Attar

নবাবিয়ানা থেকে বিলিতি ভেক! টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমে কি বদলের নিয়ম বদলে দিল আতর

দুনিয়া যখন অ দে কোলোন, অ দে তোলাত বা অ দে পারফিউমের নাম শোনেনি, যখন ঘড়ি ধরে দিনের বিভিন্ন সময়ের জন্য আলাদা আলাদা সুগন্ধি তৈরির কথা ভাবেনি কেউ, আতরের জন্ম তারও বহু বহু বছর আগে।

Advertisement

ঐন্দ্রিলা বসু সিংহ

শেষ আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ ০৮:৫৮
Share:

আতর—এ শব্দ শুনলে বাঙালিরা কী ভাবেন? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

পল কাটা স্ফটিকের বলের মতো ঢাকনা। স্বচ্ছ ডিম্বাকৃতি কাচের শিশিটিও বেশ বাহারি। নকশাদার। তার ভিতরে টল টল করছে লালচে সোনালি তরল। পানীয় নয়। স্ফটিকের বল খুলে মহম্মদ আলি ইমাম সেই তরল খানিকটা লাগিয়ে দিলেন কব্জির নীচে। পালস পয়েন্ট অর্থাৎ, যেখানে নাড়ির স্পন্দন দেখা হয়, ঠিক সেইখানে। বললেন, ‘‘এই বার গন্ধ নিয়ে দেখুন।’’ নির্দেশ পালন করতেই গ্রীষ্মের দুপুরে শীতল ভাব নামল শরীর জুড়ে। মিষ্টি সোঁদা মাটির গন্ধ। সঙ্গে অজানা ফুলেল সুবাস। ঝকঝকে শপিং মলে সুগন্ধির বিক্রেতা হয়তো বলতেন ‘আর্দি টপ নোট উইথ ফ্লোরাল মিড নোট।’ আলি ইমাম বললেন, ‘‘মিট্টি কা আতর!’’

Advertisement

আতর। এ শব্দ শুনলে বাঙালিরা কী ভাবেন? কলকাতার ‘আতর গলি’তে যাওয়ার আগে কৌতূহলবশত পরিচিতের মধ্যে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দেওয়ায় উত্তরের বদলে কিছু পাল্টা প্রশ্ন উড়ে এল। এক, ‘‘আতর এখনও ব্যবহার হয়?’’ দুই, ‘‘ইনস্টাগ্রামে দেখেছি, উত্তর কলকাতার দিকে পাওয়া যায় কি?’’ তিন, ‘‘গন্ধ একটু চড়া না?’’ চার, ‘‘আতর কি এখন ট্রেন্ডে?” পাঁচ, ভাল আতরের শুনেছি অনেক দাম, কিন্তু কেনে কারা?’’ ছয়, ‘‘আমজনতা এখন লাখখানেক টাকা দিয়েও বিদেশি পারফিউম কিনছে, সেখানে আতর কোথায়?’’

রুল টানা খাতার মতো ট্রামলাইন পাতা পিচের রাস্তা। সোজা হাঁটলে (লালবাজারের দিক থেকে) নাখোদা মসজিদ।

আতর কোথায়? তার উত্তর খুঁজতেই আসা চিৎপুর এলাকায়। রবীন্দ্রসরণিতে। রুল টানা খাতার মতো ট্রামলাইন পাতা পিচের রাস্তা। সোজা হাঁটলে (লালবাজারের দিক থেকে) নাখোদা মসজিদ। তার কিছু আগে ডান হাতের গলিতে সহজে-চোখে-না-পড়া এক দোকানঘরের দেওয়াল জুড়ে রাশি রাশি ছোট, বড়, মাঝারি মাপের বাহারি আতরদান। কোনওটির ঢাকনা স্ফটিকের গোলকের মতো, কোনওটি ডিম্বাকৃতি, চারকোনা, ছ’কোনা। যদিও দোকানে এসে দাঁড়ালেই তা চোখে পড়বে না। চোখে পড়ানোর জন্য সামনের শোকেসে যা সাজানো, সেগুলি হালের ‘মিনিমালিস্টিক’ ফ্যাশনের শিশি। গায়ে সাদা স্টিকারে লেখা বিখ্যাত সব বিদেশি পারফিউমের ব্র্যান্ডের নাম! কেলভিন ক্লেন, গুচি, প্রাডা, ফেরারি, ডায়র, শানাল, সি আর সেভেন, ওয়াইএসএল, ভিক্টোরিয়াজ় সিক্রেট— কী নেই সেখানে!

Advertisement

দক্ষিণ কলকাতার ঝকঝকে মলে এমন সব ব্র্যান্ডের নামী এবং দামি সুগন্ধি দেখতে অভ্যস্ত চোখ। ধাক্কা খেল কারণ, এখানে, যে বিপণিতে ‘শানাল নং ৫’, ‘ডায়র সভাঁজ’ কিংবা ‘ভিক্টোরিয়াজ় সিক্রেট-এর বম্বশেল’-এর দেখা মিলছে , সেই দোকানের নাম সাদা টিনের বোর্ডে রোদে ঝলসে যাওয়া নীল-লাল রঙে লেখা। ইলেকট্রিক তার আর গাছের ডালপালা পাতার ফাঁকে কোনওমতে পড়তে হয়— হাজি খুদা বক্স নবি বক্স।

বিদেশি নামের আতরের ‘হালাল পারফিউম স্প্রে’-ও তৈরি করে দেয়।

নামাঙ্কিত বোর্ড বলছে এ দোকান ১৮২৪ সালের। চাকচিক্য না থাকলেও প্রাচীনত্ব আছে। বক্সেরা কলকাতার সাত প্রজন্মের আতর কারবারি। তাদের নিজস্ব আতরিয়ত আছে। আর আছে ভাল আতরের, ঐতিহ্য। গত দু’শো বছরে এ শহরের বহু নামী আর মানী মানুষকে তারা আতরের নেশায় বুঁদ করতে পেরেছে। তালিকায় সুভাষচন্দ্র বসু থেকে শুরু করে কাজী নজরুল ইসলাম এমনকি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও আছেন। দোকানের বর্তমান কর্ণধার নেয়াজ় বক্স বললেন, “নেতাজি নিজে আতর কিনতে আসতেন এই দোকানে আর জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মতো কলকাতার বহু এলিট বাড়িতেও আমাদের আতর যেত।” তাহলে সেই আতরখান হঠাৎ আতর ছেড়ে বিদেশি পারফিউম বিক্রি করছে কেন? নেয়াজ় বললেন, “পারফিউম নয় তো, ওই সব সুগন্ধির কোনওটি আসল নয়। প্রত্যেকটিই বিদেশি সুগন্ধির আতর সংস্করণ। আসলের গন্ধের সঙ্গে ওগুলির ৯০-৯৯ শতাংশ পর্যন্ত মিল।’’

আতরের নিজের ভাণ্ডারে বাহারি সুগন্ধ কম নেই। তেমনই বাহারি তাদের নাম। শানায়া, জন্নত-এ-ফিরদৌস, মুখাল্লত, শমামা, তাজ, নূর, কায়ান, রূহ খস, রূহ গোলাপ, জন্নত উল মওয়ত, দেহন আল উদ, আজহার উদ জুলফিকর-এর নাম শুনলেই অর্ধেক বাদশাহী মেজাজ তৈরি হয়ে যায়। গন্ধও অনেক বেশি প্রাকৃতিক আর দীর্ঘস্থায়ী। এমন যার সম্পদ, তাকে বিলিতি ঋণ নিতে হবে কেন? অস্তিত্ব সংকটে পড়ে? অঙ্কটা ততটা সরলও নয়।

হাজি খুদা বক্স নবি বক্স।

কলকাতার আতর প্রেম শুরু ব্রিটিশ রাজত্বে। ১৮২৪ সালে নেয়াজ়ের পূর্বপুরুষ যখন কনৌজ থেকে দেশের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় এলেন, সেই সময়ে নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ লখনউ থেকে যথাসর্বস্ব নিয়ে এসেছেন এ শহরে। নবাব এর উপস্থিতির দৌলতেই একটু একটু করে এক মিশ্র সংস্কৃতি আকার নিতে শুরু করেছে শহরের বুকে। ধনী বংশীয়দের নবাবিয়ানায় অভ্যস্ত হচ্ছে শহর। তৈরি হচ্ছে ‘বাবু কালচার’। জনপ্রিয় হচ্ছে নবাবি সংস্কৃতির সুগন্ধি— আতরও। সেই সময়ে আতরের খোঁজে বক্সের দোকানে আসতেন কলকাতার বহু ধনী পরিবারের সন্তান। আসতেন সাহিত্যিক-নাট্যকারেরাও। এমন ইতিহাস যে অতরখানের, তাদের নিজ সংস্কৃতি আর নবাবী চলন ছেড়ে বিলিতি ভেক ধরতে হল এক অলিখিত বোঝা পড়ায়।

নাখোদা মসজিদ চত্বরে ওই এলাকায় পর পর আতরের দোকান (যে কারণে জায়গাটিকে অনেকে আতর পট্টি বা আতর গলি বলে চেনে)। সেখানে খোঁজ করতে দেখা গেল, একা নেয়াজ়ের দোকান নয়, সবকটি আতরের দোকানেই বিদেশি নামধারী আতরের রমরমা। ১৪০ বছরের পুরনো দোকান ‘তাজ মার্কা কাজল, সুরমা এবং আতরিয়ত’ আবার জানাল, তারা বিদেশি নামের আতরের ‘হালাল পারফিউম স্প্রে’-ও তৈরি করে দেয়।

কেলভিন ক্লেন, গুচি, প্রাডা, ফেরারি, ডায়র, শানাল, সি আর সেভেন, ওয়াইএসএল, ভিক্টোরিয়াজ় সিক্রেট— কী নেই সেখানে!

ইসলাম ধর্মে আতর ধর্মীয় আচার হিসাবেও মাখা হয়। সুরা বা অ্যালকোহল সেখানে বৈধ নয়। তাই তেল ভিত্তিক আতরে ইথানল বা ইথাইল অ্যালকোহল মিশিয়ে তৈরি হয় হালাল পারফিউম। তাজ আতরিয়তের কর্ণধারের পৌত্র আবদুল্লা বললেন, ‘‘ইথানলকে সুরার পর্যায়ে ফেলা হয় না। তাই তা হালাল। ইথানল মেশানো আতরের পারফিউম গায়ে দিয়ে নমাজ পরতেও যাওয়া যেতে পারে।’’ এহেন হালাল আতর পারফিউমও বিদেশি নামের। এমন নাম রাখার কারণ? আবদুল্লার উত্তর, ‘‘কলেজ পড়ুয়ারা ওই নামের আতর-পারফিউমই চাইছেন বেশি।’’

নাখোদার ঠিক উল্টো দিকের ‘আসগর আলি মহম্মদ আলি’র আতরখানা। মূল বিপণি লখনউয়ে হলেও কলকাতার শাখার ব্যবসা চলছে প্রায় ১০০ বছরের কাছাকাছি। তাদের কাউন্টারেও সার দিয়ে রাখা হুগো বস, ডানহিল, ব্ল্যাক ওপিয়াম, আরমানি অ্যাকোয়ার আতর সংস্করণ। আসলের দাম যাই হোক আতর সংস্করণ মিলবে দেড়শো থেকে আড়াইশো টাকার মধ্যে।

হালাল আতর পারফিউমও বিদেশি নামের।

ক্রেতা সামলাতে সামলাতে দোকানের বর্তমান কর্ণধারের পুত্র বিশ-পঁচিশ বছরের কলেজ পড়ুয়া ইয়াহ্ ইয়াহ্ বললেন, ‘‘আমাদের বয়সি অনেকেই এখন ওই সব নামের আতর কিনতে চায়। দামটাও তো অন্য আতরের চেয়ে অনেক কম।’’

আতরের নবাবি মেজাজ বর্জন তবে নতুন প্রজন্মের হাত ছাড়তে না চেয়েই। অথচ এক কালে দেশের নবাব-বাদশা-বেগমদের মনের রাশ ধরা থাকত আতরেরই হাতে।

এক কালে দেশের নবাব-বাদশা-বেগমদের মনের রাশ ধরা থাকত আতরেরই হাতে।

আকবরের মতো সম্রাট উদের আতরের প্রেমে পড়েছিলেন। শোনা যায়, সভায় যাওয়ার আগে তাঁর রাজবেশ সম্পূর্ণই হত না উদ-এর গন্ধ গায়ে না ছড়ালে। মোতিয়া আতর আবার জনপ্রিয় ছিল রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে। বেগমেরা ওই সুগন্ধি গায়ে দিতেন নবাবের চিত্তবৈকল্য ঘটাবেন বলে। কারণ, সে আতরের পরিচিতিই ছিল ‘কামোদ্দীপক’ হিসাবে। ব্যক্তিগত কক্ষে ব্যক্তিগত মুহূর্তের জন্য নবাবেরা রাখতেন কস্তুরির আতর। কারণ, তাঁদের বিশ্বাস ছিল, ওই আতর তাঁদের আকর্ষণ ক্ষমতা আর পৌরুষ বৃদ্ধি করে। যা খুব অস্বাভাবিকও নয়। আধুনিক বিজ্ঞান আগেই অ্যারোমাথেরাপির প্রাসঙ্গিকতা মেনেছে। শিকড়বাকড়, ফুল-পাতার নির্যাস থেকে তৈরি সুগন্ধি তেল ঔষধি বলে ব্যবহার করেছে আয়ুর্বেদ এবং অন্য চিকিৎসা শাস্ত্র। আতরও এক নির্যাসবাহী সুগন্ধি তেলই তো।

দুনিয়া যখন অ দে কোলোন, অ দে তোলাত বা অ দে পারফিউমের কথা শোনেনি, যখন ঘড়ি ধরে দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাজের জন্য আলাদা আলাদা সুগন্ধি তৈরির কথা ভাবেনি কেউ, আতরের জন্ম তারও বহু বহু বছর আগে। আর সেই জন্মস্থল বা আতরের ‘জায়ে তখলিক’ বলা যেতে পারে ভারতকেই। নানা রকম সুগন্ধি গাছের বাকল, ফুল, পাতা ইত্যাদি থেকে তেল নিষ্কাশন করে সুগন্ধি বানানোর ‘দেগ ভাপকা’ পদ্ধতির আবিষ্কার হয়েছিল সিন্ধু সভ্যতায়। যা গড়ে উঠেছিল একালের ভারত এবং পাকিস্তানের কিছু অংশে। অন্তত তেমনই জানিয়েছেন ইতিহাসবিদ পাওলো রোভেস্তি। তবে মতান্তরে, কেউ কেউ প্রাচীন মিশরেও ওই পদ্ধতি আবিষ্কার হওয়ার কথা বলেন। উৎপত্তি নিয়ে তর্ক হলেও আতরের প্রাচীনত্ব আর তার স্বদেশী যোগ নিয়ে বিতর্ক নেই তেমন।

৫০০০ বছরের বিবর্তন পেরিয়ে টিকে থাকতে গিয়ে কি আদি অকৃত্রিম এবং প্রাকৃতিক সুগন্ধ উবে যাবে?

প্রশ্ন বরং উঠতে পারে আতরের টিকে থাকার উপায় নিয়ে। ৫০০০ বছরের বিবর্তন পেরিয়ে টিকে থাকতে গিয়ে কি আদি অকৃত্রিম এবং প্রাকৃতিক সুগন্ধ উবে যাবে? থেকে যাবে কিছু বিলিতি নামধারী সিন্থেটিক আতর?

পুরনোকে সরিয়ে তখতে নতুনের আগমন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তো নতুনের বদলে আসছে ‘নকল’। কারণ খুঁজতে গিয়ে নেয়াজ় বলছেন, ‘‘বাবা-ঠাকুরদার ব্যবহার করা আতরের চড়া গন্ধের প্রতি অনীহা তৈরি হতে শুরু করেছিল একটা প্রজন্মের। সেই অনীহা বুঝেই ব্যবসায়ীরা মৃদু গন্ধের বিদেশি সুগন্ধ ধার করে তার আতর সংস্করণ বার করে।’’

বাজার বলছে, গত প্রায় এক বছর ধরে স্থবির আতরের ব্যবসা ।

কিন্তু এত করেও কি কিছু লাভ হল? বাজার বলছে, গত প্রায় এক বছর ধরে স্থবির আতরের ব্যবসা । এমনটা সাধারণত হয় না, বলছেন আবদুল্লা। তাঁর বক্তব্য, ‘‘দাদুর কাছে শুনেছি, নিজেও দেখেছি, এ ব্যবসা সব সময়েই বাড়তে থাকে। আটকে থাকাটা তাই ভাল নয়।’’

মূলত কনৌজেই আতর তৈরি হয় বেশি। তাকে দেশের সুগন্ধির রাজধানী বলা হয়। আর কিছু আতর তৈরি হয় লখনউয়ে। গত ছ’মাসে ওই দুই জায়গাতেই আতরের উৎপাদন বাড়েনি এক চিলতে। কারণ হিসাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকেই দায়ী করছেন আতর ব্যবসায়ী নেয়াজ়। তিনি বলছেন, ‘‘যা-ই বলুন, আতর তো একটা বিলাসদ্রব্যই। তা তো আর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মধ্যে পড়ে না। জিনিসপত্রের দাম যখন বাড়ছে, তখন কেন মানুষ আতরের পিছনে অনর্থক টাকা ঢালবেন?’’

মূলত কনৌজেই আতর তৈরি হয় বেশি।

কথাটি সত্যি। খাঁটিও। কিন্তু গন্ধও তো মানুষের পাঁচ অনুভূতির একটি। বিশেষ গন্ধ অনেক কঠিন সময় থেকে অদৃশ্য টাইম মেশিনে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলতে পারে অন্য কোনও কালের অন্য কোনও সুখমুহূর্তে। তখন চোখ কী দেখছে, কান কী শুনছে, জিভ কী আস্বাদন করল কিংবা কিসের স্পর্শ লাগল ত্বকে, সেই সব বোধ অকেজো হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কের প্রতিটি জৈবিক প্যাঁচে বিলি কাটতে থাকে সেই বিশেষ গন্ধটিই। তেমন তেমন ক্ষেত্রে সেই গন্ধ রোমকূপের গোড়ায় শিহরণ খেলায়। অচেনা স্রোত নামায় শিরদাঁড়া বরাবর। আর সম্ভবত সেই অদ্ভুত ক্ষমতা আর আবেশের জন্যই দুনিয়া জুড়ে সুগন্ধি নিয়ে মাতামাতি। যে দামে গোটা একখানা গাড়ি কিনে ফেলা যায়, সেই অর্থ সুগন্ধির একটি ছোট্ট শিশির জন্য ব্যয় করতে পিছপা হন না সুগন্ধীর ‘শওকিন’রা।

আতরের দুনিয়াতে তেমন সম্পদ অপ্রতুল।

আকবরের প্রিয় উদের কথাই ধরা যাক। অগরু গাছের বাকলে জমা আঠা থেকে তেল বার করে তৈরি করা হয় ওই তেল। ভাল অগরুর সন্ধান মেলে কম্বোডিয়ায়। অসম থেকেও আসে কিছু কিছু। সেই উদের আতরের এক ভরি, অর্থাৎ ১০ গ্রাম বা ১২ মিলিলিটার, যা দিয়ে এক টেবিল চামচও ভরবে না, কলকাতার দোকানে তার দাম ৩০-৪০ হাজার টাকা। গুণমানের ভিত্তিতে ওই আতরের এক গ্রামের দাম দেড় লক্ষ টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। খাঁটি গোলাপের নির্যাস দিয়ে তৈরি গুলাব আতরেরও দামও এর কাছাকাছি। ৩ মিলিলিটারের দাম ৩-৫ হাজার টাকা থেকে শুরু। এ ছাড়া খস, জাফরানের আতরও মহার্ঘ হতে পারে গুণমানের ভিত্তিতে। মাটির গন্ধকে আতরের শিশিতে বন্দি করে যে মিট্টি কা আতর তৈরি হয়, তারও ১০ মিলিলিটারের দাম হতে পারে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত।

কলকাতার পুরনো সব আতরের দোকানে সে সব আতর থরে থরে সাজানো থাকে সুদৃশ্য বেলজিয়াম কাচের নকশাদার আতরদানে। কোনওটির রং লালচে, কোনওটি গাঢ় খয়েরি রঙের, কোনওটির সর্ষে সোনালি রং আবার কোনওটি স্বচ্ছ সাদা। নাম বলে বলে স্ফটিকের গোলক দেওয়া এক একটি বোতলের ঢাকনা দিয়ে সেই সব আতর হাতে লাগিয়ে দিচ্ছিলেন দোকানের কর্মী আলি ইমাম। শামামা— নানা রকমের মশলার গন্ধ দিয়ে তৈরি। জন্নত-এ-ফিরদৌসে রয়েছে তুলসী, পদ্ম, জুঁই, ঘাস, চন্দন, দারচিনি ও আরও অনেক কিছু। মাজমুয়ায় মেশে খস, মিট্টি কা আতর, কেওড়ার আতর আর কদমফুলের গন্ধ। রুহ্‌ জাফরান, রুহ্‌ খস, প্রিমিয়াম কস্তুরি বা মাস্ক— সবই মেলে কলকাতার আতর গলিতে। বিস্ময়ের কথা হল, এই মাগ্যিগন্ডার বাজারেও সে আতরের খরিদ্দারেরো টিকে আছেন!

আতরের দুনিয়াতে তেমন সম্পদ অপ্রতুল।

আশার কথাও সেটাই! মনে করছেন, হাজি খুদা বক্স নবি বক্স কিংবা তাজমার্কা আতরিয়তের কর্ণধারেরা। স্থবির বাজারেও বছরে কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয় নেয়াজ়ের দোকানে। তিনি বলছেন, ‘‘পুরনো খরিদ্দারেরা যেমন আতর কিনছেন, তেমনই অল্পবয়সিরাও আতর কিনতে আসছেন তাঁর দোকানে। তাঁদের ৫০ শতাংশ বিদেশি নামের আতর খোঁজেন ঠিকই। কিন্তু বাকি অর্ধেক খস, মিট্টি কা আতর, গুলাব বা উদের খোঁজেও দোকানে আসেন।’’

অর্থাৎ, আতরের জন্নত-এ-ফিরদৌসে ‘বহিরাগতে’র প্রবেশ ঘটলেও, তা আতরের ভিত টলাতে পারেনি। বরং স্বদেশীর পাশে বিদেশিকেও স্থান দিয়ে আতর বুঝিয়েছে, তারা দূরে ঠেলে দেওয়ায় নয়, কাছে টানায় বিশ্বাসী। বিদেশি সুগন্ধি তাদের বর্জন করে চলতেই পারে কিন্তু সেই গোঁড়ামি অন্তত আতরের নেই। বরং বিদেশি সুগন্ধির আতর সংস্করণ তৈরি করে প্রস্তুতকর্তারা ছিটকে যেতে চাওয়া নতুন প্রজন্মকেও নিজের দিকে টানছেন। ফেরাচ্ছেন শিকড়ে। আসলে ৫০০০ বছর ধরে টিকে থাকা মুখের কথা নয়। আতর সেই কৌশল জানে। কে বলতে পারে, একটা সময় এল, যখন বিদেশি সুগন্ধি ফেলে সাধারণেও মজল স্বদেশী আতরেই!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement