প্রথম স্কুল যাওয়ার সময়ে বহু শিশুর মধ্যেই বিচ্ছেদ-ভয় কাজ করে। কিন্তু তার জন্য বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানো বন্ধ করবেন না। —প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
দু’বছরের ছোট্ট হিয়া যখন প্রথম ভর্তি হল প্লে-স্কুলে, স্বস্তি পেয়েছিল তনুশ্রী। বড় স্কুলে যাওয়ার আগে কয়েক মাস প্লে-স্কুলে যাওয়া অভ্যাস করলে হিয়ারই সুবিধে। তনুশ্রীও কিছুটা সময় পাবে নিজের জন্য। কিন্তু সে সব স্বস্তিতে জল ঢেলে দিল হিয়া। প্রথম দিন স্কুলে ঢুকেই কান্না শুরু, দু’-তিন মাস পরেও তা কমার নামগন্ধ নেই। বাধ্য হয়ে তনুশ্রীকে রোজ তিনটি ঘণ্টা হিয়ার স্কুলের সামনের পার্কে গিয়ে বসে থাকতে হয়।
সব শিশু যে সমান নয়, স্কুলের চৌহদ্দির মধ্যে গেলেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। কেউ হাপুস নয়নে কেঁদে চলেছে, কেউ আবার বন্ধুদের পেয়ে বেজায় খুশি, কেউ কাঁচা ঘুম ভেঙে উঠে আসতে হয়েছে বলে ক্লাসে ঢুলে পড়ছে, আবার কেউ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এ-ক্লাস, ও-ক্লাস। মার্চ-এপ্রিল নাগাদ বেশির ভাগ স্কুলে নতুন ক্লাসে ভর্তির শুরু। কেউ সদ্য বাড়ি ছেড়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করবে, কেউ আবার পুরনো ক্লাসঘরটিতে একরাশ স্মৃতি ফেলে নতুন ক্লাসে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। এরই নাম শৈশব।
পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ জানালেন, হিয়ার সমস্যাটিকে বলা হয়, ‘সেপারেশন অ্যাংজ়াইটি’। প্রথম স্কুল যাওয়ার সময়কালে বহু শিশুর মধ্যেই এই সমস্যা দেখা যায়। অনেকের ক্ষেত্রে তা দীর্ঘ সময় ধরে চলে। কিন্তু এর জন্য ভয় পেয়ে শিশুকে স্কুল থেকে ফেরত নিয়ে আসা বা স্কুলে না পাঠানোর মতো কাজ করা থেকে অভিভাবকদের বিরত থাকতে হবে। বরং, যার সেপারেশন অ্যাংজ়াইটি যত বেশি, তাকে তত বেশি নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস করাতে হবে। একই সঙ্গে ছোট ছোট অ্যাক্টিভিটি ক্লাসেও নিয়ে যেতে হবে। এতে ‘স্কুল’ সম্পর্কে ভীতি কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে, মেলামেশার পরিসরটাও বাড়বে। আর দরকার একটু উৎসাহ দেওয়া। ‘বাহ্! তুমি তো বড় হয়ে গিয়েছ। নিজে নিজে কী সুন্দর স্কুলে যেতে শিখেছ’— এই সামান্য কথাগুলিও ছোটদের অনেকটা সাহস জোগায়। পাশাপাশি দেখতে হবে, তার টয়লেট ট্রেনিং, রোজ সকালে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস, সকালে ব্রাশ করা, তার পর কিছু খেয়ে স্কুলে যাওয়া— এই বিষয়গুলিও যেন যথাযথ হয়। নয়তো স্কুলে যাওয়ার পর অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়লে ওরা স্কুলে যেতে চাইবে না।
এর পরের ধাপে থাকবে আর একটু বড় বয়সের শিশু, যারা প্রি-প্রাইমারি পর্ব পেরিয়ে ওয়ান বা টু-এ উঠবে। মা-বাবারা ইতিমধ্যেই তাঁদের সন্তান সম্পর্কে স্কুলের ফিডব্যাক পেয়েছেন। কেউ হয়তো অতি চঞ্চল, কেউ অন্যদের ‘বুলি’ করতে অভ্যস্ত, কেউ আবার সহপাঠীদের কাছে ‘বুলিড’ হয়েছে, কেউ অতিরিক্ত কথা বলে। সেই জায়গাগুলিকে মেরামত করার আদর্শ সময় এটি। “যে শিশু কিছুটা আক্রমণাত্মক, তার ক্ষেত্রে বাড়িতে একটু কড়া নিয়মে বাঁধতে হবে মা-বাবাকে। যে শিশু অতি চঞ্চল, তার বাড়তি এনার্জি খরচ করার জন্য ফিজ়িক্যাল অ্যাক্টিভিটির ক্লাসে ভর্তি করাতে হবে। যে শিশু ‘বুলিড’ হয় স্কুলে, তার আউটডোর অ্যাক্টিভিটি বাড়াতে হবে, যাতে সে ক্লাসরুমে নিজের একটা অস্তিত্ব খুঁজে পায়, নিজের উপরে আস্থা গড়ে ওঠে। তা ছাড়া এই সময় থেকে পড়াশোনার ধরনও পাল্টাবে। ফলে যে মা-বাবারা অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকেন দিনের অনেকটা সময়, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে টিউটর রেখে সন্ধেবেলা সন্তানকে রোজ পড়তে বসার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে,” পরামর্শ পায়েলের।
শেষ ধাপে থাকবে হাই স্কুলে ওঠা বাচ্চারা। এদের সঙ্গে উঁচু ক্লাসের ছেলেমেয়েদের কথোপকথন বাড়ে। বড়দের কাছ থেকে তারা নানা বিষয় জানে, শোনে, যা হয়তো তাদের বয়সের পক্ষে উপযোগী নয়। তাই সিক্স-সেভেনের ছেলেমেয়েদের আগে থেকেই সে বিষয়ে খানিক ধারণা দিয়ে রাখা প্রয়োজন। বলে রাখা প্রয়োজন, যা কিছু তারা উঁচু ক্লাসের ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে শুনছে, জানছে, সবটাই তাদের জন্য নয়। সে বিষয়গুলিকে আপাতত উপেক্ষা করাই ভাল। পায়েল বলছিলেন, “পড়ার ক্ষেত্রেও এ সময় সেল্ফ স্টাডি এবং টিউশন স্টাডির মধ্যে পৃথক সময় বরাদ্দ করতে হবে। ছেলেমেয়ে যাতে এই ভারসাম্য নিজেরাই তৈরি করতে পারে, মা-বাবাকে লক্ষ রাখতে হবে। আবার এই সময়টা বয়ঃসন্ধি কালও বটে। তাই সেক্স এডুকেশন নিয়ে আলোচনা, পিরিয়ডের সমস্যা বিষয়ে জানিয়ে রাখা প্রয়োজন।”
টিন-এজ সন্তান এই সময়ে ‘বন্ধু’ ও ‘বিশেষ বন্ধু’র মধ্যে পার্থক্য করতে শেখে। সেই প্রসঙ্গে তারা যাতে মা-বাবার সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করতে পারে, সেই পরিসর তৈরি রাখা খুব জরুরি। কিছু কাজের বিনিময়ে সামান্য হাতখরচ দেওয়াও প্রয়োজন। কিছুটা আদর-আহ্লাদ, কিছুটা নজরদারি, আর অনেকটা খোলামেলা কথাবার্তার পরিবেশই এই সংবেদনশীল সময়ে মা-বাবার সঙ্গে সন্তানদের দূরত্ব তৈরি হতে দেয় না।
নতুন ক্লাস শুধু একটি বছর এগিয়ে যাওয়া নয়। সন্তানদের পাশাপাশি মা-বাবারও একটি অধ্যায় শেষ করে আর একটি অধ্যায়ের শুরু। তাকে ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করা উভয়পক্ষের জন্যই ভাল।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে