শাড়ি পরে তিনি গল্ফ খেলেছেন, শাড়ি পরে ফুটবলে শট দিয়ে গোলও করেছেন। ছবির প্রচারে শাড়ি পরেছেন, র্যাম্পে শাড়ি পরেছেন, আবার ফ্লোর কাঁপিয়ে নাচও করেছেন। শাড়ি যেন তাঁর বিশ্বাসী বন্ধু। আর তাই বোধহয় পাওলি দামের ফ্যাশন বলতে শাড়িই বোঝেন সকলে। ‘চার অধ্যায়’ থেকে ‘হেট স্টোরি’, ‘বুলবুল’ থেকে ‘বিবি পায়রা’— ছবির পর ছবিতে নানাবিধ চরিত্র তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন শাড়িতে।
‘‘ভুল নয়’’, বলছেন অভিনেত্রী নিজেই। শাড়ি পরতেই সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে। শাড়ির সাজেই সবচেয়ে বেশি স্বচ্ছন্দ। আর সেই পাওলি পয়লা বৈশাখে শাড়ি পরবেন না, তা কি হয়? আনন্দবাজার ডট কম-এর জন্য সাজলেন নায়িকা। হালকা সোনালি রঙের তসরের শাড়ির সঙ্গে গাঢ় সোনালি ব্লাউজ়। সোনার গয়না কানে, হাতে ও আঙুলে। কপালে ছোট্ট লাল টিপ। আর বুক পর্যন্ত নেমে আসা একঢাল লম্বা কোঁকড়ানো চুল।
তসর যে পাওলির সবচেয়ে প্রিয় কাপড়ের তালিকায় রয়েছে, তা নয়, কিন্তু এই শাড়িটি অত্যন্ত নরম এবং হালকা বলে নিজেই বেছে এনেছেন তিনি। কারণ, এই শাড়ির নেপথ্যে রয়েছে ভালবাসা ও সুন্দর স্মৃতিমেদুর এক গল্প। ‘বিবি পায়রা’ ছবির পরিচালক অর্জুন দত্তের প্রয়াত মায়ের শাড়িটি। সেই শাড়ি এখন পরিচালকের স্মৃতি আঁকড়ানোর জিনিস, কিন্তু পাওলি তাঁদের ছবির প্রচারে সেই শাড়ি পরে শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছিলেন। এ ভাবেই ভাল শাড়ির কদর করেন পাওলি।
যদিও ‘বিবি পায়রা’র চরিত্র ঝুমার সাজগোজের সঙ্গে একেবারেই মিল নেই পাওলির। ঝুমা পছন্দ করে, চকচকে, ঝিকমিকে, চোখধাঁধানো পোশাক, ঠিক যেমন নাচ করছিল ঝলমলে এক শাড়িতে। যদিও এমন সাজগোজের সুযোগ পায় না ঝুমা। কিন্তু সে তো আসলে রঙিন জীবনের মাঝে পড়ে রঙিন হয়ে উঠেছিল।
এ দিকে, পাওলির আবার ভীষণ আরামদায়ক, চোখে স্বস্তিদায়ক শাড়ি পছন্দ। সুতি, হ্যান্ডলুম, গামছা, লিনেন, মসলিন, পাটমুগা, এরি (শেষ দু’টি অসমের রেশম) কাপড় গায়ে চড়াতে বেশি ভালবাসেন। তার উপর এপ্রিলের ১৫ তারিখ হয়ে গিয়েছে, আরও গরম পড়তে চলেছে। এমন সময়ে এই ধরনের হালকা শাড়িই একমাত্র পরা যায়।
যদিও শাড়ি বলতে কেবল সাবেকি সাজে বিশ্বাসী নন পাওলি। ঋতু মেনে মেনে শাড়ির সাজেও বৈচিত্র আনেন তিনি। কখনও পোলোনেক শার্ট দিয়ে শাড়ি পরেন, কখনও বা অ্যান্টি-ফিট ব্লাউজ় দিয়ে, কখনও আবার সাধারণ ক্রপ টপ দিয়ে, কখনও সখনও সাবেকি ব্লাউজ়ের সঙ্গেও শাড়ি পরেন পাওলি। ব্লাউজ়ের পাশাপাশি আঁচল নিয়েও পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে ভালবাসেন অভিনেত্রী। কিন্তু সব মিলিয়ে সাজ হতে হবে সাদামাঠা এবং আভিজাত্যপূর্ণ। নায়িকা বলে ডিজ়াইনার শাড়িই পরতে হবে, এমন ধারণায় বিশ্বাসী নন তিনি।
তবে পাওলি দাম মানেই শাড়ি— এই ভাবমূর্তি ভেঙে বেরোতেও ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে। সম্ভবত সেই কারণে নতুন ছবিতেও তাঁকে শাড়ি কম পরানো হয়েছে। তাই এ বারের পয়লা বৈশাখের জন্য তিনি কেবল শাড়ি নয়, বেছে নিয়েছেন ইন্দো-ওয়েস্টার্ন ফিউশন পোশাক। মেরুন বা ইটরঙা কোঅর্ড সেট। ঢিলেঢালা, একরঙা পোশাক। লাল তাঁর পছন্দের রং। লালেরই আত্মীয় রংকে বেছে নিয়েছেন পাওলি। কোঅর্ড সেটের কাপড়ও সুতির। অর্থাৎ আরামদায়ক সাজ থেকে বেরোননি টলিউড অভিনেত্রী।
পাওলি কানাডার নায়াগ্রা ফল্স দেখতে গিয়েছিলেন শাড়ি আর স্নিকার্স পরে। তাঁর সত্তা জুড়ে শাড়ি। কিন্তু তিনিই বলছেন, ‘‘আমার মতো সবাই যে শাড়িতে স্বচ্ছন্দ হবেন, তার কোনও মানে নেই! একে তো এখানে গরম, তার উপর কাজকর্মে ব্যস্ত থাকতে হয় কত মহিলাকে। সেই সময়ের জন্য শাড়ির বদলে অন্য কোনও পোশাক পরলে মন্দ হয় না। আমারও নিজেকে ভাঙতে গড়তে ভালই লাগে।’’
পাওলি নতুন সাজে নিজেকে দেখতে চেয়েছিলেন পয়লা বৈশাখে। সেই শখ পূরণ করলেন তিনি। সঙ্গে তাঁরই পছন্দের রুপোর গয়না। তবে প্রতি বারের মতো পয়লা বৈশাখে শাড়িই যে উপহার পাবেন, সে নিয়ে তিনি নিশ্চিত। জীবনে নববর্ষে যত উপহার পেয়েছেন, তার মধ্যে শাড়িই সবচেয়ে বেশি। তার পরে আছে মিষ্টি (যা তিনি খান না), হলুদ আলো, পছন্দের মোমবাতি, শো-পিস, বই আরও কত কী! প্রতি বারই মিষ্টি শেষ করার দায়িত্ব পড়ে পরিবারের কাঁধে।
তবে বৌবাজারের আসবাবপত্রের দোকানের মালিকের সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা মনে পড়ে পাওলির। যে ভাইবোনের সঙ্গে নতুন জামায় সেজে বাবার দোকানে হালখাতা পালনে হাজির থাকত, কচুরি খাওয়ার জন্য বায়না করত, ভূত ভূত খেলত। সেই মেয়েটা আজ বড় হয়ে নামী অভিনেত্রী। সারা ক্ষণ কাজে ব্যস্ত। আগের মতো আর উদ্যাপন করা হয় না এই বাঙালি উৎসবগুলি। তবু যথাসম্ভব সেই মেয়েটির মনের আনন্দটাকে জিইয়ে রাখতে চেষ্টা করেন পাওলি। বিশেষ করে এমন পার্বণের দিনগুলিতে।