স্মৃতি থেকে অনুবাদ!
আর সেই অনুবাদে বরিশাল-খুলনা-চট্টগ্রামের স্বাদ, গন্ধ, ঝাঁঝ ও মশল্লা নিয়ে পাতে উঠে আসছে চালতা দিয়ে মুগ ডাল, কুমড়ো ফুলের বড়া, কচুর লতি। সঙ্গে চিতলের মুইঠ্যা অথবা লইট্যা মাছের ঝাল। শুধু ওপার বাংলাই নয়। পুরনো কলকাতার বর্ণ-গন্ধ নিয়ে হাজির থাকছে শুকতুনি, পেঁয়াজ-পোস্ত, চিংড়ি মালাইকারী, কামিনী আতপের পায়েস।
স্মৃতি থেকে অনুবাদ কেন? আর কোথায়ই বা ঘটছে এমন ‘ভোজ কয় যাহারে’?
ভোজনবিলাসীরা অধীর হচ্ছেন, তাই ‘ভেন্যু’টা আগে বলে দিই। নয়াদিল্লির সিরি ফোর্ট অডিটোরিয়ামের উল্টো দিকের বসতি শাহপুর জাট। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা শেষ করে সেই শাহপুর জাটেই একটি বঙ্গ রেস্তোরা খুলেছেন অনুমিত্রা ঘোষদস্তিদার। নামটি জব্বর— বিগ বং থিওরি!
এই বঙ্গ-রসনা-বিস্ফোরণ কেন্দ্রটি অনেকটাই স্মৃতিনির্ভর, জানাচ্ছেন অনুমিত্রা। আর সেটাই এই প্রয়াসের প্রধান ইউএসপি। তাঁর কথায়, ‘‘আজকের ফাস্ট ফুড আর দ্রুত ধাবমান যাপনে অনেক বাংলা খাবারই বাস্তবে আর পাওয়া যা না। স্মৃতিতে যার স্বাদ লেগে রয়েছে। আমি ছোট থেকেই বয়স্কাদের হাতের রান্না খেয়েছি। তাঁদের রান্নার বিবিধ কৌশল, যত্ন ও স্বাদ মনে করে রেখে দিয়েছিলাম। সেটাই এবার চেষ্টা করছি ফিরিয়ে আনার।’’ কিন্তু সেই চেষ্টা তিনি করছেন এমন জায়গায়, যা মূলত পঞ্জাবি, হরিয়ানভি, জাঠ অধ্যুষিত। যেখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে রূপসী বাংলার বিস্তর ব্যবধান। অনুমিত্রা এই প্রসঙ্গে বলছেন, ‘‘খাবারের ক্ষেত্রে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে বর্ণ রাজ্যভেদ বিশেষ থাকছে না আর। পছন্দসই হলে বাংলার খাবার চেটেপুটে খাচ্ছেন একজন পঞ্জাবি অথবা মহারাষ্ট্রের মানুষও। আর শুধু বাংলা বলেই নয়, সর্বত্রই বিভিন্ন আঞ্চলিক খাবারের চাহিদা খুব বাড়ছে।’’ বছর দেড়েক হতে চলল বিগ বং-এর বয়স। অবাঙালি খাদকের ভিড় ক্রমশ বেড়েই চলেছে এখানে।
দিল্লি চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার শহর। তাই চরম লু এবং হাড়কাঁপানো ঠান্ডার কথা মাথায় রেখে সেই ভাবেই বদলানো হয় এর মেনু। শীতকালে যেমন আপনি পাবেন হাঁসের ডিম, কষা মাংস, শুটকি মাছ লইট্যা—সবই একটু বেশি তেল-মশলায় গরগরে। আবার ঘোর গরমে গত বছর করা হয়েছিল পাঁচদিনের পান্তা উৎসব! সঙ্গে কাগজি লেবু, চিংড়ি মাছের চাট, ডালের বড়া। গ্রীষ্মকালে প্রত্যেকদিন তেতো এবং টক থাকবেই পাতে। বর্ষশেষে করা হয় পিঠে উৎসব। মরশুমি খাবার পরিবেশন করার মূল সুবিধাটা হল, বাজারে এমন কাঁচা মাল সব সময় পাওয়া যায়, যার স্বাদের নিশ্চয়তা রয়েছে। ‘‘শীত শেষ হয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর পর্যন্ত আমরা ফুলকপি রান্না করি ঠিকই, যদিও তখন কপির স্বাদ মরতে শুরু করে। সেই মরা স্বাদকে ঢাকার জন্য একটু ছলনার আশ্রয় নিতে হয় বৈকি!’’ সেই ছলনার কূটকৌশলটি অবশ্য ফাঁস করতে চাইছেন না অনুমিত্রা!
বাংলা নিয়ে কলকাতায় স্নাতক পর্ব সেরে হায়দরাবাদে অ্যাপ্লায়েড লিঙ্গুইস্টিকস নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশুনো। তারপর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল। কেতাবি পড়াশুনোর পাশাপাশি অনুমিত্রা গভীরভাবে ভেবেছেন, পড়েছেন রান্না নিয়ে। বিশেষ করে বাংলার ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া পদগুলি নিয়ে। বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর সাহিত্যে বর্ণিত প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন ঘরোয়া পদ, কর্মসূত্রে উত্তরবঙ্গের গ্রামে গ্রামে ঘুরে পরখ করা কচু, বাঁশপাতা, বোরোলি মাছের মহিমা, বিদেশি রান্নার সঙ্গে বাংলার গ্রামীণ মশলার আশ্চর্যজনক মিল (যেমন পর্তুগিজদের জাহাজে চেপে লঙ্কা আসার আগে পিপুলের বীজ, গোলমরিচ ইত্যাদি ব্যবহার করা হত ঝালের জন্য। ফরাসি বা মেক্সিক্যান রান্নাতেও সামান্য রকমফেরে এই মশলারই প্রয়োগ) খুঁজে নেওয়া— এই সব মিলিয়েই জন্ম নিয়েছে বিগ বং থিওরি।
আপাতত খুব স্বল্প পরিসরে শুরু করলেও, খদ্দেরের চাপে বি বং থিওরিকে খুব শীঘ্রই বড় করতে চলেছেন অনুমিত্রা।
আরও পড়ুন:
রোগা হওয়ার বাঙালি ডায়েট