politicians get on their Bikes

সাইকেলে চেপে বিধানসভায় মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ! দিচ্ছেন জ্বালানি বাঁচানোর বার্তা, কিন্তু শহর কি আদৌ প্রস্তুত?

দেশের প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বানের প্রেক্ষিতে রাজ্যের ক্রীড়া এবং যুবকল্যাণ মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁয়ের উদ্যোগের প্রশংসা করছেন কেউ, কেউ আবার বলছেন গোটা বিষয়টি লোক দেখানো। কিন্তু সাইকেল আরোহীদের জন্য কি আদৌ প্রস্তুত এই শহর?

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ ১৫:০৩
Share:

রাজ্যের ক্রীড়া এবং যুবকল্যাণ মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ। ছবি: সংগৃহীত।

সাইকেল চেপে বিধানসভায় ঢুকছেন রাজ্যের ক্রীড়া এবং যুবকল্যাণ মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ। ২৪ জুন (বুধবার) তিনি নিজের বিলাসবহুল সরকারি চারচাকা গাড়ি ও মন্ত্রীদের চেনা কনভয় সংস্কৃতি দূরে সরিয়ে রেখে নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়াম থেকে সাধারণ মানুষের মতো সাইকেল চালিয়ে বিধানসভা ভবনে উপস্থিত হন। সাইকেলে চড়ে মন্ত্রী আসছেন বিধানসভায়, এমন ভিডিয়ো আর ছবি ভাইরাল হতেও সময় লাগেনি। দিন দশেক আগে হলদিয়ার বিজেপি বিধায়ক প্রদীপ বিজলিকেও দেখা গিয়েছিল একই কাজ করতে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব সারা বিশ্বেই পড়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বানের প্রেক্ষিতে নবনির্বাচিত বিধায়ক ও মন্ত্রীর এই উদ্যোগ দেখে কেউ প্রশংসা করছেন, কেউ আবার বলছেন পুরোটাই লোক দেখানো।

Advertisement

তবে মন্ত্রী-বিধায়কের এই উদ্যোগ দেখে আবার সাইকেলকে ঘিরে ভাবনা শুরু হয়েছে। এমন নিত্যপ্রয়োজনীয় বাহনের সত্যিই তো কোনও বিকল্প নেই। এতখানি দূষণমুক্ত, এবং সাশ্রয়ী বাহন আর কী-ই বা আছে? দেশের পেট্রলিয়ামজাত জ্বালানির ব্যবহার কমানো হোক কিংবা বিশ্ব জুড়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণ— সর্বত্রই সাইকেলের প্রয়োজনীয়তা এখন আবার নতুন করে উপলব্ধি করছেন মানুষ। পেট্রলের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে মোটরবাইক বা স্কুটার চালানোও অনেকের কাছেই বিলাসিতার বিষয় হয়ে উঠতে পারে, এমন ভাবনাও শুরু হয়েছে অনেকের মনেই। কিন্তু সাইকেল চিরকাল মধ্যবিত্তের হাতের নাগালেই ছিল, আর থাকবেও।

বারাক ওবামা, ভ্লাদিমির পুতিন, বরিস জনসন এবং জর্জ ডব্লিউ বুশ।

নেতাদের মধ্যে সাইকেল কালচার অবশ্য নতুন নয়! এর আগেও ২০২১ সালে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে সাইকেলে চেপে বিধানসভায় পৌঁছেছিলেন সিঙ্গুরের তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক তথা শ্রমমন্ত্রী বেচারাম মান্না। ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য হর্ষ বর্ধন সাইকেলে চড়ে নির্মাণ ভবনে পৌঁছন। কলকাতায় এই পরিবেশবান্ধব বাহনের সঙ্গে প্রতি দিন যুক্ত লক্ষাধিক শ্রমজীবী মানুষ। তাঁদের জীবিকা অর্জনের একটি প্রধান সহায় সাইকেল। তবে এখন গরিবের বাহন চড়ছেন দেশের মন্ত্রীমশাইরাও। তথাকথিত মন্ত্রীদের মধ্যে শক্তি আর সামর্থ্য দেখানোর একটা প্রদর্শনী চলতেই থাকে। সেখানে এখনকার দিনের মন্ত্রীরা চেনা ছকের বাইরে গিয়ে সাধারণের বাহনকেই আপন করে নিচ্ছেন। যেখানে ইন্দ্রনীল খাঁয়ের এই উদ্যোগ আমজনতা হাঁ করে দেখছেন, সেখানে বিদেশের পথে প্রেসিডেন্টও সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন, এমন ছবি দেখতে অভ্যস্ত অনেক দেশের নাগরিকমণ্ডলী। আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, বারাক ওবামা, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বিল ক্লিনটনকেও দেখা গিয়েছে সাইকেলে চড়ে ঘুরতে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, ফ্রান্সের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি ও ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ, মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এবং ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন— সকলকেই সাইকেল চালাতে দেখা গিয়েছে।

Advertisement

সে দিন বিধানসভা চত্বরে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ বলেন ‘‘দৈনন্দিন জীবনে আমরা বাড়ি থেকে কাছাকাছি কোনো বাজার, ক্লাব কিংবা মেট্রো স্টেশনের মতো অল্প দূরত্বের যাতায়াতের জন্য চারচাকার গাড়ি বা মোটরবাইক ব্যবহার করি। এই ছোট দূরত্বের জন্য যদি আমরা গাড়ির বদলে সাইকেলে ভরসা রাখি, তবে বিপুল পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি বাঁচানো সম্ভব।” মন্ত্রীর মতে, সাইকেল চালানো শুধু পরিবেশ-বান্ধবই নয়, এটি ফিটনেস ধরে রাখতে এবং শরীরকে সুস্থ-সবল রাখতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অর্থাৎ আধুনিক জীবন যতই এগিয়ে যাক, সাইকেলের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাওয়ার নয়।

সাইকেল চালানোর জন্য শহর কতটা প্রস্তুত?

কলকাতা সাইকেল সমাজ-এর সদস্য এবং সাইকেল আরোহী বিশ্বজিৎ সরকার জানাচ্ছেন, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, জার্মানির মতো ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং চিন, জাপানের মতো এশিয়ার অনেক দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ সাইকেল ব্যবহার করেন। সাইকেলে চেপে রাষ্ট্রনেতা বা মন্ত্রীরা কাজে যাচ্ছেন, এমন দৃশ্য সেখানে দুর্লভ নয়। ভারতেও চণ্ডীগড়, পুণে, বেঙ্গালুরুর মতো শহরে সাইকেল আরোহীদের জন্য বিবিধ সুবিধা রয়েছে। বিশ্বজিৎ বলেন, ‘‘অথচ আমাদের শহরে সাইকেল চড়লে জরিমানা দিতে হয়। বিগত সরকারের আমলে যে সব নতুন রাস্তা ও উড়ালপুল তৈরি হয়েছে, সেগুলি সবই গাড়ি চলার কথা ভেবে। সাইকেল আরোহীর কথা কেউ ভাবেন না। শহরের রাস্তায় সাইকেল চালানোর উপযুক্ত পরিকাঠামো থাকলে আরও অনেকে নিয়মিত সাইকেলে যাতায়াত করতেন বলে আমাদের বিশ্বাস। তবে এ দাবি আমরা বহু বার তুলেছি, নতুন সরকারের আমলে সুরহা হবে কি না, সেটাই দেখার।’’

কেবল শুটিং ফ্লোরেই নন, প্রয়োজনে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে সাইকেলে করেই যাতায়াত করেন অভিনেতা সু্দীপ মুখোপাধ্যায়। সুদীপ বলেন, ‘‘সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করতে আমার ভীষণ সুবিধা হয়। পার্কিংয়ের সাংঘাতিক ঝামেলা নেই, রাস্তাঘাটে যানজটে খুব বেশি সময় অপচয় হয় না, অলিগলি দিয়ে খুব গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারি। তাই ৩০, ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে কোথাও যেতে হলে সাইকেলই আমার প্রথম পছন্দ। তা ছাড়া, জ্বালানির সাশ্রয় করার বিষয়টিও মাথায় রাখি অবশ্যই।’’ বেশ কয়েক বছর ধরেই শহরের রাস্তায় সাইকেল চালাচ্ছেন সুদীপ, তবে তাঁকে যে খুব বেশি সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে, এমন নয়। অভিনেতার মতে, শহরের বেশ কিছু রাস্তায় সাইকেল চালানো মানা, কিন্তু তার কোনও সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা কারও কাছেই নেই। মাঝেমধ্যেই সাইকেল আরোহীদের সেই কারণে জরিমানা দিতে হয়। এই বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া দরকার।

অন্যান্য সাইকেল সংগঠনেরও বক্তব্য, সদিচ্ছা থাকলে উপায় হতে পারে। সাইকেল নেটওয়ার্ক গ্রো (সিএনজি)-এর প্রতিষ্ঠাতা আশিস বাজাজের প্রশ্ন, বাইপাসের সম্প্রসারণ হলেও সাইকেলপথের কথা তো কেউ ভাবলেন না? তাঁর কথায়, নিউ টাউনে সাইকেল রাস্তার নামে যেটা করা হয়েছে, তাতে কোনও লাভ নেই। রাস্তা জুড়ে নির্মাণসামগ্রী পড়ে থাকে। অটো, টোটোও রেখে দেওয়া হয়।

অন্য দিকে শহরে সাইকেল আরোহীদের তেমন উৎসাহ দেওয়া হয় না, তা নিয়ে আক্ষেপের সুর কলকাতা সাইকেল সমাজ-এর আহ্বায়ক রঘু জানার গলায়। শহরের রাস্তায় সাইকেলের অবাধ বিচরণ ও নিরাপদে সাইকেল চালানোর জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মতো কলকাতাতেও পৃথক রাস্তার দাবিতে সরব সংগঠনটি। তাঁর কথায়, যে যান দূষণহীন, স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল, তাকেই আটকানো হচ্ছে? এ শহরের বিভিন্ন রাস্তায় বন্ধ সাইকেল। অথচ এ নিয়ে ভাবলে শুধু যে মানুষের উপকার হত তা-ই নয়, পরিবেশ দূষণও কমত।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement