পার্বতী বাউল।
ইমামি ফাউন্ডেশনের আমি আর্টস ফেস্টিভ্যালে ‘দ্য হার্ট সং’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটির অ্যাম্ফিথিয়েটার। পার্বতী বাউল এবং জর্জ ব্রুকসের দ্বৈত পরিবেশনা মুগ্ধ করল উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাকে। বাউল সঙ্গীতের ভাবের বৈচিত্র যে জ্যাজ় সঙ্গীতের সুরের মুক্ত গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে এবং সংস্কৃতিগত অসাদৃশ্য যে সাঙ্গীতিক আলাপচারিতায় কখনওই অন্তরায় হয় না, তা আবার প্রমাণ হয়ে গেল সেই সন্ধ্যায়।
অনুষ্ঠান শুরু করলেন জর্জ ব্রুকস, স্যাক্সোফোনে জ্যাজ় সঙ্গীতের ধারায় একটি সুরেলা মোনোলগ দিয়ে। সুরের অনায়াস যাত্রার মধ্যেও কোথাও যেন একটা বিরহের স্থায়ী রেশ থেকে যাচ্ছিল। এর পরে তানপুরা চালিয়ে জর্জ জ্যাজ়ের অবাধ গতিকে একটি ষড়জে বেঁধে রাগ চারুকেশীর আঙ্গিকে বিরহ ও প্রতীক্ষার ভাবকে আরও সজীব করে তুললেন। তাঁকে সহযোগিতা করলেন ডাবল বাসে দেবজিৎ মহলানবীশ এবং পাখোয়াজে নীলাংশুক দত্ত। চারুকেশীর সুরে উপজ করার পরে ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের রীতিতে একটি চক্রদার দিয়ে উনি নিজের একক বাদন শেষ করেন।
জর্জ ব্রুকস।
সুরের প্রথম প্রলেপ দিয়ে মঞ্চ প্রস্তুত হতেই নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ডুগি-একতারা নিয়ে চলে আসেন পার্বতী বাউল। একটি সংক্ষিপ্ত গুরুবন্দনা করে পার্বতী প্রথম গান ধরলেন ‘জীবন-মরণ হবে নিবারণ’। মন্দ্র-মধ্য সপ্তকে খুব যত্নে সুরমালা সাজিয়ে নিয়ে পার্বতী শুরু করলেন ঠিকই, কিন্তু মুহূর্তেই কিছুটা বেপরোয়া ভঙ্গিতে এক লাফে তার সপ্তকের ষড়জে যখন নিখুঁত ভাবে গিয়ে পড়লেন, অনুমান করা গেল কণ্ঠের উপরে তাঁর কতটা নিয়ন্ত্রণ। একতারা, ডুগি নিয়ে মন্দ্র লয়ে একটা দাদরার ছন্দ ধরে এবং পায়ে ঘুঙুর নিয়ে সেই ছন্দে নাচতে নাচতেও সেই নিয়ন্ত্রণ কখনও শিথিল হল না। বাউল সাধন তত্ত্বের উপরে আধারিত এই গানটির এক আড়ম্বরহীন ও ধীর লয়ের উপস্থাপনা গানের ভাবকে আরও পূর্ণতা দেয়। গানে সাধনার মাধ্যমে সাত দেহচক্রের জাগরণ, অনাহত নাদ, জীবন-মৃত্যুর বৃত্ত থেকে মুক্তি এবং মোক্ষলাভের কথা বাউল দর্শনে বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনার প্রভাব স্পষ্ট করে তুলে ধরে। সন্ধ্যার প্রথম গান চয়নেই শিল্পী নিজের বোধ ও ভাবের গভীরতা ধরিয়ে দিলেন।
এর পরের উপস্থাপনায় জর্জ ব্রুকস তাঁর স্যাক্সোফোন নিয়ে পার্বতীর সঙ্গে যোগদান করেন। ডাবল বাস এবং শ্রীখোলের অনুষঙ্গে ‘গৌরাঙ্গ রূপে প্রাণ নিলো গো নিলো’ গানটি একটি ভিন্ন মাত্রা পেল। সাধক তারক দাস বাউলের ‘মনের মত পাগল পেলাম না’ গানটিতে ভৈরবীর সুর নিয়ে জর্জ যেমন পার্বতীকে অনুসরণ করে গেলেন, তেমনই আবার ইন্টারলিউডে খঞ্জিরা এবং ডাবল বাস-এর সঙ্গে তালফেরতা করে উপজ করলেন ভৈরবীর রাগ-রূপ অটুট রেখে। এর পর ‘আমার আশা নাই, আশা নাই রে’ গানটিতে পার্বতী খোলা গলায় উচ্চগ্রামে যখন পৌছে যান, তখন বিচ্ছেদের করুণ সুর বাংলা ঢোলের তালে তালে একদিকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে আর অন্য দিকে স্যাক্সোফোনের মায়াভরা সুর তারসানাইয়ের আবহের মত বুকে এসে বেঁধে। ডাবল বাসের খরজের স্বরগ্রাম বাংলার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে বিরহের হাহাকারের ছবি এঁকে চলে। বাউল সাধনমার্গে যে বৌদ্ধ ও বৈষ্ণবের সঙ্গে শাক্ত ভাবও এসে মেশে, রামপ্রসাদী গান ‘আমি কি এমতি রব’ গানটির মধ্যে দিয়ে শিল্পী তা প্রকাশ করেন। এই গানটি পার্বতী প্রচলিত সুরে না গেয়ে বাউল গানের ধারা বজায় রেখে রাগ মালকোষের সুরে যে ভাবে সাজিয়েছেন, তা প্রশংসাযোগ্য। অনুষ্ঠানের শেষলগ্নে শিল্পীর গাওয়া ‘যোগী’ যে রাগ শ্রী-তে বাঁধা, তার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারা অনুযায়ী ছয় রাগের মধ্যে পাঁচ রাগের সৃষ্টিকর্তা শিব এবং ষষ্ঠ রাগ শ্রী-র জননী স্বয়ং পার্বতী। শিল্পীর নামের সাথে রাগ শ্রী-র এই যোগসূত্র নিতান্ত কাকতালীয় হলেও শিবস্তবে এই রাগের চয়ন সুপরিকল্পিত এবং সুপ্রযোজ্যও। শিব-শক্তির ভজনার রেশ টেনে শিল্পী এর পর ঝাঁপতালের ছন্দে ‘ত্রিপুরসুন্দরী তারা’ গানটি করেন। এই গানটির সঙ্গে স্যাক্সোফোনে জর্জ এমন নিখুঁত রামপ্রসাদী সুরের আবহ ধরে রাখেন যে, মনেই হয় না তিনি ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ। শেষে পার্বতী ‘রাধা কৃপা কটাক্ষ’ স্তোত্রের এক অপূর্ব উপস্থাপনা দিয়ে অনুষ্ঠান সমাপনের দিকে এগিয়ে যান। সুফি দরবেশদের মত ভাবসমাধিতে আবর্তিত হতে হতে, শ্রোতাদের স্বতঃস্ফুর্ত ‘রাধে রাধে’ ধ্বনিতে লীন হয়ে শিল্পী অনুষ্ঠান শেষ করেন।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে