গ্যাস-অম্বলের রোগী থেকে অন্তঃসত্ত্বা, শোয়ার ভঙ্গি বদলে দেবে বিছানা নিজেই, দাম কত। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
ঘুমপাড়ানি মাসিপিসিরা ঘুমের থলি ভরে নিয়ে ঘরে আসবেন কি না জানা নেই, তবে চাইলে একটি ‘স্মার্ট’ বিছানা ঘরে আনা যেতেই পারে। মা-ঠাকুরমার মতো পিঠ চাপড়ে ঘুম না পাড়ালেও, নিজের আকার-ভঙ্গি বদলে শায়িত মানুষটির চোখে নিশ্চিন্তের ঘুম নিয়ে আসার দায়িত্ব তারই। এ শয্যা যেমন তেমন নয়। নিজের আকার বদলায়। এতে থাকা হাজার হাজার সেন্সর মানুষের শরীর চিনে নেয়। বোঝে তার অসুখবিসুখের খুঁটিনাটি। নাক ডাকা কমাতে শোয়ার ভঙ্গি যেমন হবে, অম্বলের রোগীর শোয়ার ভঙ্গি তেমনটা হবে না। আপনার কাছে সে তথ্য না থাকলেও বিছানাটির কাছে থাকবে। তাই আপনি যে ভঙ্গিতেই আয়েস করুন না কেন, বিছানাটি ঠিক সযত্নে আপনার শোয়ার ভঙ্গিটি বদলে দেবে। রাতে শুয়ে কস্মিনকালেও যাঁর ঘুম আসে না, তাঁর দু’চোখেও ঘুম এনে দেবে নিমেষে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে এমন সবজান্তা শয্যা তৈরি হয়েছে ভারতেই।
বিছানা না রোবট?
রোবট বলাই ভাল। কারণ কাঠ, লোহা বা স্টিলের তৈরি গড়পড়তা বিছানা সেটি নয়। এর জ্ঞান আছে, রয়েছে মানুষের ইন্দ্রিয় বোঝার ক্ষমতাও। হায়দরাবাদের ‘ওয়াটার রোবোটিক্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা তেজ বিনুকোল্লু এমন রোবট-শয্যা তৈরি করেছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সিএএমএ’। বিশ্বের প্রথম পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তনশীল ‘স্লিপ সিস্টেম’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রয়োগে রোবটিক্সের প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে। তেজ বিনুকোল্লু নিজে দীর্ঘকাল ধরে স্লিপ ডিস্কের সমস্যায় ভুগেছিলেন। মেরুদণ্ডের আকারই বদলে গিয়েছিল তাঁর। বিছানায় শুতে যথেষ্টই সমস্যা হত। সে যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা থেকেই এমন বিছানা তৈরির ভাবনা তাঁর আসে। এমন এক বিছানা, যেখানে মানুষকে তার শোয়ার ভঙ্গি ঠিক করতে হবে না। বরং বিছানাটিই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তার আকার বদলে শায়িত মানুষটি যাতে আরাম পান, সে খেয়াল রাখবে।
বিছানায় রয়েছে হাজার দশেক সেন্সর যা শায়িত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা বুঝবে।
কী ভাবে বদলাবে রোবট-শয্যা?
শোয়ার ভঙ্গি নিয়ে এখন বিস্তর আলোচনা হয়। কোন পাশ ফিরে শোয়া ভাল, সোজা হয়ে না বাঁ দিকে ফিরে— কোনটি উপকারী ইত্যাদি। রোবট-শয্যার কাজই হল শয়নভঙ্গি শুধরে দেওয়া। তা কী রকম?
বিছানায় রয়েছে ১০,৭৫২টি সেন্সর। সেই সেন্সরগুলি অনবরত ট্র্যাক করে যে ব্যক্তিটি কী ভাবে ঘুমোচ্ছেন এবং সেই অনুযায়ী বিছানাটি আকার পরিবর্তন করে ফেলবে। এর নানা রকম ‘মোড’ রয়েছে।
প্রেগন্যান্সি সাপোর্ট মোড: অন্তঃসত্ত্বাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ত্রৈমাসিকে পাশ ফিরে শোয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু ঘুমের ঘোরে তা মনে রাখা অসম্ভব। বিছানাটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে বুঝতে পারে ব্যবহারকারী অন্তঃসত্ত্বা কি না। শুধু তা-ই নয়, তিনি কী ভাবে ঘুমোলে তা স্বাস্থ্যকর হবে, সে খেয়ালও রাখবে।
রোবট-শয্যা কাজ করে কী ভাবে?
অ্যান্টি-স্নোরিং মোড: তীব্র নাসিকা গর্জনে সঙ্গী অতিষ্ঠ হচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু বিছানাটি তা হবে না। বরং কোন পাশ ফিরে শুলে নাক ডাকা কমবে, তা বুঝে সে নিজেই আপনাকে পাশ ফিরিয়ে দেবে। অথবা এমন ভাবে নিজের আকার বদলাবে, যাতে নাক ডাকা আপনা থেকেই থেমে যায়।
গার্ডিয়ান মোড: শিশুদের সুরক্ষার জন্য তৈরি। বিছানায় শিশুকে শুইয়ে বাবা-মা নিশ্চিন্তেই নিজের কাজ করতে পারেন। কারণ বিছানাটি এমন ভাবে শিশুকে ধরে রাখবে যাতে, সে গড়িয়ে নীচে পড়ে যেতে না পারে।
জিইআরডি মোড: রাতে ভারী খাবার খাওয়ার পর সোজা হয়ে শুলে অনেক সময় অ্যাসিড খাদ্যনালি বেয়ে উপরে উঠে আসে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় অ্যাসিড রিফ্লাক্স বলে। বিছানাটি দিব্যি বুঝতে পারবে, শায়িত ব্যক্তির গ্যাস-অম্বলের সমস্যা আছে কি না। থাকলে নিজে থেকেই মাথার অংশটি সামান্য উঁচু করে দেবে যাতে শোয়ার পরে গলা-বুক জ্বালা না হয়।
টুগেদার মোড: এটি একেবারেই প্রেমিক-প্রেমিকা বা দম্পতিদের জন্য। একসঙ্গে বিছানায় শোয়া, বই পড়া বা টিভি দেখার সময়ে আরামদায়ক ভঙ্গি তৈরি করে দেবে।
ওয়েক-আপ মোড: ঘুম থেকে ওঠার সময় তাড়াহুড়ো করে সোজা হয়ে বসলে পিঠে ব্যথা হয় অনেক সময়ে। অথবা অনেকেরই রাতে শোয়ার ভঙ্গির জন্য হাতে-পায়ে, পিঠ বা কোমরে ব্যথা হয়। বিছানাটি শয়নভঙ্গি ঠিক করে দেবে গভীর ঘুম না ভাঙিয়েই।
ডিজিটাল যুগে শোয়ার ঘরের অন্দরেও ব্যস্ততা। ‘আয় ঘুম যায় ঘুম, দত্তপাড়া দিয়ে’ এই ঘুমপাড়ানি ছড়া বাতিলের তালিকায়। সমীক্ষা বলছে, বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ মানুষের চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়েছে। টেলিভিশন বা মোবাইলের পর্দা বেয়ে নীল আলো চুঁইয়ে নামছে চোখে। ফলে যে ঘুম সহজেই নেমে আসত দু’চোখের পাতায়, তার জন্য এখন মেলাটোনিন টোটকা, ক্যামোমাইল চা বা অক্সিজেন-মুখোশ লাগছে। ঘুম শিবরাম চক্রবর্তীর কাছেও ছিল বড় প্রিয়। মুক্তারামের (মুক্তারামবাবু স্ট্রিট) তক্তারামে (তক্তপোশ) শুয়ে কেটে যেত তাঁর দিনের একটা লম্বা সময়! সে তক্তারাম এখন নেই, তবে রোবট-শয্যা আছে। যদি তার দাম ভারতীয় মুদ্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকা হবে, তবুও বছরের পর বছর অনিদ্রা আর ঘুমপাড়ানি ওষুধ খেয়ে যন্ত্রণা ভোলার চেয়ে তা হয়তো ঢের বেশি ভাল অনেকের কাছেই।