গ্রীষ্মের আদর্শ শাড়িবাহার। — নিজস্ব চিত্র
ভোটের দিন সকাল সাতটাতেই পৌঁছে গেছি। বাড়ির উল্টো দিকেই ভোটকেন্দ্র। তাই যাতায়াতের কোনও অসুবিধে নেই। ভ্যাপসা গরম আছে বটে। যদিও গত কয়েক দিন ধরে গরমের সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া, মেঘলা আকাশ আর ছিটেফোঁটা বৃষ্টির প্রভাবে গা-জ্বালানো গরম তেমন অনুভূত না হলেও ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে গরমে সকলেই হাঁসফাঁস করছিলেন। ক্লাসের ভাল ছাত্রদের মতো সময়ের কাজ সময়ে সেরে ফেলায় বিশ্বাসী প্রৌঢ় মানুষেরই ভিড় বেশি। নির্বিঘ্নে, তাড়াতাড়ি দায়িত্ব সেরে বাড়ি ফেরায় আগ্রহী তাঁরা। অপেক্ষা করতে করতে খেয়াল করছিলাম, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বেশির ভাগ মানুষের পরনেই সুতির পোশাক। ছেলেদের গায়ে পাঞ্জাবি, মহিলারা বেছে নিয়েছেন তাঁতের শাড়ি। হালকা পাতলা কোটা শাড়িও চোখে পড়ল। এমনকি, বিএলও দুই মহিলার অঙ্গেও বাটিকের সুতির শাড়ি আর প্রিন্টেড সালওয়ার কামিজ়। ছিমছাম সাজগোজে ডিউটিতে ব্যস্ত। ব্যতিক্রম আছে, তবে তা নগণ্য। আর বাকিরা তো ইউনিফর্মধারী। তা-ও সুতিরই।
— নিজস্ব চিত্র
আসলে গ্রীষ্মপ্রধান দেশে সুতিই ভরসা। ফ্যাশন ভীষণ ভাবে ঋতু নির্ভর, আবহাওয়া নির্ভর। তাই যেমন কথা দিয়েছিলাম, গরমে সুতির পোশাকের কথাই লিখব। আমার কলেজবেলায় আমাদের সকলেরই খুব পছন্দ ছিল ‘সাউথ কটন’। দক্ষিণ ভারতের প্রাদেশিক বিভাজন অনুযায়ী কাপড়ের নাম এবং চরিত্র তত খুঁটিয়ে বোঝার জ্ঞান-বুদ্ধি না হলেও দক্ষিণী শাড়ির কাপড়ের খোল, রং এবং পাড়ের কম্বিনেশনের বৈপরীত্য, পরার আরাম তখন থেকেই ভাল লাগত। দক্ষিণের শাড়ি বলতে জানতাম কাঞ্জিভরম আর গাদোয়াল। সে সব তো পোশাকি এবং দামি শাড়ির আওতায় পড়ত। সাউথ কটন বলে এই জেনেরিক নামের শাড়ি আমাদের সাধ এবং সাধ্যের মধ্যে অতি উপাদেয় এক সম্ভার। সরকারি এম্পোরিয়াম ছাড়াও ভোজরাজ, তোলারাম দোকানের কালেকশন ছিল দেখার মতো। নাল্লি-র ছোট একটা দোকান ছিল দেশপ্রিয় পার্কের পিছনে। আজ তো বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে তাদের বিশাল শোরুম। ধীরে ধীরে জানলাম, তামিলনাড়ুর জমকালো আঁচলের কলাক্ষেত্র শাড়ির বিষয়ে। সুতি, সিল্ক— দু’রকমই হয়। তার আগে পর্যন্ত কলাক্ষেত্র মানে রুক্মিণী দেবী আরুন্ডলে এবং তাঁর ভরতনাট্যম নৃত্যশৈলী। এই ছিল আমার দৌড়। ধবধবে সাদা, সোনালি পাড়ের কেরালা কটন সকলের প্রিয় ছিল। আজ অবশ্য তার নকলের ঠেলায় নন্দনবোধ জেরবার। দক্ষিণী শাড়ি নিয়ে লিখতে বসলে অল্প কথায় সারা যাবে না, তাই বেছে বেছে করাই ভাল। তবে দক্ষিণী শাড়ি আমার ভাল লাগার পিছনে মূল কারণ, এরা সবাই খাঁটি হ্যান্ডলুম।
— নিজস্ব চিত্র
এ বার আসি আজকের গল্পে। পোন্ডুরু খাদি। অন্ধ্রপ্রদেশের এক গ্রাম পোন্ডুরু। সেখানেই বোনা হয় এই কাপড়। অন্ধ্রপ্রদেশ বিখ্যাত তার ১০০-১২০ কাউন্টের দুর্দান্ত সুতো ও নরম কাপড়ের জন্য। স্থানীয় তুলো ছাড়াও শিমুল এবং কাপাস তুলোর ব্যবহার করা হয় এই কাপড়ের বুননে। স্থানীয় অর্থনীতিও সুঠাম ও দৃঢ় হয়েছে এই কাপড়ের বুনন ঐতিহ্যের দৌলতে। থান কাপড়, শাড়ি— দুটোই পাওয়া যায়। পোন্ডুরু খাদি শাড়ি নিয়ে লিখব ভাবা মাত্র মনে পড়ল অনসূয়ার কথা। অনসূয়া রামানা। এই কলাম লিখতে গিয়ে বেশ মজার একটা অভিজ্ঞতা হচ্ছে। বিষয়ভাবনা মাথায় এলেই পাত্রপাত্রীও তাদের হাত ধরে হাজির। পোন্ডুরু খাদির শাড়িতে একটা ছিমছাম, অভিজাত, স্নিগ্ধ আরাম আছে, যা অনসূয়ার চেহারার সঙ্গে খুব ভাল মানায়। তাই তার শরণাপন্ন হলাম। সে সাদা খুব পছন্দ করে। আর গরমে সাদার বিকল্প আর কী-ই বা হতে পারে! সাদা খোলে লাল, কালো গঙ্গা-যমুনা সরু পাড়, আঁচলে হালকা ধূসরের ছোঁয়া। কানে রুপোর ঝুমকো, হাতে রুপোর বালা। আংটিতে ফিরোজ়ার রোম্যান্স। অনসূয়ার গায়ে সাদা ব্লাউজ় খুব ভাল মানিয়েছে।
— নিজস্ব চিত্র
আপনারা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ব্লাউজ় পরতে পারেন। একই শাড়ি সাদা-লাল কম্বিনেশনে। পাড় একটু চওড়া। শাড়ির সঙ্গেই ব্লাউজ় পিস ছিল। তাই সমস্যা নেই। আমার পছন্দ লাল। তাই লাল জমি, কালো সরু পাড়, তার উপরে ছোট টেম্পল, দক্ষিণী শাড়ির সিগনেচার স্টাইল। দিনে, রাতে, যে কোনও সময়ে পরতে পারেন। তাঁতে বোনা খাঁটি এই কাপড়ের আরাম, আয়াস, আহ্লাদের আয়োজন মাথায় তুলে নেওয়ার মতোই।
(মডেল: অনসূয়া রামানা, ছবি: সহেলি দাস মুখোপাধ্যায়, ভাবনা ও পরিকল্পনা: শর্মিলা বসু ঠাকুর।)