Guilt tripping

নিজের কাজের দায় সন্তানের কাঁধে নয়

সব বিষয়ে সন্তানকে দোষ দেবেন না। দোষারোপের চক্রব্যূহ থেকে নিজেকে ও সন্তানকে দূরে রাখুন।

নবনীতা দত্ত

শেষ আপডেট: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০০
Share:

অনেক সময়ে নিজের জীবনের সমস্যার জন্য মা-বাবা সন্তানকে দায়ী করেন। হয়তো অফিসের কোনও কাজ হল না বা বাড়িতে সমস্যা হল, সঙ্গে সঙ্গে সেই রাগ গিয়ে পড়ল সন্তানের উপরে ‘তোর জন্য হল এটা!’ বা ঘুরতে যেতে না পারলে সন্তানকে বলতে থাকেন ‘তোর পরীক্ষার জন্য কোথাও যেতে পারছি না’। সব কিছুতে সন্তানকে দোষারোপ করার অভ্যাস থেকে অভিভাবককে বেরোতে হবে। এই ধরনের কথায় অজান্তেই সন্তানের মনে ক্ষত তৈরি হয়। কাউকে কোনও বিষয়ে দায়ী করা বা দোষ দেওয়ার অভ্যাসকেই আধুনিক ভাষায় বলে গিল্ট ট্রিপিং। এতে দুই পক্ষের সম্পর্ক তো খারাপ হয়ই, উল্টো দিকে সন্তান নিজেকে বোঝা ভাবতে শুরু করে, তার চারিত্রিক বিকাশও ঠিকমতো হয় না।

গিল্ট ট্রিপিংয়ের কারণ কী?

পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ বলছেন, “এখন বেশির ভাগ নিউক্লিয়ার পরিবার। মা-বাবা দু’জনেই কর্মরত। এক দিকে সংসার, এক দিকে কাজ, তার সঙ্গে সন্তানের দায়িত্ব পালন। সব দিক সামলাতে কোথাও না কোথাও ভুল হবেই, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই রাগ আর ক্ষোভটা গিয়ে পড়ে সন্তানের উপরে। অনেক সময়ে আবার বাচ্চারা দাদু-ঠাকুমার কাছে থাকে। তাঁরা হয়তো বলে বসেন, ‘তোমার জন্য মা-বাবা এত পরিশ্রম করছে আর তুমি এই রেজ়াল্ট করছ?’ এখানে মা-বাবার পরিশ্রমের মূল্য শিশুটির কাছে চাওয়া হচ্ছে, সেটা তো ঠিক না। মা-বাবা কাজ করছেন নিজেদের জন্য, কিন্তু তার দায় চাপাচ্ছেন সন্তানের উপরে।” বারবার এই এক কথা শুনতে শুনতে একটা সময় সন্তান নিজেকে বোঝা ভাবতে শুরু করে। নিজেদের অস্তিত্বটাই অপ্রয়োজনীয় মনে করে তারা। “অনেক মা-বাবা আবার এমনও বলে থাকেন যে, ‘তোর জন্য এই সংসারে রয়েছি, না হলে বিয়ে ভেঙে কবেই বেরিয়ে যেতাম।’ আমার কাছে এমন কেসও এসেছে, যেখানে সব কিছুর জন্য দায়ী ভেবে এক টিনেজার নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথাও ভেবেছে। সন্তানের শিশুমনে আমাদের কথা কতটা ভার তৈরি করছে, সেটা বোঝা দরকার,” বললেন পায়েল।

সন্তানের উপরে যে প্রভাব পড়ে

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দেবারতি আচার্য বললেন, “গিল্ট ট্রিপিংয়ের মধ্য দিয়ে যে সন্তানরা বড় হয়, তাদের মানসিক দৃঢ়তা তৈরি হয় না। সারাক্ষণ অ্যাংজ়াইটি, অপরাধবোধে ভুগতে থাকে। তাঁদের আত্মবিশ্বাস থাকে না। যত বড় হয়, তারা যে দোষ করেনি, সেই দোষের বোঝাও নিতে থাকে। জীবনে এমন লোকও প্রচুর আসে, যারা নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়, এরা সে ক্ষেত্রে ভিক্টিম হয়ে যায়।” বন্ধু বা সহকর্মীরা ভুল করলেও এদের উপরে দোষ চাপিয়ে দেয় আর এরাও ভাবতে থাকে দোষটা হয়তো তারই।

দেবারতি আরও বললেন, “বাউন্ডারি সেট করতেও এদের সমস্যা হয়। কাউকে ‘না’ বলতে পারে না এরা। কোন অবধি মিশব বা কোনটা করব না, সেই সীমারেখা নিজে ঠিক করতে পারে না। ভবিষ্যতে কোনও সম্পর্কে জড়ালে সেখানেও ম্যানিপুলেশনের শিকার হয়। তাই শাসন আর গিল্ট ট্রিপিংয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখাটা খুব জরুরি। শাসন করা মানে সন্তানকে কটু কথা বলা বা শাস্তি দেওয়া নয়, বরং তার মধ্যে দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে।”

দায় চাপানোর অভ্যাসথেকে বেরোতে হবে

সন্তানকে দায়ী করা বা দোষ দেওয়ার মানসিকতা বদলাতে হবে। গিল্ট ট্রিপিংয়ের কিছু লক্ষণ থাকে, সেগুলো চিহ্নিত করা দরকার।

নিজের দুঃখ-কষ্ট বা ত্যাগের কথা বারবার সন্তানকে বলে যাবেন না।

সন্তান কোনও কাজ করতে না চাইলে তা অকৃতজ্ঞতা হিসাবে দেখবেন না। তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

দেবারতির কথায়, “শর্তসাপেক্ষ ভালবাসা আর একটা লক্ষণ। অনেক সময়ে আমরা একটা কাজের বদলে আর একটা কাজের প্রতিশ্রুতি দিই। যেমন, তুমি এ বার রেজ়াল্টে এত পার্সেন্ট মার্কস আনো, তা হলে আমিও তোমায় ভালবাসব বা কিছু কিনে দেব... এই ধরনের শর্ত থেকে বেরোতে হবে। বারবার এই শর্তারোপ ঠিক নয়।”

গিল্ট ট্রিপিংয়ের শিকার যখন নিজেরা

শুধু সন্তানের কাঁধে দোষ চাপাচ্ছেন অভিভাবক, সেই উদাহরণ যেমন আছে, তেমন তিনি নিজেও একই ঘটনার শিকার সেই উদাহরণও রয়েছে। মা-বাবার বয়স হয়ে গেলে তাঁরাও অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের কাঁধে দোষ দিতে শুরু করেন। তার থেকে হতাশা, অবসাদ গ্রাস করে, যার বহিঃপ্রকাশ কখনও সে তার নিজের সন্তানের উপরেই করে ফেলে। পায়েল ঘোষ বললেন, “বয়স হলে মা-বাবারা অনেক সময়েই ভাবেন তাঁরা একা হয়ে গিয়েছেন। সন্তানরা তাঁর খেয়াল রাখছে না। সে কথা হয়তো বলেও ফেলেন যে, ‘তোমরা তো আমার কথা ভাবোই না, আমাদের সময়ই দাও না।’ এ ক্ষেত্রে যাঁরা মধ্যবয়সে তাঁরা জাঁতাকলে পড়ে যান। এখানে একটু শক্ত হতে হবে। মা-বাবার প্রতি অবশ্যই দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু তার পাশাপাশি নিজের জন্য, নিজের সন্তান ও পরিবারের জন্যও সময় রাখতে হবে। দরকারে মা-বাবাকে বোঝাতে হবে যে, এর বেশি সময় দেওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। নিজের সমস্যা বলতে হবে। তাঁরাও বুঝতে পারবেন।”

কিন্তু সারাক্ষণ নিজে যদি দোষের বোঝা কাঁধে নিয়ে দৌড়ে যান, তা হলে সন্তানকেও ঠিক মতো বড় করে তুলতে পারবেন না। সেই দোষের বোঝা কখন অজান্তেই যে নিজের সন্তানের কাঁধে দিয়ে ফেলবেন, বুঝতে পারবেন না। তাই আগে নিজে ভাল থাকা জরুরি। অনেক সময়ে দেখা যায়, বাড়িতে অসুস্থ মা-বাবা বা শ্বশুর-শাশুড়ির জন্য অনেকে বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দেন। তাঁদের একা রেখে বেরোলে অপরাধবোধে ভুগতে থাকেন। “এই মানসিকতারও বদল দরকার। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জড়তা, বার্ধক্য গ্রাস করে। ফলে যতটা সম্ভব আপনি তাঁদের সাপোর্ট দেবেন। তার পাশাপাশি নিজের মনের যত্নও দরকার।”

তাই গিল্ট-ট্রিপিংয়ের চক্রব্যূহে না ঢুকে নিজের কাজের দায় নিজে নিতে শিখুন। কাউকে দোষ না দিয়ে কোনও পরিস্থিতি সামলাতে আপনার পক্ষে যতটা সম্ভব, সেটুকুই করুন। মনে রাখতে হবে অভিভাবকও একজন মানুষ। তাঁদেরও ক্লান্তি, হতাশা, অপূর্ণতার ক্ষোভ থাকে, সেটা মেনে নিন। সেই অপ্রকাশিত চাহিদা বা কষ্টের বহিঃপ্রকাশ যেন সন্তানের উপরে না ঘটে, সেটুকু খেয়াল রাখুন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন