ছবি:জয়দীপ মণ্ডল।
তিনি লিখেছিলেন যুদ্ধের কথা। নির্বাসনের কথা। ভয়ের মধ্যে বড় হয়ে ওঠার কথা। ধর্মীয় গোঁড়ামি, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, দেশছাড়া হওয়ার বেদনা— সব কিছু নিয়ে কলম ধরেছিলেন তিনি। তাঁর আঁকা সাদা-কালো ছবিগুলো স্বাধীনতার ভাষা হয়ে উঠেছিল বহু মানুষের কাছে। সেই মানুষটির নাম মারজান সাত্রাপি। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি লড়াই করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে প্রতিপক্ষের কাছে তিনি পরাজিত হলেন, তার কোনও মুখ নেই, কোনও পতাকা নেই, কোনও রাষ্ট্র নেই। তার নাম শোক।
ফরাসি-ইরানি লেখিকা, চিত্রশিল্পী ও চলচ্চিত্রকার মারজানের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার জানিয়েছে, তিনি ‘দুঃখেই মারা গিয়েছেন’। বয়স হয়েছিল ৫৬। স্বামী ও দীর্ঘ দিনের সঙ্গী ম্যাটিয়াস রিপার মৃত্যুর মাত্র ১৪ মাস পর তাঁরও জীবনাবসান। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পারিবারিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ম্যাটিয়াসের মৃত্যুর পর থেকে মারজান আর আগের মতো ছিলেন না।
‘দুঃখে মারা যাওয়া’— শুনলে মনে হতে পারে যেন কোনও উপন্যাসের লাইন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এর বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। প্রবল মানসিক আঘাতে দেহে এত বেশি পরিমাণ স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হতে পারে যে হৃদ্যন্ত্র সাময়িক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
মনোরোগ চিকিৎসক অনিরুদ্ধ দেব জানাচ্ছেন, প্রিয়জনের মৃত্যুর পরে প্রথমেই শক, তার পরে গভীর দুঃখ, অবিশ্বাস, রাগের মতো অনুভূতি ধাপে ধাপে আসে। যাঁরা চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের উপরে রাগ, যিনি চলে গেলেন তাঁর উপরে রাগ-অভিমান। এই সব পর্ব পেরিয়ে তবে আসে বিষয়টি মেনে নেওয়ার পরিস্থিতি। তবে তা যে এমন সরলরৈখিক পথেই সব সময়ে হবে, তা নয়। মেনে নেওয়ার পর্ব এক এক জনের ক্ষেত্রে এক এক রকম।
ছবি:জয়দীপ মণ্ডল।
অনেকের ক্ষেত্রে এই অনুভূতি এত তীব্র হয় যে তার জেরে তৈরি হয় উদ্বেগ, অবসাদ। কাজে অনীহা বা কাজ করতে অপারগতা দেখা যায়। অনিরুদ্ধ বলেন, “যে কোনও রকমের উদ্বেগ স্নায়ুতন্ত্রের উপরে ভীষণ প্রভাব ফেলে। দেহে স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়। শোকের সময়ে একটানা বেড়েই থাকে এই হরমোন। শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয় এর জন্য। সরাসরি প্রভাব পড়ে হৃদ্যন্ত্রের উপরে। প্যালপিটেশন হতে থাকে। এই হরমোনই আবার বাড়িয়ে দেয় ব্যথা-বেদনার অনুভূতি।” এর জেরে মাথা ব্যথা, ক্লান্তি বেড়ে যায়। অনিরুদ্ধ জানাচ্ছেন, শোক মানুষের খিদে নষ্ট করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে, রক্তচাপ বাড়ায়, বাড়িয়ে তোলে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া।
এমন অবস্থায় এই সব সমস্যার জন্য চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না বেশির ভাগ মানুষই। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না হলে শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতির আশঙ্কা থাকে। অতি দুঃখে কেউ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন, দেখা যায় এমনটাও। আবার সরাসরি না হলেও, শারীরিক সমস্যাকে অবহেলা, নিজের যত্ন না নেওয়া, খাওয়াদাওয়া ঠিক মতো না করা বা সব কাজকর্ম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে পরোক্ষে সেই পথই বেছে নেন অনেকে।
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, প্রিয় মানুষের উপস্থিতি জীবনে কী ভাবে নোঙরের মতো কাজ করে, তা অনেক সময়ে বোঝা যায় না, যতক্ষণ না সেই মানুষটি চলে যান। তখন শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যান না। হারিয়ে যায় একটি অভ্যাস, একটি দৈনন্দিন যাপন, একটি ভবিষ্যৎ, কখনও কখনও নিজের পরিচয়েরও একটি অংশ।
কী ভাবে বাঁচে মানুষ এই শূন্যতা নিয়ে? মানুষ কি শোক ভুলে যায়? নাকি কাটিয়ে ওঠে? অথবা শোককে সঙ্গী করেই বাঁচতে শেখে?
মনোরোগ চিকিৎসক জয়রঞ্জন রাম বললেন, “যিনি চলে গেলেন, তাঁর সঙ্গে যতটা বেশি জড়িত ছিলেন কেউ, শোকের মাত্রা ততটাই বেশি হবে। এ সব ক্ষেত্রে জীবনের ছন্দটাই যেন ভেঙে যায়। মৃতের সূত্রে যে পরিচয় ছিল কারও, সেই পরিচয়ই মুখ্য হয়ে ওঠে। বাকি সব পরিচয় মূল্যহীন হয়ে ওঠে। সেই প্রিয়জনের অনুপস্থিতির শূন্যতা খুব গভীর ভাবে অনুভূত হয়। বাস্তব জীবন থেকে দূরে নিয়ে যায় এমন অভিঘাত।”
ছবি:জয়দীপ মণ্ডল।
তিনি জানাচ্ছেন, শোক সম্পূর্ণ ভোলা যায় না। মৃত্যুর পরে নানা সামাজিক-ধর্মীয় প্রথার মাধ্যমে, স্মৃতিচারণের মাধ্যমে তার কিছুটা উপশম ঘটে, ভাগ হয়। সময়ের সঙ্গে শোকের তীব্রতা কমতে পারে। অবসাদে যদি জীবনের অর্থই হারিয়ে যেতে থাকে, সে ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, যিনি চলে গিয়েছেন, তিনি কখনওই চাইবেন না যে তাঁর জন্য কেউ এতটা কষ্ট পাক। তবে, মন খারাপের অনুভূতি চেপে রাখার প্রয়োজন নেই, জানাচ্ছেন জয়রঞ্জন। তার সঙ্গেই স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা দরকার। সময় ধরে খাবার খাওয়া, ওষুধ খাওয়া, ঘুমকে যেন অবহেলা না করা হয়।
আবার শোকের যে প্রথাগত ছবি সামাজিক ভাবে গ্রহণযোগ্য, তাতে শোকগ্রস্ত ব্যক্তি এলোমেলো হয়ে যাবেন, নিজের ভাল থাকার দিকে তাঁর খেয়াল থাকবে না, এমনটাই ভাবেন অনেকে। তার অন্যথা হলে অনেক সময়ে ধেয়ে আসতে পারে তির্যক মন্তব্যও। এ প্রসঙ্গে জয়রঞ্জন বলছেন, “শোক একান্তই ব্যক্তিগত। কী ভাবে তার প্রকাশ ঘটছে, তা নিয়ে সমালোচনা করা উচিত নয় একেবারেই।”
চিকিৎসকেরা বলছেন, এই সময়ে আশপাশের মানুষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ‘এত দিনেও ভুলতে পারলে না?’, ‘এখনও কাঁদছ?’— এমন মন্তব্য অনেক সময়ে মানুষকে আরও গুটিয়ে দেয়। বরং খোলাখুলি কথা বলা, অনুভূতির জায়গাটিকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং শোকার্ত মানুষটির প্রয়োজনে পাশে থাকা— এটাই সবচেয়ে বড় সহায়তা হতে পারে। কারণ, কত দিনে কেউ শোক কাটিয়ে উঠতে পারবেন, তার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না। সম্পর্কের গভীরতা, প্রতিটি মানুষের মানসিক গঠনের উপরে তা নির্ভর করে।
অনিরুদ্ধ দেবের কথায়, “হারানোর এই দুঃখ মেনে নিয়ে বাঁচতে শেখাই জরুরি। প্রিয় মানুষটিকে মনে রেখেই সেবামূলক কাজ, নতুন কোনও কাজে নিজেকে যুক্ত করা, সেই মানুষটির প্রিয় কিছু করা বা নিজের অন্যান্য দায়িত্ব পালনের মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে পান অনেকে।”
তবে দীর্ঘ দিন ধরে অবসাদের তীব্রতা না কমলে, জীবনের প্রতি আগ্রহ কমে গেলে সে ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি। এই সাহায্য চাওয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং নিজেকে ভাল রাখার সচেতন চেষ্টা।
যুদ্ধের কথা, নির্বাসনের কথা লিখেছিলেন মারজান। তাঁর জীবনাবসান মনে করিয়ে দেয় আর এক ধরনের যুদ্ধের কথা। শোকের মধ্যেও রোজ ঘুম থেকে ওঠা, প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতি মেনে নেওয়া, নিজের কাজ করে যাওয়া, আবার কোনও এক দিন হাসতে পারা— এই ছোট ছোট ঘটনার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মানুষের সবচেয়ে বড় জয়।
মডেল: ভারতী লাহা;
ছবি:জয়দীপ মণ্ডল
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে