বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়ার মুড়ির মেলার ছবি: অভিজিৎ সিংহ
অনেক বাংলা শব্দে রাজনীতির ছায়া পড়েছে। মেলাতেও। এখনকার বাচ্চাদের মেলার সঙ্গে প্রথম মোলাকাত রাজনৈতিক আয়োজনেই হতে পারে। সময়ের ধারা। আর একটু পিছনে গেলে ধারাটি অন্য খাতে বয়। মেলা তখন ধর্মীয় অনুষঙ্গের হাত ধরে আসে। চড়কের মেলা, দোলের মেলা, পাড়ার কালীপুজোর মেলা। সাহিত্য-মেলার সঙ্গে পরিচয়ও সে ভাবেই। সেই যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’র ‘সুখ দুঃখ’— ‘বসেছে আজ রথের তলায় স্নানযাত্রার মেলা…’। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাধারাণী’ও মাহেশের রথের মেলায় গিয়েছিল।
মেলার মজাটা এখানেই। ‘বকুলতলায় ভিড়’ জমজমাট। কেউ রকমারি মাটির পুতুলের সন্ধানে। নাগরদোলার বনবনানিতে সুখী কেউ। কারও ভাল লাগে ঝুঁকির ক্রীড়া। তাই তাদের মরণকুয়োর দিকে উঁকি। ভিড়ের নানা পছন্দ। মেলারও নানা পরিচয়। যেমন গ্রামীণ মেলা। এই মেলাগুলো আসলে এক একটা সংরক্ষণ কেন্দ্র। বাঁচিয়ে রাখে অনেক কিছু। যা আসলে আমাদের বাংলার নিজস্ব। ধর্মীয় অনুষঙ্গ এই সব মেলার জিয়নকাঠি। এই জিয়নকাঠির ছোঁয়াতে আজও বেঁচে রয়েছে গ্রামীণ মেলাগুলি। শত শত বছর ধরে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অটল।
হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরের সিংটির ভাই খাঁ পিরের মেলার কথা ধরা যাক। মাঘ মাসের প্রথম দিন বসে। লোকমুখে আলুর দম আর কাঁকড়ার মেলা নামে পরিচিত। মেলায় গেলে দেখা যায়, মাঠকে মাঠ জুড়ে আলুর দম রান্না হচ্ছে। লোকে কিনছেন আর দেশি ধানের মোটা শক্ত সুস্বাদু মুড়ি দিয়ে মেখে মাঠেই বসে খাচ্ছেন। মেলায় আলুর দম বিক্রি হয় কিলো দরে। আর সামুদ্রিক কাঁকড়া আসে সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা থেকে। বাঘা থেকে বিড়াল নানা মাপের কাঁকড়া। আলুর দম আর কাঁকড়া বিক্রি মেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মেলায় ঘুরলে মিলবে চাষের ও গৃহস্থালির নানা উপকরণ বঁটি, কাটারি, কোদাল, ধামা, কুলো, ধুচনি। আর মেলে মাটির পুতুল। সিংটির কুমোরপাড়ায় তৈরি হয় এক ধরনের কালো পুতুল। রং করা নয়, বিশেষ পদ্ধতিতে পোড়ানো। মেলার মাঠে সে সবের পসরা নিয়ে বসেন কুমোর মেয়ে-বউরা। এ মেলায় শুঁটকি মাছের পসরার পাশে বিক্রি হয় বাচ্চাদের খেলনা।
হুগলি জেলার জাঙ্গিপাড়া এলাকার জাঁদার ঘাটে মকর সংক্রান্তিতে মেলা বসে। জাঁদার মেলাতেও আলুর দম বিক্রি হয় কিলো দরে। উদয়নারায়ণপুরে বকপোতা সেতুর কাছে দামোদরের চরে মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাপুজো উপলক্ষে মেলা হয়। এখানেও মাটির ও বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি হয়।
গ্রামীণ মেলাগুলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন। আর্থ-সামাজিক দিক থেকেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই মেলাতে এমন কিছু বিক্রি হয় যে সবের ব্যবহার কমেছে। বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রের ব্যবহার রান্নাঘরে কমেছে বহু দিন ধরেই। কিন্তু যে সব অঞ্চলের রান্নাঘরে পরিবর্তনের ছোঁয়া তেমন স্পর্শ করেনি, সেখানে স্বাভাবিক ভাবেই কাজে লাগে এ সব। যাঁরা এখনও চুপড়ি, ধামা, কুলো ইত্যাদি তৈরি করেন, তাঁরাও পসরা নিয়ে হাজির হন মেলায়। বহু জায়গার লোক আসেন মেলায়। বিক্রি করতে সুবিধা হয়। কিছুটা পয়সা আসে ঘরে। না হলে সারা বছর ধরে নিজের এলাকায় ক’টাই বা বিক্রি করতে পারতেন এ সব হাতের কাজ! আলুর দমের মেলাগুলোয় একদিনে যে পরিমাণ আলু বিক্রি হয়, তা দিনকয়েক ধরেও বিক্রি করা কষ্টকর। এই দুই মেলা যে জায়গার, সেখানে আলুর বিপুল ফলন। মেলায় একলপ্তে অনেকটা বিক্রি হয়ে যায়। মেলা স্থানীয় অর্থনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তার প্রমাণ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাধারাণী’ই। আর্থিক বিপর্যয়ে পড়া ‘রাধারাণী’ বনফুল তুলে মালা গেঁথে নিয়ে গিয়েছিল মাহেশের রথে। বিক্রির অর্থে মায়ের পথ্য কিনবে ভেবেছিল।
গ্রামীণ এই মেলাগুলোর আর একটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। মেলা বলতে আমরা নাগরিক মন দিয়ে স্টলের কল্পনা করি। এই সব মেলায় স্টলের কোনও ব্যাপার থাকে না। ফসল তুলে নেওয়া চাষের জমি। তাতেই একটা চাদর, প্লাস্টিক পেতে পসরা সাজিয়ে বসা। নয়তো মাটিতেই। ঢেলে বিক্রি বলতে যা বোঝায় সেটাই।
কিছু মেলা কোনও একটা বিষয়ে স্বতন্ত্র। সেটাই তার পরিচিতি। বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়ার মুড়ির মেলা বা ঝাড়গ্রামের বিনপুরের হাড়দা গ্রামে জিলিপির মেলা। কেঞ্জাকুড়ার মুড়ির মেলা বসে দ্বারকেশ্বর নদের চরে। এখানে সঞ্জীবনী মাতার মন্দির রয়েছে। মন্দিরে মকর সংক্রান্তিতে সংকীর্তন শুরু হয়। শেষ হয়, ৪ মাঘ। প্রচলিত মত হল, দূরদূরান্তের লোকজন আসতেন সংকীর্তন শুনতে। কিন্তু কীর্তন শেষ হতে সন্ধে হয়ে যেত। তখন এলাকা ছিল জঙ্গুলে। ফলে রাতে বাড়ি ফেরার ভরসা করতেন না অনেকেই। ভক্তেরা বাড়ি ফিরতেন পরদিন সকালে। বাড়ির পথে রওনা দেওয়ার আগে কিছু খাওয়া দরকার। ভক্তেরা সঙ্গে আনা মুড়ি দ্বারকেশ্বর নদের জলে ভিজিয়ে খেয়ে হাঁটা শুরু করতেন। শতাব্দীপ্রাচীন সেই রীতি মেনে চলা হয় এখনও। প্রতি বছর ৪ মাঘ লোকজন দ্বারকেশ্বরের চরে আসেন মুড়ি নিয়ে। সময় বদলেছে। নদের জলে ভিজিয়ে এখন আর মুড়ি খাওয়া হয় না। তেলেভাজার নানা উপকরণে উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
বিনপুরের হাড়দা গ্রামে জিলিপির মেলা হয় কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সময়ে। পাঁচ দিন ধরে চলে। কয়েক কুইন্টাল জিলিপি বিক্রি হয়। এই মেলার দুটো বৈশিষ্ট্য। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো হলেও সরস্বতীও একই সঙ্গে পুজো পান। আর মেলায় জিলিপি বিক্রি হয় কেন্দ্রীয় ভাবে। মানে প্রচুর দোকান থাকে না। নিলামে একজনই পুরো মেলার জিলিপি বিক্রির বরাত পান। জিলিপি হয় বিরির ডালের।
হুগলির দেবানন্দপুরের কৃষ্ণপুরে হয় মাছের মেলা। নানা রকম, নানা আকারের মাছের পসরা বসে। গৃহস্থালির জিনিসপত্রও বিক্রি হয়। কিন্তু মেলার পরিচিতি মাছময়। মেলা শুরুর জনশ্রুতিতে ধর্মীয় অনুষঙ্গ রয়েছে। সেই বিশ্বাসের পাশাপাশি সরস্বতী নদী কি মাছের মেলা শুরুর সহায়ক হতে পারে? এলাকাটি সরস্বতী নদীর তীরে। সরস্বতী একসময়ে ছিল বাংলার জনপ্রিয় বাণিজ্যপথ। সপ্তগ্রাম ছিল অন্যতম বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র। দেবানন্দপুর সপ্তগ্রামের সাত গাঁয়ের অন্যতম। নদী মানেই তো মাছ!
পূর্ব বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলীর দোগাছিয়া গ্রামের দোলমেলাও অন্য নাম পেয়ে গিয়েছে। একদা জমিদার রায়চৌধুরীদের পারিবারিক মেলা এখন সর্বজনীন রূপ পেয়েছে। এই মেলায় পেল্লায় আকারের মিষ্টি বিক্রি হয়। দাম হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। মিষ্টির জন্যই দোগাছিয়ার দোলমেলাকে অনেকে মিষ্টির মেলা বলেন। বীরভূমের মহম্মদবাজারের রায়পুর গ্রামে হয় হাঁড়ি-মালসার মেলা। শিবরাত্রিতে শুরু হয়। চলে এক সপ্তাহ। এই মেলা এলাকার সবচেয়ে বড় মেলা। অতি প্রাচীন। সেটা বিক্রির ঐতিহ্যই প্রমাণ করে প্রতি শিবরাত্রিতে।
কিছু মেলাকে ইতিহাসের ভাগে ফেলা যায়। ইতিহাস বললে প্রথমে রাজরাজড়াদের কথাই মনে হয়। বহু মেলার ইতিহাসে রাজন্যবর্গের যোগ রয়েছে। আবার বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের যোগেও অনেক মেলা রয়েছে। কোচবিহারে মদনমোহন মন্দিরকে কেন্দ্র করে হয় রাসমেলা। ১৮৯০ সালে মদনমোহন মন্দির তৈরির পরে কোচবিহার রাজপরিবারের মেলা শুরু হয়েছিল। এই মেলাও সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন। মদনমোহনের রাসমেলায় রাসচক্র তৈরি করেন মুসলিম পরিবারের সদস্যরা। বংশ পরম্পরায় তাঁরা এই কাজ করে আসছেন।
মালদহের রামকেলির মেলা ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়। শ্রীচৈতন্যদেবের আগমনের স্মৃতিতে এই মেলা শুরু হয়েছিল। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের সংক্রান্তিতে মেলা শুরু হয়। বিপুল ভক্তজন সমাগমে ভরে ওঠে মেলার বিস্তৃত প্রাঙ্গণ। কৃষ্ণনগরের বারোদোল মেলার সঙ্গেও রাজকাহিনির যোগ রয়েছে। কেউ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়কেই মেলার প্রবর্তক বলেন। এক রানির গোসা ভাঙাতে নাকি মেলা বসিয়েছিলেন তিনি। কারও মত, কৃষ্ণচন্দ্র নন, অন্য কোনও রাজা মেলা বসিয়েছিলেন। বারোটি বিগ্রহকে নিয়ে দোল। তাই এমন নাম। বারোদোলকে যে কোনও মেলার ভাগেই ফেলা যায়। এ মেলার সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতিও জড়িত। এখানেই বিক্রি হয় কৃষ্ণনগর তথা ঘূর্ণি গ্রামের মাটির পুতুল।
বাঙালির জীবনে প্রচুর ভাঙচুর হয়েছে। বদলে গিয়েছে অনেক কিছু। অনেক কারণে। মেলার শরীরেও সেই বদলের চিহ্ন। এখন হাজারো মেলা। সরকার পোষিত, নেতার মেলা, ক্লাবের মেলা, খাদ্যমেলা, বস্ত্রমেলা, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মেলা। এমনকি ফুলের মেলাও। পূর্ব মেদিনীপুরের ক্ষীরাইয়ের দোকান্ডায় প্রতি বছর শীতকালে ‘ফুলের মেলা’ বসে। এই এলাকায় প্রচুর ফুল চাষ হয়। ‘ফুলের উপত্যকা’ খেতাবধারী এলাকাটি দেখতে অসাধারণ। বহু পর্যটকের আগমনে তা মেলার চেহারা নেয়। সম্প্রতি খাবারের স্টলও দেওয়া হচ্ছে ফুলের মেলায়। পাশাপাশি রয়েছে পুরনো মেলাগুলোও। শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা বাঙালির গর্ব। রাজধানীর বইমেলা শুরু হলে লোকজনের কথা পাল্টায়। ‘কেমন আছ?’ বদলে যায় ‘বইমেলা গিয়েছিলে?’
গ্রামীণ মেলাগুলো ঐতিহ্য সংরক্ষণ কেন্দ্র ঠিকই। শহরের মেলাগুলোও কি এক প্রকার তাই নয়? সেখানেও বিক্রি হয় বর্ধমানের নতুনগ্রামের কাঠের পুতুল। নাগরিকের কাছে আসে গ্রামীণ গর্ব। প্রতি বছর পৌষপার্বণে বহু ঘরে অনিবার্য আক্ষেপ থাকে, পিঠেপুলির ঐতিহ্য বাঁচবে তো! জিজ্ঞাসা শুরুর পরে এই শীতেই এক দৃশ্যের সাক্ষী হতে হল, কলকাতার এক মেলায়। পিঠেপুলির স্টল থেকে এক কমবয়সি গৃহিণী বেশ খুশি মুখে পাটিসাপটা খাচ্ছিলেন। নিজে হয়তো বাড়িতে তৈরি করতে পারেন না। কিন্তু খেতে আগ্রহী। রসনার তৃপ্তি মেলায় মিটলে ক্ষতি কী!
ক্ষতি নেই। নেই বলেই আজও বকুলতলায় ভিড় জমে। শহরে কেউ পিঠেপুলিতে মজে। গ্রামে কেউ খুঁজে পেয়ে যায় একটুকরো শৈশব। একটা ট্যামটেমি, সেটা বাজাতে বাজাতে ফেরে ফেলে আসা আনন্দ দিনে। রবি-কবির সেই মেয়েটির মতো খুশিয়াল দিন— ‘এক পয়সায় কিনিছে ও তালপাতার এক বাঁশি’।
বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়ার মুড়ির মেলার ছবি: অভিজিৎ সিংহ
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে