Where to eat Mutton Kosha in Kolkata

কষামাংসের তিন অধ্যায়! কেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী গোলবাড়িই? শহরের আদি ঠিকানায় গিয়ে কী পাওয়া গেল?

জিভে আলগা লেগে থাকা মোলায়েম স্বাদ নয় যে, পরের খাবার মুখে দিলেই হারিয়ে যাবে। এ জিনিস মুখে পড়লে ঝাঁকুনি দিয়ে জেগে উঠবে পাঁচ ইন্দ্রিয়— এমনই রগরগে। এমনই তীক্ষ্ণ। এমনই স্বাদ-গন্ধ-বর্ণের মহামিলন তাতে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ ০৮:৫০
Share:

ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

বাটির গা বেয়ে চলকে পড়ল লাল তেল। সামলেসুমলেও বাঁচানো গেল না চার আঙুলের ডগা, মাখামাখি হল। তার পরে আর দিগ্বিদিক না ভেবে ঘন কালো থকথকে পদার্থে ‘ডুব’। নাকে ঝাঁজ, চোখে জল, হাতে আলগা চাপে খুলে খুলে আসা মাংসের নরম টুকরোর ছোঁয়া। জিভ পর্যন্ত পৌঁছনোর আগেই রঙে-রসে আধা বিমোহিত দশা আমিষপ্রেমীর। এই না হলে কষা মাংস!

Advertisement

জিভে আলগা লেগে থাকা মোলায়ম স্বাদ নয় যে, পরের খাবার মুখে দিলেই হারিয়ে যাবে। এ জিনিস স্বাদগ্রন্থি ছুঁলে ঝাঁকুনি দিয়ে জেগে উঠবে পাঁচ ইন্দ্রিয়— এমনই রগরগে। এমনই তীক্ষ্ণ। এমনই স্বাদ-গন্ধ-বর্ণের মহামিলন তাতে। খাদ্যরসিক জানেন, ভাল কষা মাংস হতে হলে এই ক’টি শর্ত পুরণ করতেই হবে। কিন্তু শহরে ঠিক তেমন কষা মাংস খাওয়ার সেরা ঠিকানা কোথায়?

প্রশ্ন যত সহজ, উত্তর তত সোজা নয়। বাঙালি খাবারের রেস্তরাঁ এখন কলকাতার পাড়ায় পাড়ায়। ফলে কষা মাংসও পাড়ায় পাড়ায়। সেরার খোঁজে তাই ফিরতে হল আদিতে। যে সময়ে বাঙালি খাবারের রেস্তরাঁ তো দূর অস্ত, রেস্তরাঁয় গিয়ে বাঙালি খাবার খাওয়ার কথাই ভাবা যেত না।

Advertisement

বাড়ির স্বাদের একঘেয়েমি কাটাতে, মুখরোচক কিছু খেতে কিংবা কষা মাংস খেতে তখন কোথায় যেতেন খাদ্যরসিকেরা? সেই অঙ্ক কষেই খোঁজের শুরু আর গিয়ে পড়া কিছু মলিনবরণ, পুরনো গল্পের বইয়ের মতো হোটেলে। যার চৌকাঠ পেরোলেই পিছিয়ে যাওয়া যায় বেশ কয়েক দশক। যেখানে মেনু কার্ড টেবিলে নয়, ঝোলানো থাকে দেওয়ালে। কালো রঙের কাঠ বা সিমেন্টের বোর্ডে চক কিংবা সাদা রঙে লেখা থাকে প্রতি দিনের প্রাপণীয় খাবারের তালিকা।

জুনের এক সন্ধ্যায় ভ্যাপসা গরমে তেমন এক রেস্তরাঁয় পৌঁছে ২৯৫ টাকার রসিদ কেটে জায়গা হল সাদার উপর কালো ছিট ছিট মার্বেলের সরু টেবিলে। বসার জায়গা বলতে ছোট ছোট কাঠের টুল। নিচু ছাদের ঘরে যে পাখা চলছে, তাতে গরম কমার বদলে বাড়ছে আরও। ছোট ছোট ফোসকার মতো ঘাম জমছে কপালে। তার মধ্যেই পরোটা ডুবিয়ে কালচে রঙের মাংস খাচ্ছেন জনা চারেক। কেউ বয়স্ক। কেউ কমবয়সি।

কলকাতার বুকে এক কালে কষামাংস বলতে বাঙালি গোলবাড়িকেই চিনত। ছবি: সংগৃহীত।

শ্যামবাজারের পাঁচমাথার মোড়ে গোলবাড়ি। আমিষভোজীদের দুনিয়া যখন মটন নিয়ে কথা বলতে বসে রোগন জোশ, নল্লি নিহারি, লাল মাস বা চম্পারণ মটন নিয়ে আহা-উহু করে, তখন বুক বাজিয়ে যে কষা মাংসের জয়গান গায় বাঙালি, তার গোড়াপত্তন এখানে।

সর্ষের তেল আর লালচে করে ভাজা পেঁয়াজে বিনা জলে কষানো মাংস। তার গায়ে গলে পড়া চর্বির তেল আর লোহার কড়াইয়ের গায়ে লেগে লেগে ভীম-কালো রং। রংয়েই বোঝা যায় মাংস ঠিক ঠাক কষানো হয়েছে কি না। কিন্তু বাঙালিকে এমন মিশমিশে কষা মাংস খেতে শেখাল কে? কোনও বাঙালি রাঁধুনি নন। এক পঞ্জাবী ব্যবসায়ীর দৌলতেই বাঙালির কষা মাংস প্রাপ্তি।

১৯২০ সালে শম্ভু সিংহ নামের এক পঞ্জাবী ব্যবসায়ী শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে হোটেল খোলেন। নাম নিউ পঞ্জাবী হোটেল। সেই হোটেলে রান্না করা হয় পঞ্জাবী মাংসের পদ ‘কড়াই গোস্ত’। লোহার কড়াইয়ে জল ছাড়া মাংসকে কষিয়ে কষিয়ে শুকনো করার যে চিরাচরিত পদ্ধতি তা আসলে সেই পঞ্জাবী রান্নারই। তার সঙ্গে কিছু বাঙালি মশলা মেশান রাঁধুনি, ব্যবহার করেন সর্ষের তেল। সব মিলিয়ে যেটি তৈরি হয়, কে জানত, তা ভবিষ্যতের বাঙালির মাংসপ্রেমের ধরনটাই বদলে দেবে!

কলকাতার বুকে এক কালে কষামাংস বলতে বাঙালি গোলবাড়িকেই চিনত। গাঢ় কালো রঙের কষা মাংস পরিবেশন করা হত তেঁতুলের চাটনি, শসা-পেঁয়াজ-বিট-গাজরের স্যালাড আর নরম কাপড়ের মতো পরোটা সহযোগে। সাদা চিনামাটির থালা-বাটিতে। এখনও তা-ই হয়। কিন্তু স্বাদও কি এক আছে?

মাঝে কলকাতার খাদ্যরসিকেরা গোলবাড়ির মাংসের নিন্দা শুরু করেছিলেন। এ-ও বলতে শুরু করেছিলেন যে, মাংসের স্বাদের মান পড়েছে। প্রবল গরমে পরোটা সহযোগে সেই মাংস মুখে তোলার পরে দু’টি বিষয় মনে হল— এক, এই যদি খারাপ হয়, তবে ভাল কেমন ছিল? দুই, এর থেকে ভাল বলে যে জায়গাগুলির কথা বলা হয়, সেগুলি তা হলে কত ভাল?

গোলবাড়ির সঙ্গে তুলনায় আকছার যে হোটেলের নামটি উঠে আসে তা হল ‘রূপা’। ছবি: সংগৃহীত।

গোলবাড়ির সঙ্গে তুলনায় আকছার যে হোটেলের নামটি উঠে আসে তা হল ‘রূপা’। গোলবাড়ির ঠিক উল্টো ফুট ধরে কয়েক পা এগোলেই সেই দোকান। আকারে কাছাকাছিই। এ দোকানে খাওয়ার জন্য পূর্ণাঙ্গ টেবিল আছে। আছে বসার গদি আঁটা সোফা এবং চেয়ার। রূপার কষামাংসের দাম গোলবাড়ির থেকে ঠিক ১০ টাকা কম। পরিবেশন করা হয় গোলবাড়ির ঢঙেই। সেই সাদা চিনামাটির প্লেট আর বাটি। সেই তেঁতুলের চাটনি এবং স্যালাড। পরোটার পাশাপাশি মেলে হাতে গড়া রুটিও।

রূপার সঙ্গে গোলবাড়ির নানা মিলের একটি কারণ পরিবার। গোলবাড়ি ওরফে নিউ পঞ্জাবী হোটেল আর রূপার কর্ণধারের পরিবার একই সুতোয় বাঁধা। গোলবাড়ির কর্ণধার কিষণ অরোরা আর রূপার কর্ণধার হরমিত আরোরার ঠাকুরদা এক জনই, জানালেন হরমিত। পারিবারিক মতবিরোধের জেরেই ভাগ হয় দোকান। তৈরি হয় রূপা। সেই রূপা এখন কষামাংসের দুনিয়ায় গোলবাড়ির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। গোলবাড়ির সমালোচকেরা রূপার কষা মাংসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কারণ, মূলত দু’টি। এক, তেল কম। দুই, মাংস তুলনায় বেশি নরম। সেই দাবি কি সত্যি? রুটিতে মাংসের ঝোল মাখিয়ে মুখে দিয়ে বোঝা গেল তেল কম নয় মোটেই। পুরদস্তুর রগরগে বা বলা ভাল ‘গরগরে’। গোলবাড়ির মাংসের মতো এতেও মিষ্টি ভাব নেই ঠিকই। তবে ঝাল বা ঝাঁজ অনেকখানি কম। তাই কষামাংস বললে যারা খানিক ঝালঝাল স্বাদ খোঁজেন, তাঁরা সামান্য আশাহত হতে পারেন।

পুরনো দোকানের কষা মাংসের কথা হলে শোভাবাজারের মিত্র ক্যাফেকে রাখতেই হবে তালিকায়। ছবি: সংগৃহীত।

পুরনো দোকানের কষা মাংসের কথা হলে শোভাবাজারের মিত্র ক্যাফেকে রাখতেই হবে তালিকায়। ১১৬ বছরের পুরনো ওই দোকানের কষা মাংসের ভক্তের পছন্দ আলাদা। এই কষা মাংসও কালচে। কিন্তু গোলবাড়ির মতো মিশকালো নয়। বরং খানিক লালচে ভাব রয়েছে। স্বাদে ঝালের বাড়াবাড়ি না থাকলেও ঝাল কম বলা যাবে না। সঙ্গে হালকা মিষ্টি ভাব রয়েছে। আর রয়েছে কাঁচালঙ্কা। যা কষা মাংসের স্বাদে খানিক বাড়তি ‘ফ্রেশনেস’ বা তাজা ভাব আনে।

মিত্র ক্যাফের কষা মাংস অবশ্য কোনও অনুষঙ্গ সহযোগে আসে না। রুটি, পরোটা, পাউরুটি, সবই পাওয়া যাবে ইচ্ছেমতো। শুধু কষা মাংসের একটি প্লেটের দাম ৫৪৩ টাকা।

মোগলাই পরোটার জন্য বিখ্যাত ধর্মতলার অনাদিতেও পাওয়া যায় কষা মাংস। ছবি: সংগৃহীত।

কেবল এই তিনটিই যদিও কষা মাংসের পুরনো ঠেক নয় শহরে। আরও আছে। যশোর রোডের পবিত্র হিন্দু হোটেল তেমনই এক নাম। ওই দোকানের কষা মাংসের সুনাম আছে দমদম এবং আশপাশের এলাকায়। কয়েক দশকের পুরনো ওই দোকানে কষা মাংস পরিবেশন করা হয় মাটির খুরিতে। ১০০ বছরের পুরনো কেবিন ধাঁচের রেস্তরাঁ আমহার্স্ট স্ট্রিটের পদ্ম। এখনও সেখানে স্টিলের থালায় খাবার পরিবেশন করা হয়। সেই পদ্মেরও কষা মাংসের জনপ্রিয়তা আছে। তবে তাদের কষা মাংস লালচে। স্বাদও কিছুটা বাড়িতে রান্না করা কষা মাংসের মতোই। ঘরোয়া তবে সুস্বাদু। মোগলাই পরোটার জন্য বিখ্যাত ধর্মতলার অনাদিতেও পাওয়া যায় কষা মাংস। মোগলাই পরোটার সঙ্গে তা খান অনেকেই। তবে তারও স্বাদ নিয়ে বাড়তি বলার কিছু নেই।

বিশেষ করে বলা দরকার

এক সারিতে রাখা না গেলেও এক্সক্ল্যুসিভ বাঙালি খাবারের রেস্তরাঁ কস্তুরীর কষামাংসের কথা বলতেই হয়। ছবি: সংগৃহীত।

এদের সঙ্গে এক সারিতে রাখা না গেলেও এক্সক্ল্যুসিভ বাঙালি খাবারের রেস্তরাঁ কস্তুরীর কষামাংসের কথা বলতেই হয়। কষামাংসের খুব পুরনো ঠেক না হোক, নতুনও নয় তেমন। নিউ মার্কেট চত্বরে প্রায় ৩২ বছর ধরে খাদ্যরসিকদের তৃপ্ত করছে এরা। এদের কষা মাংস একটু অন্য ধরনের। তাতে মাখোমাখো ভাব কম। ঝোল ভাব সামান্য বেশি। গড়িয়ে পড়া তেল থাকলেও তথাকথিত রগরগে বলতে যা বোঝায়, তা নয়। ঝাল-নুন আর মিষ্টির ভারসাম্য নিখুঁত। মাংসের টুকরোও অতীব নরম। কস্তুরী-র খদ্দেররা অধিকাংশেই ভাতবিলাসী। তাই হয়তো ঝোলের মাত্রা খানিক বেশি। ও পার বাংলা থেকে কলকাতায় আগতেরা পছন্দ করেন নিউ মার্কেটের আশপাশে থাকতে। তাঁদের জন্যই এ পার- ও পারের যুগলবিন্দি খানা পরিবেশনের বন্দোবস্ত করেছিল কস্তুরী। মাছভক্তদের কাছে এ দোকানের সুনাম বেশি হলেও কষা মাংসে সে যে ব্যুৎপত্তি দেখাতে পেরেছে, তা বলার বিষয় বইকি।

তা হলে কষা মাংসের মধ্যে এগিয়ে কে?

প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বাছতে বসলে তৃতীয় স্থানে রাখতে হয় রূপাকে। নরম মাংস, কষা মাংসের অতি জরুরি রগরগে ভাবে সে এগিয়েছে। সামান্য পিছিয়ে পড়েছে স্বাদের ভারসাম্য আর স্বকীয়তার অভাবে। রূপাকে বলা যেতে পারে গোলবাড়ির কম ঝাল সংস্করণ।

দ্বিতীয় স্থানে রাখা যায় মিত্র ক্যাফেকে। গোলবাড়ির ঘরানার নকল নয়। তার নিজস্ব স্বাদের ধরন আছে। এর স্বাদে গরম মশলার দখল কিছু বেশি। তবে কাঁচালঙ্কা আর মিষ্টি ভাব তাতে ভারসাম্য এনেছে। কিছুটা হলুদের গন্ধও আসে নাকে, তাই নম্বর একটু কমল।

সেরার মুকুট গোলবাড়ির মাথাতেই। কেন? যে কোনও শ্রেষ্ঠ জিনিসের বৈশিষ্ট্য হল তার স্বকীয়তা। গোলবাড়ির তা রয়েছে। এ মাংসের বিশেষত্ব তার ঝাঁজে। এমনই সেই ঝাঁজ যে, হাঁচি আসে। শ্যামবাজারের পাঁচমাথা মোড়ের অভিজ্ঞান চিহ্ন গোলবাড়ির সামনে অপেক্ষমাণ প্রেমিক বা প্রেমিকার খুদে বাড়ে ছোট্ট রেস্তরাঁ থেকে উপচে ওঠা ঝাঁজ। গোলবাড়ির মতো কালচে রগরগে কষা মাংস অনেকে বানাতে পারলেও তাদের ঝাঁজটি নকল করা যায়নি। মাংসে নরম ভাব, নুন-মিষ্টি-ঝালের ভারসাম্য, পাঁঠার মাংসের নিজস্ব গন্ধ— সব বজায় রেখেও স্বকীয়তা বজায় রেখেছে গোলবাড়ি। আর সেখানেই সে পিছনে ফেলে দিয়েছে বাকিদের।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement