‘ক্লে ওয়ার্কস: আর্থেন স্কাল্পচার ইন সাউথ এশিয়া’ বইপ্রকাশ করলেন লেখিকা সুজ়ান সি বিন। কলকাতার সিমা গ্যালারিতে আয়োজিত হল সেই অনুষ্ঠান। গ্রাফিক— আনন্দবাজার ডট কম।
মাটি নিয়ে খেলতে খেলতেই ছোটরা তৈরি করে ফেলে নানা জিনিস, তাদের কল্পনা রূপ পায় বাস্তবের খেলনায়। আবার এই মাটির নিখুঁত প্রলেপেই তৈরি হয় প্রতিমা। তৈরি হয় মানুষের নিখুঁত অবয়ব। কাঁচা মাটিকে শুকিয়ে (না পুড়িয়ে) তৈরি হওয়া এই শিল্পকর্ম টেরাক্রুডার, ইতিহাস কম পুরনো নয়।
সেই ইতিহাস, শিকড়কে খোঁজার চেষ্টা করলেন আমেরিকান শিল্প-ইতিহাসবিদ, কিউরেটর এবং গবেষক সুজ়ান এস বিন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিমা গ্যালারিতে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশিত হল তাঁর বই ‘ক্লে ওয়ার্কস: আর্থেন স্কাল্পচার ইন সাউথ এশিয়া’।
মিউজ়িয়ামের কিউরটের, তাই নানা দেশের প্রত্নসামগ্রী চাক্ষুষ করার এবং তা নিয়ে কাজের সুযোগ ছিল। মিউজ়িয়ামে কার্যত অযত্নে, অলক্ষে পড়ে থাকা তিন মূর্তি তাঁর ভাবনা বদলে দেয়। তৈরি হয় টেরাক্রুডা নিয়ে আগ্রহ। সুজ়ান বলছিলেন, তাঁর দেশের মিউজ়িয়ামে পুরনো তিনটি মূর্তি খুঁজে পাওয়ার কথা। সেগুলি মেঝেতে রাখা হয়েছিল। শুধু বুকের উপর কাগজে লেখা ছিল নাম। ভাল ভাবে লক্ষ করতে গিয়ে দেখলেন, ভিতরে রয়েছে খড়। এই মূর্তি তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে আগ্রহ থেকেই ধীরে ধীরে এমন মৃৎশিল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার তাগিদ তৈরি হয়। তার পরে তাঁর ভারতে আসা, পরিচয় টেরাক্রুডার সঙ্গে। চাকরিজীবনে বিস্তারিত জানার বা গবেষণার সুযোগ ছিল না। তাই অবসর পরবর্তী জীবন বেছে নিলেন এই কাজের জন্য। দেখলেন, হিমাচল প্রদেশের টাবোর বৌদ্ধ স্তূপ, কুমোরটুলির শিল্পকর্ম, কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল-সহ ভুটান এবং নানা দেশের মৃৎশিল্প। কাছ থেকে দেখলেন, ভারতের গণেশপুজো, দুর্গাপুজো। দেখলেন, মৃৎশিল্পীদের সুনিপুণ কারিগরিতে কী ভাবে প্রাণ পায় প্রতিমা।
টেরাক্রুডা হল মাটির শিল্পকর্ম। তবে তা পুড়িয়ে শক্ত করা হয় না। বরং মাটি দিয়ে তৈরি প্রতিমা বা মডেল রোদে শুকিয়ে তার উপরে রং চাপানো হয়। এক সময় বঙ্গ বা দক্ষিণ এশিয়ার টেরাক্রুডার নিদর্শনকে শিল্পের তকমা দিতে চায়নি বিশ্বের বহু দেশই। কিন্তু আদতে যে মাটির তৈরি এই কাজ এক উচ্চমানের শিল্প, সেই স্বীকৃতি এসেছে পরবর্তী সময়ে।
সিমা গ্যালারিতে বই সম্পর্কিত আলোচনার সূত্রধার ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপিকা, গবেষক ঋতুপর্ণা বসু। তাঁরই সঙ্গে প্রশ্নোত্তরে উঠে আসে মাটি এবং শিল্পের নানা দিক। মাটির বিশেষত্বই হল যে, তা পরিবেশবান্ধব। মাটির তালে জল মিশিয়ে নরম করে, সেটিকে বেঁকিয়ে, পেঁচিয়ে যেমন ইচ্ছা রূপ দেওয়া যায়। শিল্পীর মনের মাধুরী যুক্ত হয়ে তৈরি হয় নিপুণ শিল্পকর্ম। আবার খুব সহজে সেই শিল্পকর্ম পরিবেশে বিলীনও হয়ে যায়। আবার তৈরি হয় নতুন শিল্প, নতুন সৃষ্টি।
সিমা গ্যালারিতে বই সম্পর্কিত আলোচনার সূত্রধার ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপিকা, গবেষক ঋতুপর্ণা বসু। তাঁরই সঙ্গে (ডান দিকে) আমেরিকান শিল্প-ইতিহাসবিদ, কিউরেটর এবং গবেষক সুজ়ান এস বিন। —নিজস্ব চিত্র।
টেরাক্রুডার শিল্প যেন মানবদেহের মতোই। মানুষের দেহ যেমন হাড়, শিরা, উপশিরা, মেরুদণ্ড, মাংসপেশি, চামড়া দিয়ে তৈরি, কোনও মডেল বা প্রতিমা তৈরিও তেমনটাই। বাঁশের কাঠামোয়, খড়-দড়ি পেঁচিয়ে তৈরি হয় মূল কাঠামো। তার উপরে মাটির প্রলেপ যেন ত্বক, সেই ত্বকে রং করা হয়।
হিমাচল প্রদেশ থেকে, কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণি হয়ে কলকাতার কুমোরটুলির মৃৎশিল্প অনুসন্ধানে সুজ়ানের যাত্রার প্রসঙ্গ উঠে আসে আলোচনায়। সুজ়ানের বইতে মাটি, শিল্পী এবং ক্রেতাদের দীর্ঘ দিনের সম্পর্কের কথা বিশদ আলোচিত হয়েছে।
টেরাক্রুডার সঙ্গে জড়িয়ে মানুষের রুজি-রোজগারও। প্রত্যেক বছর প্রতিমা তৈরি হয়, পুজো হয়, আবার সেই প্রতিমা বিসর্জনও হয়। ফলে আগামীর জন্য নতুন কাজের পরিসর তৈরি হয়। সুজ়ান কাজের সূত্রে বঙ্গে এসেছেন একাধিক বার। সন্দেশ, মিষ্টি দইয়ের প্রেমেও পড়েছেন তিনি। শোনালেন তাঁর কুমোরটুলির অভিজ্ঞতার কথাও। সুজ়ানের কথায়, ‘‘বছর কয়েক আগে কুমোরটুলি আসি। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখছিলাম। তখন অম্পূর্ণ একটি মাটির মূর্তি দেখে থমকে যাই। দেখে মনে হয়েছিল বঙ্গের মোনালিসা। সেটি ছিল সরস্বতীর মূর্তি।’’ সেই দেখার চোখের সন্ধান এ বইয়ের পাতায় পাতায়।