ছবি : সংগৃহীত।
বড়দিন মানে কেক। ঠিকই। কিন্তু বড়দিনে সকাল থেকে রাত শুধু কেক খেয়ে নিশ্চয়ই কাটান না সাধারণ মানুষ। উৎসবের দিনে মধ্যাহ্নভোজ থেকে শুরু করে নৈশভোজ, প্রাতরাশ থেকে বিকেলের স্ন্যাকিং সর্বত্রই মেনুতে থাকে বিশেষত্ব। কেক বাদেও নানা ধরনের মিষ্টি-টক-ঝাল-নোনতা স্বাদের খাবার থাকে সেই তালিকায়, যা বড়দিনের বিশেষ ভোজের জন্যই বানানো হয়।
এ রাজ্যেই যেমন বড় দিনে রোস্ট করা গোটা মুরগির মাংস বা টার্কি, মটন বল কারি আর ইয়েলো রাইস, প্যাটিস, হোমমেড ওয়াইন, আইরিশ স্ট্যু, মাংসের ডাকবাংলো, প্যান্থেরাস ইত্যাদি নানা ধরনের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান খাবার খাওয়ার চল আছে। কেক তো বটেই, বড়দিনের ডিনারে অনেকেই বো ব্যারাকসে গিয়ে এই ধরনের খাবার উপভোগ করেন। কিন্তু ক্রিসমাস উপলক্ষে দেশের অন্যান্য রাজ্যের মানুষ কী খান?
এ দেশে যে সমস্ত অঞ্চলে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে অন্যতম হল গোয়া, কেরল এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু রাজ্য। সেই সমস্ত রাজ্য এবং আরও কিছু রাজ্যের বড়দিনের স্পেশ্যাল মেনু জেনে নিন।
১. গোয়া
গোয়া এক কালে পর্তুগিজ় উপনিবেশ ছিল। গোয়ার চার্চ, খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের এলাকা এবং তাঁদের খাওয়াদাওয়ায় তাই পর্তুগিজ় সংস্কৃতির প্রভাব বেশি। বড়দিন গোয়ায় পালন করা হয় জাঁকজমক করেই। কেকের বাইরে সেখানে যে সমস্ত খাবার খাওয়া হয়, তাতেও পর্তুগিজ় প্রভাব রয়েছে।
বেবিঙ্কা : গোয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় মিষ্টি। নারকেলের দুধ, ডিমের কুসুম এবং ঘি দিয়ে তৈরি কেক। তবে সাধারণ কেকের মতো দেখতে নয়। ১৬টি স্তর তৈরি করে তার পরে বেকিং করা হয় এই কেক। এর ক্যারামেলের স্বাদ মন ভোলানো।
পর্ক ভিন্দালু: ভিনেগার এবং রসুন দিয়ে তৈরি একটি ঝাল ও টক স্বাদের শূকরের মাংসের কারি। এই রান্নাটি এতটাই জনপ্রিয় যে গোয়ার সীমা পেরিয়ে গোটা ভারতেই ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় মুরগির মাংস বা পাঁঠার মাংস দিয়েও ভিন্দালু বানানো হয়।
সরপোতেল: সারপোতেল মানে ধন্দ। যদিও এই খাবারের স্বাদ নিয়ে কোনও ধন্দ নেই। গোয়ার বড়দিনের উৎসবে বহু পরিবারেই এই সারপোতেল রান্না করা হয়। শূকরের মাংস দিয়ে তৈরি এই খাবারকে দীর্ঘ ক্ষণ ধরে অল্প আঁচে রান্না করা হয়। স্বাদও টকঝাল প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রান্না হয়। ছোট ছোট টুকরো মাংস আর টক ঝাল গ্রেভির এই পদটি পরিবেশন করা হয় বান রুটি দিয়ে।
কুলকুলস: দেখতে শাঁখের মতো। তৈরি হয় ময়দাকে ডুবো তেলে ভেজে। উপরে দেওয়া হয় নারকেল এবং গুড়ের পুরু স্তর। বাইরে থেকে কুড়মুড়ে এবং ভিতরে নরম এই মিষ্টি স্বাদের খাবারটি গোয়ার জনপ্রিয় বড়দিনের মিষ্টি গুলির একটি।
চিকেন জ়াকুটি: ঝাল ঝাল মুরগির মাংসও থাকে গোয়ার বড়দিনের ভোজে। ১৬টিরও বেশি মশলা ভেজে গুঁড়িয়ে নিয়ে তার সঙ্গে পোস্ত, নারকেল কোরানো মিশিয়ে তৈরি হয় মাংসের ঘন গ্রেভি। তার মধ্যে থাকে হাড় সমেত মাংসের টুকরো। এই রান্নাটি গোয়ার পোই ব্রেড সহযোগে পরিবেশন করা হয়। গোয়ার বড়দিনের উৎসবে এই রান্নাটি থাকবেই।
২. কেরল
কেরলের খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস প্রায় ২০০০ বছরের পুরনো। চতুর্থ শতাব্দী থেকে এ অঞ্চলের সঙ্গে মেসোপটেমিয়ায় অবস্থিত পারস্য বা পূর্ব সিরিয়ার গির্জার সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই অঞ্চল থেকে মিশনারি এবং বণিকরা কেরলে আসেন, যা স্থানীয় সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করে। কেরলে এসে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচার করেন সিরিয়ার মিশনারি সেন্ট থমাস। তাই কেরলে সিরিয়ান খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বেশি। এঁদের খাওয়াদাওয়াতেও তার কিছু কিছু প্রভাব রয়েছে।
ডাক রোস্ট : বড়দিনে যেমন অনেক জায়গায় রোস্টেড টার্কি খাওয়ার চল আছে, তেমনই কেরলের সিরিয়ান খ্রিস্টান পরিবারে খাওয়া হয় রোস্ট করা হাঁসের মাংস। একে ম্যাপাসও বলা হয়।
প্লাম কেক: ব্রিটিশ শাসিত ভারতে প্লাম কেক বানানো শুরু হয় কেরলেই। ১৮৮৩ সালে এক ব্রিটিশ সাহেবের আনা প্লাম কেকের নমুনা দেখে কেরলের নিজস্ব প্লাম তৈরি করেন মাম্বালি বাপু নামে কেরলের এক কেক প্রস্তুতকারী। তবে বিদেশি কেকের স্বাদ আনতে তিনি নিজের মতো কিছু উপকরণ মেশান। যার মধ্যে অন্যতম আপেল গেঁজিয়ে তৈরি করা রস, নানা ধরনের স্থানীয় মশলা এবং কাজু এবং রামে ভেজানো বাদাম ও ফলের টুকরো। সেই কেক গোটা ভারতে জনপ্রিয় হয়। আজও কেরলে বড়দিনে ওই বিশেষ ধরনের প্লাম কেক খাওয়া হয়।
আপ্পাম ও স্টু: চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি নরম ‘আপ্পাম’ এবং নারকেলের দুধ দিয়ে তৈরি মাংস এবং সবজির স্টু প্রাতরাশে না থাকলে কেরলের খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের বড়দিনের খাওয়া দাওয়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
মটন কাটলেট: পাঁঠার মাংসের কিমার সঙ্গে আলু সেদ্ধ এবং নানা রকমের মশলা মিশিয়ে তৈরি করা হয় প্যাটি। তার পরে তা ব্যাটারে ডুবিয়ে ভেজে নিলেই তৈরি মুচমুচে কাটলেট। বড়দিনে এই কাটলেট পরিবেশন করা হয় আদা চায়ের সঙ্গে।
রোজ় কুকি: চালের গুঁড়ো, নারকেলের দুধ, ডিম, চিনি, তিল দিয়ে তৈরি ডুবো তেলে ভাজা কুকি। দেখতে ফুলের মতো। তাই একে বলা হয় রোজ় কুকি। দক্ষিণ ভারতে এই রোজ কুকি ছাড়া বড়দিন উদযাপন অসম্পূর্ণ।
৪. উত্তর-পূর্ব ভারত
উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ সংখ্যায় বেশি। সেখানে বড়দিনও পালিত হয় বড় করে। তবে খাবারে মাংসের প্রাধান্যই থাকে বেশি।
স্মোকড পর্ক : নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ে ব্যাম্বু শুট দিয়ে তৈরি স্মোকড পর্ক খাওয়া হয় বড়দিনে।
পুমালোই: মেঘালয়ের খাসি সম্প্রদায়ের মানুষ বড়দিনে এক ধরনের চালের পিঠে বানান, যা খাওয়া হয় ঝাল ঝাল মাংসের সঙ্গে। মেঘালয়ের ওই এলাকায় বড়দিনের খানাপিনায় এই পদটি থাকেই।
এ ছাড়া আরও বেশ কিছু রাজ্যের বড়দিনের বিশেষ কিছু খাবার জনপ্রিয়—
মহারাষ্ট্র
মারাঠি খ্রিস্টান পরিবারে গুয়াভা চিজ বা 'পেরাদ' নামের এক ধরনের মিষ্টি বানানো হয় বড়দিনের সময়। নামে চিজ় হলেও এতে দুধের চিহ্ন মাত্র নেই। পেয়ারার শাঁসকে চিনি, লেবুর রস এবং সামান্য মাখন দিয়ে রান্না করে বানানো হয় এক ধরনের টকমিষ্টি জেলির মতো খাবার।
উত্তর প্রদেশ
একদা এলাহাবাদ এবং অধুনা প্রয়াগরাজ শহরের এলাহাবাদী কেক উত্তরপ্রদেশে তো বটেই গোটা দেশেই খাদ্যপ্রেমীদের কাছে চেনা নাম। ঘি, পেঠা বা মোরব্বা এবং সুগন্ধি মশলা ব্যবহার করে তৈরি ওই কেক বড়দিন উপলক্ষেও খাওয়া হয়।
অন্ধ্রপ্রদেশ
গোঙ্গুরা মটন। পাঁঠার মাংসের সঙ্গে টক স্বাদের গোঙ্গুরা পাতা (যা আমরুল পাতার একটি প্রজাতি) মিশিয়ে এই রান্না করা হয়। বড়দিনে অন্ধ্রের বিভিন্ন ভোজে এই গোঙ্গুরা মটন এবং মশলাদার বিরিয়ানি খাওয়া হয়ে থাকে। ।