোনও পরিসরই কোথাও নেই। ঢাকা, জাহাঙ্গিরনগর, জগন্নাথ, চট্টগ্রাম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দখল করেছে জামাত ছাত্র শিবির। প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘ সতেরো বছর যাদের সমস্ত রকম রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ ছিল, দেশের সমস্ত দলীয় অফিসে তালা দেওয়া ছিল, তারা রাতারাতি এই ক’মাসের মধ্যে এতটা প্রভাব কী ভাবে ছাত্রমহলে তৈরি করল? ছাত্র রাজনীতি করে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়া করিয়ে নতুন অভ্যুত্থানে যে লাভ হল, তার কোনও গুড়ই কেন অরাজনৈতিক এবং পরে এনসিপি তৈরি করা ছাত্ররা পেলেন না?
বাংলাদেশের অন্যতম থিংক ট্যাঙ্ক, ‘সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ়’ (সিজিএস)-এর প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের মতে, ‘‘হিসাবটা কঠিন নয়। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন, ছাত্র লীগের মধ্যে বড় অংশ নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে শিবিরের লোক ছিলেন। তাঁরা ক্ষমতা বদলের পর স্বমূর্তিতে এসেছেন। ছাত্র লীগের ভিতরেও অন্তর্ঘাত হয়েছে, যা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়াদুল কাদের বার বার সতর্ক করতেন।’’ পাশাপাশি নতুন মঞ্চ করতে যাওয়া ছাত্রদের বক্তব্য, বিপুল টাকা ছাত্র সংসদের নির্বাচনের জন্য খরচ করেছে জামাতের শিবির। এই টাকা কোথা থেকে আসছে, তার কোনও স্পষ্ট হিসাব নেই। জানা যাচ্ছে, শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনের জন্য জামাত খরচ করেছে ৩০ কোটি টাকা! যা বাংলাদেশে যে কোনও ছাত্র সংগঠনের কল্পনারও বাইরে।
বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ যে টাকার জোরে রাজনীতি করবে না, সেই কথা স্পষ্ট করে দিচ্ছেন তাঁদের নেতৃত্ব। বরং হাসিনার আমলে যে বাম রীতি একেবারেই মাথা তুলতে পারেনি, তারই বিকাশ ঘটানো লক্ষ্য তাঁদের। যে বিষয়গুলিকে রাজনৈতিক সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা হবে, তার মধ্যে রয়েছে দেশের আর্থিক বৈষম্য দূর করা, বেকারত্ব কমানোর মতো বিষয়। সেই সঙ্গে পরিবেশকেও আনা হবে রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার পুরোভাগে, যা এর আগে কখনও হয়নি। সুনামগঞ্জের মতো বহু জায়গাই বাংলাদেশে ভূমিকম্পপ্রবণ। পাশাপাশি, তাঁরা ভূ-রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক অবস্থানগত ভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ‘আধিপত্যবাদ’-এর অভিযোগে সরব। অন্য দিকে, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কে উন্নতির কথা বলবে এই দল। অনীকের কথায়, ‘‘জামাত আসলে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্কে থাকতে চায়, নিজেদের বাণিজ্য চালানোর জন্য। ২০১৩ সালের পরে নিজেদের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার বিনিময়ে তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগের সুবিধা করে দিয়েছিল। এনসিপি-ও সেই পথে হাঁটছে বলেই আমরা দল ছেড়ে ভিন্ন দল গঠনের কথা ভেবেছি।’’ (চলবে)
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে