চলছে শুয়োর পাকড়াও অভিযান। —নিজস্ব চিত্র।
দিনভর ছুটোছুটির পরে নাগালে এল মাত্র ৭টি শুয়োর। কাটোয়ার পুরসভা শুয়োর ধরার অভিযানের দ্বিতীয় দিনের প্রাপ্তি এটাই। অথচ মহকুমা হাসপাতাল চত্বর থেকে শুরু করে শহরের নানা রাস্তায় কয়েকশো শুয়োর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রোজই। এর আগেই অভিযানে নেমে ৮টি শুয়োর ধরতে পেরেছিলেন পুরসভার কর্মীরা।
শুক্রবার সকাল ৮টা বাজতে না বাজতেই লোকলস্কর নিয়ে দফতরে তৈরি হয়ে গিয়েছিলেন কাটোয়া পুরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর নিতাই পাল। বারবার কাটোয়া থানায় ফোন করে জানতে চাইছিলেন পুলিশ কখন আসবে। তাঁর কথায়, “শুয়োর ধরার কত বিপদ জানেন! পুলিশ ছাড়া অভিযান করা যাবে না।” শেষমেষ ১১ টা নাগাদ পুলিশকে সঙ্গী করে বেরোলেন পুরকর্মীরা। ঘড়ি দেখে অনেকেই অবশ্য বলছিলেন, “এত বেলায় গিয়ে কী লাভ হবে? সকালের খাবার খেয়ে শুয়োরেরা চড়তে বেড়িয়ে পড়েছে।” তার মধ্যেই বাঁশ, লাঠি, জাল, দড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন একদল লোক। প্রথম গন্তব্য, জেলখানার সামনে কাটোয়া মহকুমা আদালতের বিচারকদের আবাসন। দলবল দেখতে পেয়েই কয়েকজন মহিলা ব্যালকনি থেকে মুখ বাড়িয়ে বললেন, “এই তো সকালে গোটা কয়েক শুয়োর ঘুরছিল। আর নেই বোধহয়।” পুরকর্মীরা অবশ্য ততক্ষণে আবাসনের সামনের ভাঙাবাড়ি, ঝোপঝাড় খুঁজতে শুরু করেছেন। কিন্তু শিকে ছিঁড়ল না। শুয়োর মিলল না পিটিটিআই কলেজেও। এর মধ্যেই খবর এল অজয়ের বাঁধে কয়েকটি শুয়োর দেখা যাচ্ছে। দেরি না করে ট্রাক্টর নিয়ে ৩০-৩৫ জন পুরকর্মী রওনা দিলেন বাঁধের দিকে। বাঁধে উঠতেই সমস্বরে চিৎকার, “ওই দ্যাখ, ওই দ্যাখ, ছাড়িস না কিন্তু।” একজন জাপটে ধরলেন, তারপরে জাল দিয়ে আটকে পা বেধে দিলেন অন্য পুরকর্মীরা।
গোয়াই গ্রামের দিকে যাওয়ার পথে অজয়ের তীরে খোঁয়ারে মিলল আরও গোটা তিনেক শুয়োর। ওই খোঁয়ারটি আবার পুরকর্মী মুন্না হরিজনের। তিনি তিনি কাকুতি মিনতি করে বলেন, “আমি গতকালকেই কিনে এনেছি। এ বারের মতো ছেড়ে দিন।” তবে কড়া শিক্ষকের মতো তাঁকে ধমক লাগালেন নিতাইবাবু। তিনি বলেন, “লজ্জা করে না, পুরকর্মী হয়ে এখনও শুয়োরের খোঁয়াড় রেখেছিস। আবার শুয়োর ছাড়ার অনুরোধ করছিস!” শুয়োর ধরার অভিযানে থাকা কয়েকজন জানান, অনেকে নাকি বাড়ির ছাদে লুকিয়ে বেধে রাখছে শুয়োর।
কাটোয়া স্টেশনের বড় লাইন ও ছোট লাইনের মাঝের ঝোপঝাড়, জলা জায়গায় দেখা যায় অগুনতি শুয়োর ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তাদের ধরতে গিয়ে রীতিমতো নাকানি চোবানি খেতে হয় ওই পুরকর্মীদের। কবাডি খেলার মতো তিন জন মিলেও একটা শুয়োরকে জাপটে ধরেও আটকাতে পারেননি। পুরকর্মীদের চোখ এড়িয়ে তিন বাচ্চাকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে টুকটুক করে পালায় এক শুয়োর-দম্পতিও। পুরকর্মীদের নাজেহাল দশা দেখে রেলকর্মীরা বলে ওঠেন, দেড় ক্যুইন্টাল ওজনের শুয়োর ধরা কী অত সোজা?
পুরকর্মীরা যখন রেললাইনের উপর শুয়োরদের সঙ্গে প্রায় লুকোচুরি খেলছেন তখন প্ল্যাটফর্মে গাছের ছায়ায় বলে আটক শুয়োরদের খাবার জোগাচ্ছেন নিতাইবাবু। আপন মনে বলে উঠলেন, “এমন হয়রানি জীবনে হয়নি।”
তবে এ দিন দিনভর ধরপাকড়ের মধ্যেও কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে দিব্যি ঘুরে বেড়িয়েছে শুয়োরের দল। হাসপাতালের নার্সদের আবাসন থেকে একটি মৃত শুয়োরের দেহ পেয়েছে পুরসভা।