ক্যারাম্যালাইজ় সোমাইয়ের বাটিতে রাবড়িতে ডোবা বাহারি গুলাব জামুন। ছবি: সংগৃহীত।
এমন যদি হত, পিছুটান ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন নিরুদ্দেশে! হাইওয়ের ধরে হাঁটতে হাঁটতে কোনও ট্রাক চালককে থামিয়ে উঠে পড়লেন। মাঠ, আকাশ, পরিবেশ ভাল লাগল যেখানে, সেখানে নেমে পড়লেন।
গ্রাম থেকে শহর হয়ে মফস্বলের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে খিদের টানে কখনও কোনও গ্রামে মাটির দাওয়ায় পাতার থালায় খেলেন মোটা চালের ভাত-কালো ডাল আর নাম না জানা সব্জি। আবার কখনও হাইওয়ের ধারের ধাবায় দড়ির খাটিয়ায় বসে খেলেন সর্ষে শাক আর বাজরার রুটি। কোনও শহরে টুন্ডে কাবাব পেলেন তো কোথাও খেলেন সুগন্ধী দই-ভাত। কোনও শীতের রাতে কেউ উনুনে খামিরি রুটি বানিয়ে মাংসের লাল ঝোল-সহ এগিয়ে দিলেন। যত এগোলেন, পরিবেশ যত বদলাল, ততই ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকল খাবারের থালা। সেই খাবারের বৈচিত্র আর মাটির গন্ধের মধ্যে দিয়েই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করল বৈচিত্রময় দেশের এক অন্য মানচিত্র!
যাযাবর মনকেই উসকে দেবে খাবার-পানীয়!
খাবারের থালায় বিশ্ব দর্শনের কথা বলেছেন বহু দার্শনিক। কেউ বলেছেন, ‘খাবার যে কোনও সংস্কৃতির জীবন্ত জাদুঘর’। কেউ বলেছেন, ‘কোনও সংস্কৃতিকে উপভোগ করতে হলে তার স্বাদ নিতে হবে।’ তবে তার জন্য নিরুদ্দেশে বেরিয়ে যাযাবর হতে হবে না। গুনতে হবে না পথের ধারের মাইলফলক। শহুরে খোলসে মোড়া যাযাবর মনের খিদে মেটানোর ব্যবস্থা রয়েছে শহরের চৌহদ্দিতেই। দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জে হাজারো বহুতলের ভিড়ে গত কয়েক বছর ধরেই রয়েছে সেই ঠিকানা। হায়াত সেন্ট্রিকের যাযাবর।
নেপালের ঝোল মোমো।
এ জায়গায় এলে অমসৃণ কাঠের টেবিলে দেখা মিলবে ছোট ছোট মাইলফলকের। কোথাও চোখে পড়বে মিনিয়েচার ট্রাকের সারি, চাল-ডালের বস্তা। খাবার পরিবেশিত হবে মাটি কিংবা পিতলের থালায়। কিংবা একটু অন্য রকম দেখতে সেরামিকের প্লেটে। আর যে খাবার পরিবেশন করা হবে তার রন্ধনপ্রণালী এ দেশের গ্রাম,শহর,পাহাড়, নদী, সমুদ্রের পাড় থেকে তুলে এনেছেন যাযাবরের রান্নাঘরের দায়িত্বে থাকা রন্ধনশিল্পীরা। তার মধ্যে অনেক কিছুই চেনা, আবার কিছু থাকবে অচেনা। তবে এখানকার রাঁধুনিরা চেনা খাবারকেও এমন সাজিয়েগুছিয়ে পরিবেশন করবেন যে চেনা বলে মনে হবে না।
চুকন্দর আদতে বিট। চুকন্দর বাদাম কে কাবাবের স্বাদ বাঙালির চেনা ভেজিটেবল চপের কাছাকাছি।
যেমন ধরা যাক চুকন্দর বাদাম কে কবাব। আদতে বিটের সঙ্গে বিভিন্ন মশলা আর বাদাম মিশিয়ে তৈরি চ্যাপ্টা গোল কবাব। যার স্বাদ অনেকটা বাংলার ভেজিটেবল চপের মতো। তবে মোড়কটি তার থেকে অনেক বেশি কেতাদুরস্ত। আবার জলন্ধর কি কড়াই সব্জি আসলে পঞ্জাবের এক মশালাদার নানা রকমের সব্জির তরকারি। যা কড়াই মশলার ছোঁয়ায় আরও সুস্বাদু হয়েছে। বাংলার মাছের ঝাল থেকে ওড়িশার পাতাপোড়া চিকেন থেকে শুরু করে নেপালের ঝোল মোমো হয়ে ভুটানের এমা দাৎসি।
যাযাবরের মাছের ঝোল।
ব্রিটিশরা এ দেশে দীর্ঘ সময়ে থেকেছেন। তাই এ দেশে অ্যাংলো সংস্কৃতির প্রভাব ঘোর। এ দেশের মানুষ ইউরোপীয় খাবার দাবার খেতেও পছন্দ করেন। সে কথা মাথায় রেখে লাজ়ানিয়াও রয়েছে। শেষ পাতে মিষ্টিতে রয়েছে বেলজিয়ান চকোলেট ব্রাউনি। তবে তার পাশাপাশিই রাখা হয়েছে রাবড়িতে চোবানো ক্যারামেলাইজ়়ড সেমাইয়ের ঝুড়িতে বসানো ছোট ছোট গুলাব জামুন।
পাশাপাশি ইমলি কা অম্লানা আর মাটির কলসিতে পিন্ড।
গলা ভেজানোর জন্য রয়েছে এ দেশের প্রাদেশিক কিছু পানীয়। ইমলি কা অম্লানা, পিন্ড, কম্বুচা, জিঞ্জার অ্যালে থেকে শুরু করে লেমনেড, আইসড টি, ফিল্টার কাপি, হট চকোলেট, কড়ক চায়ে। পাশাপাশি রয়েছে, ‘কঠিন’ পানীয় এবং ককটেলের সম্ভার। সব মিলিয়ে যাযাবর মেজাজ যদি ডাক দিয়ে থাকে তবে নিরুদ্দেশে বেরোনোর আগে এক বার এখানে এসেও দেখা যেতে পারে।