সঙ্গীর সঙ্গে কাটানো ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিয়ো রেকর্ড করছে এআই চশমা। ছবি: ফ্রিপিক।
চশমাতেই সেন্সর, প্রসেসর। আছে মাইক্রোফোনও। সে চশমা শুধু দেখে না, শোনে, বোঝে এবং অনুবাদও করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত এমন ‘স্মার্ট’ চশমা এনে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল মেটা। জানিয়েছিল, তাদের তৈরি ‘রে ব্যান মেটা অগমেন্টেড রিয়্যালিটি গ্লাসেস’ শুধু দেখে না, দৃষ্টির অগোচরে থাকা আরও অনেক বিষয়কেও স্পষ্ট করে তোলে। মেটার এআই চশমা পরিহিত দেখা যায় মার্ক জ়ুকেরবার্গকেও। এ হেন চশমা নিয়ে যখন বিশ্ব জুড়ে তোলপাড় চলছে, তখনই এক ভয়াবহ তথ্য সামনে আনল সুইডিশ সংবাদমাধ্যম। জানা গিয়েছে, এ হেন চশমা ব্যক্তিগত জীবনের আগা-গোড়া ফাঁস করে দিচ্ছে। শৌচাগার থেকে শোয়ার ঘর— জীবনের অতি গোপন মুহূর্তগুলিই চলে যাচ্ছে ডার্ক ওয়েবে।
মেটা রে-ব্যান চশমাটি চোখে থাকলেই তা রেকর্ড করতে থাকবে সব কিছু। আপনি যা যা দেখছেন, যা করছেন তার সবটাই থাকবে চশমার স্মৃতিতে। আর সেখানেই থাবা বসাচ্ছেন কেনিয়ার একদল প্রযুক্তিকর্মী। কেনিয়ার নাইরোবিতে অবস্থিত 'সামা' নামক এক সংস্থার কর্মীরা মেটা এআই চশমার মেমরিতে থাকা যাবতীয় তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছেন। ভাবুন তো, আপনারই ব্যক্তিগত ও অতি গোপন মুহূর্তগুলিও কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে বসে সিনেমার মতো উপভোগ করছেন কয়েকশো কর্মী। সেই ভিডিয়োগুলি চিহ্নিত করে বাছাইয়ের কাজও চলছে। তার পর সেগুলি চলে যাচ্ছে ডার্ক ওয়েবে।
চশমার আড়ালে গুপ্তচরবৃত্তি
কেনিয়ার ওই তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার এমন গোপন ক্রিয়াকর্ম ফাঁস হয়েছে সম্প্রতি। সুইডেনের এক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, চশমা পরে যা যা কাজ করা হবে, তার সবটাই রেকর্ড হয়ে যাবে। এখনও অবধি যে সব ভিডিয়ো ফুটেজ পাওয়া গিয়েছে তাতে যৌনতা থেকে প্রাতঃক্রিয়া, সবই রয়েছে। পোশাক বদলানোর কয়েকশো ভিডিয়ো রেকর্ড হয়ে গিয়েছে। সেই সবই নিজেদের ডিভাইসে চালিয়ে দেখেছেন ওই প্রযুক্তিকর্মীরা। ব্যবহারকারীরা জানেনই না, যে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের ছবি ও ভিডিয়োই ফাঁস হয়ে গিয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। চশমা চোখে দিয়ে যদি অনলাইনে কেনাকাটা অথবা ব্যাঙ্কের কাজকর্ম করেন, তা হলে সে সব তথ্যও রেকর্ড হয়ে থাকবে চশমার মেমরিতে। চশমার ক্যামেরা দিয়ে যা যা দেখা যাবে, সে ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের নম্বর হোক বা সিভিসি কোড, অনলাইনে টাকাপয়সা লেনদেনের যাবতীয় তথ্য, এমনকি সমস্ত জরুরি অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ডও রেকর্ড হয়ে যাবে। আর তা চাইলেই চশমার মেমরি থেকে বার করে নেওয়া যাবে।
ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল মেটা। তবে অভিযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত অ্যালগরিদ্মেই এত বড় ফাঁক রয়ে গিয়েছে যে, সাইবার অপরাধীরা চাইলেই সেখানে সিঁধ কাটতে পারে। গত বছরই প্রায় ৭০ লক্ষের বেশি এআই চশমা বেচেছে মেটা। আর সেই ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত জীবনের যাবতীয় তথ্য ও ভিডিয়ো এখন অনেকের ল্যাপটপ বা কম্পিউটারেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
এই বিষয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানিয়েছেন, মেটা এআই চশমায় এমন প্রযুক্তি রয়েছে, যা পরে কারও দিকে তাকালে সেই ব্যক্তির মুখাবয়ব শনাক্ত করে তাঁর নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর বার করে ফেলা সম্ভব। আবার চশমা পরে আপনি কোন দিকে দেখছেন, কার সঙ্গে কথা বলছেন ও কী কথা বলছেন, সেই ডেটাও রেকর্ড করে রাখা যায়। চশমার মাইক্রোফোন সব সময়েই চালু থাকে। কাজেই, ব্যক্তিগত আলোচনাও সে শুনে তার মেমরিতে জমিয়ে রাখতে পারে। ফলে চশমা হ্যাক করে সেই সব তথ্য হাতিয়ে নেওয়া খুব সহজ। তাই গবেষকদের পরামর্শ, ‘স্মার্ট চশমা’ ব্যবহার করুন, তবে সাবধানে। প্রয়োজনে এর 'ডেটা শেয়ারিং' অপশন বন্ধ রাখাই শ্রেয়।