—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
গত বছর জুনে মধুচন্দ্রিমায় গিয়ে সোনম রাজবংশী ও তাঁর প্রেমিকের ষড়যন্ত্রে খুন হন রাজা রঘুবংশী। সোনমের অন্য সম্পর্কের কথা জানত তাঁর পরিবার। চলতি বছরের জুনে প্রায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সিয়া গয়াল তাঁর প্রেমিক চেতন চৌধুরীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে হবু স্বামী কেতন আগরওয়ালকে খুন করেন। প্রেমের সম্পর্কের এমন নৃশংস পরিণতির খবর উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, বিচ্ছেদ বা আইনি পদক্ষেপের বদলে প্রতিহিংসার পথ কেন বেছে নিতে হচ্ছে?
—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
বহুগামিতা নতুন নয়। সমাজ-সংসারের সূচনালগ্ন থেকেই তা রয়েছে। পুরাণ থেকে মহাকাব্য— সর্বত্র তার উপস্থিতি স্পষ্ট। কখনও সঙ্গীর অন্য সম্পর্কের কথা জেনেও কেউ একসঙ্গে থেকে গিয়েছেন, কখনও আবার আড়ালে সমান্তরাল সম্পর্ক চলেছে। প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের কারণে বিচ্ছেদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।
মূলত জেন জ়ি এবং লেট মিলেনিয়াল প্রজন্ম এখন সম্পর্কে বা দাম্পত্যে জড়াচ্ছে। তাঁরা স্বাধীনচেতা, শিক্ষিত। আর্থিক ভাবে অধিকাংশই স্বনির্ভর। সে ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হলে পারস্পরিক আলোচনা বা বিচ্ছেদের পথে না হেঁটে সঙ্গীকে প্রতারণা কিংবা খুনের মতো চরম পথ কেন বেছে নিচ্ছেন তাঁরা? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মূল কারণ আধুনিক প্রজন্মের মধ্যে ধৈর্য কম, বাড়ছে আত্মকেন্দ্রিকতা, হিংস্রতা।
ভালবাসা কারে কয়...
সমাজতত্ত্ববিদ নন্দিনী ঘোষ বলছেন, “ভালবাসার সংজ্ঞা আমাদের সমাজে স্পষ্ট নয়। সিনেমা, সিরিজ় দেখে, বই পড়ে আধুনিক প্রজন্ম ভালবাসার যে অর্থ ধরে নিচ্ছে, তা বাস্তবের সঙ্গে সব সময়ে মেলে না। একাধিক সম্পর্ক, ওপেন রিলেশন, সিচুয়েশনশিপ নিয়ে আলোচনা বাড়লেও, সঙ্গে বাড়ছে স্বার্থপরতা। নিজের পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা কমছে।” এই প্রজন্মের মধ্যে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও কম। ফলে সম্পর্ক বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে।
কেন বাড়ছে এই ধরনের ঘটনা?
ডিজিটাল যুগ জীবনকে দ্রুততর করেছে। খাবার থেকে বিনোদন— মুহূর্তেই হাতের নাগালে হাজির। মনোবিদ আবীর মুখোপাধ্যায় বলছেন, “এই তাৎক্ষণিক তৃপ্তিলাভের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। একটা সম্পর্কে মতভেদ, ভুল বোঝাবুঝি হওয়া স্বাভাবিক। তা মেটানোর জন্য প্রয়োজন হয় সময়, ধৈর্য। সম্পর্ক বাঁচাতে বর্তমান প্রজন্ম সময় দিতে আগ্রহী নয়। তার বদলে নতুন সম্পর্কের দিকে ঝুঁকছে।”
—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
প্রেমে পড়া বারণ
আধুনিক প্রজন্মের এই মানসিকতার দায় কিছুটা অভিভাবকদেরও। সংসার ও কেরিয়ারের চাপে ব্যস্ত অধিকাংশ মা-বাবাই আজকাল সময় দিতে না পারায় সন্তান যখন যা চাইছে, তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ডা. মুখোপাধ্যায় বলছেন, “এর ফলে এখনকার প্রজন্মের কাছে নিজেদের মতই একমাত্র বিবেচ্য। ফলে বাবা-মায়েরা যখন বিয়ে বা সম্পর্কের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করছেন, তা মেনে নিতে পারছে না।” আজও পারিবারিক সম্মানের দোহাই দিয়ে সন্তানকে জোর করে নিজেদের পছন্দের সম্পর্কে বেঁধে দেয় বহু পরিবার। সেখান থেকে মনের মধ্যে তৈরি হয় ক্ষোভ, প্রতিশোধস্পৃহা। রাগ যে সব সময় সঙ্গীর প্রতি থাকে, এমন নয়। বরং অনেক সময়েই পরিস্থিতি, মা-বাবার উপরে অভিমান থেকেই এমন চরম পদক্ষেপ করে থাকেন কেউ কেউ। আবীরের কথায়, “এখনকার প্রজন্মের মধ্যে এমনিতেই শর্টকাট বেছে নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। তাঁরা ফলাফল না ভেবেই কাজ করে। প্রতিকূল পরিস্থিতি সেই প্রবণতাকে উসকে দেয়।”
—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
সমাধানের পথ
এ ক্ষেত্রে একপক্ষকে দোষী সাব্যস্ত করে দেওয়া হয়। রিলেশনশিপ কাউন্সেলর দেবলীনা ঘোষ বলছেন, “অধিকাংশ সময়েই দায় কিন্তু দু’পক্ষের থাকে। সম্পর্কে সঙ্গীর উৎসাহ না থাকার আভাস আগেই মেলে, যা নানা কারণে এড়িয়ে যায় অপর পক্ষ।” সম্পর্ককে যত্ন করতে হয়। শুরুতেই প্রত্যাশা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সীমারেখা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। অন্য সম্পর্ক থাকলে তা নিয়েও স্পষ্ট কথা বলে নেওয়া ভাল। বিয়ের কথাবার্তা শুরুর সময়েই তাঁরা নিজেরা সেই সম্পর্কের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত কি না, বুঝে নিতে হবে। সম্বন্ধ করে বিয়ে ঠিক হলে সঙ্গীর সঙ্গে একান্তে কথা বলা প্রয়োজন। হবু জীবনসঙ্গী কোনও ভয় বা পারিবারিক চাপ থেকে বিয়েতে রাজি হচ্ছে কি না, তা বুঝে নেওয়া দরকার। সঙ্গীর মধ্যে অস্থিরতা, সম্পর্ক নিয়ে দায়সারা ভাব দেখলে সাবধান হোন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। টক্সিসিটি বাড়লে সামাজিক বদনামের আশঙ্কা, একাকিত্বের ভয় ভুলে সম্পর্কথেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মনোবিদের সাহায্য নিন।
—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
ভালবাসা বা সম্পর্ক কেবল আবেগ নয়, দায়িত্বও। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে যেমন সাহস লাগে, তেমনই প্রয়োজন হলে সৎ ভাবে সম্পর্ক থেকে বেরিয়েও আসতে হবে। যে কোনও পরিস্থিতিতেই হিংসা, খুন, প্রতিশোধ কাম্য নয়।
যে ক্ষেত্রে এগোবেন না
গোপন করার প্রবণতা,
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অনীহা,
সন্দেহপ্রবণতা ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা,
অকারণ অপমানের প্রবণতা, ব্ল্যাকমেলিংয়ের প্রবণতা থাকলে,
অর্থ বা সম্পত্তিতে অতিরিক্ত আগ্রহ থাকলে
মডেল: অলকানন্দা গুহ, ঋষভ চক্রবর্তী,
মেকআপ: দীপক শাহ,
স্টাইলিং: প্রলয় দাশগুপ্ত,
লোকেশন ও হসপিটালিটি: এনএক্স এলিট, বাইপাস,
ছবি: সায়ন্তন দত্ত, সর্বজিৎ সেন (সঞ্চারী মণ্ডল, ঋতজিৎ চট্টোপাধ্যায়)
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে