Drama Review

বিস্মৃতির কুহেলিকা সরিয়ে ফিরে এলেন তারাসুন্দরী

বাংলার রঙ্গমঞ্চে একক নাট্যাভিনয়ের ধারা রয়েছে। বাঙালি নাট্যমোদী দর্শক অসামান্য কিছু একক নাটক দেখেছেন গত অর্ধ-শতাব্দী জুড়ে।

সৌভিক গুহ সরকার

শেষ আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৮
Share:

তারাসুন্দরীর চরিত্রে গার্গী।

সম্প্রতি মধুসূদন মঞ্চে উপস্থাপিত হল থিয়েটার প্লাস প্রযোজিত নাটক ‘তারাসুন্দরী’। নাট্যকার ও নির্দেশক উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়। দর্শকের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে, কে এই তারাসুন্দরী? তাঁর নাম আজ নটী বিনোদিনীর মতো চর্চিত নয়, কিন্তু এক সময়ে তাঁকে ‘রিজিয়া’ নাটকে নামভূমিকায় অভিনয় করতে দেখে স্বদেশি আন্দোলনের নেতা বিপিন চন্দ্র পাল বলেছিলেন, ‘ইউরোপে আমেরিকায় কোনও রঙ্গমঞ্চে তারার রিজিয়ার মতো অভিনয় দেখিনি।’ এই ছিলেন নটী তারাসুন্দরী— গৈরিশ যুগের বাংলার রঙ্গমঞ্চের এক উজ্জ্বলতম অভিনেত্রী, যিনি এখন বিস্মৃতপ্রায়। তারাসুন্দরীর জন্ম ১৮৭০-এর শেষের দিকে। তিনি নটী বিনোদিনীর সাহায্যে ১৮৮৪ সালে থিয়েটারে যোগদান করেন। তখন তিনি বালিকা। স্টার থিয়েটারে বালকবেশে ‘চৈতন্যলীলা’ ও ‘সরলা’য় অভিনয় করেন। অমৃতলাল মিত্র তাঁর নাট্যশিক্ষক ছিলেন। ১৮৯৪ সালে চন্দ্রশেখর নাটকে ‘শৈবলিনী’র ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি বিখ্যাত হন। তখন তিনি সদ্য যুবতী। এই সময়ে সে-যুগের নবীন অভিনেতা ও নির্দেশক অমরেন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে লিপ্ত হন। সে প্রেম তাঁকে ঋদ্ধ করে, রক্তাক্ত করে। তারাসুন্দরী বুঝতে পারেন যে পথে তিনি চলেছেন, তা এক দীর্ঘ দহন ও নিঃসঙ্গতার পথ। তাই, তারাসুন্দরীর জীবন হয়ে ওঠে পুরুষশাসিত সমাজে, এক নারীর অস্তিত্বের জন্য তীব্র লড়াইয়ের কাহন। উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় এই নাট্যরচনা করে বিস্মৃতির কুহেলিকা সরিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনলেন একবিংশ শতাব্দীর বঙ্গীয় রঙ্গমঞ্চে। তারাসুন্দরীর আত্মকথনের আঙ্গিক নাটকটিকে ফর্মের দিক দিয়ে মুক্ত করেছে। তথ্য রয়েছে, কিন্তু তা নায়িকার জীবনের অংশ হয়ে রয়েছে।

বাংলার রঙ্গমঞ্চে একক নাট্যাভিনয়ের ধারা রয়েছে। বাঙালি নাট্যমোদী দর্শক অসামান্য কিছু একক নাটক দেখেছেন গত অর্ধ-শতাব্দী জুড়ে। তারাসুন্দরী সেই ধারায় নবতম সংযোজন। এই নাটকটিতে গার্গী রায়চৌধুরীর অভিনয়দক্ষতা মুগ্ধ করেছে। একটা যুগ এবং এক নারী হৃদয়ের আশা-আকাঙ্ক্ষা-যন্ত্রণা তাঁর অভিনয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে। সে-যুগে তারাসুন্দরীর উত্থান শুধু তাঁর অভিনয়ের জন্যই হয়নি, লাস্যময়তাও অন্যতম কারণ। আজকের ভাষায় তিনি ছিলেন ‘বোল্ড’। গার্গী অভিনয়ের মাধ্যমে তারাসুন্দরীর এই দিকটি নৈপুণ্যের সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেহেতু একক, তাই নানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন গার্গী। কখনও নারী, কখনও পুরুষ। আবার কখনও কোনও নাটকের চরিত্র হয়ে। তিনি পুরুষ চরিত্র থেকে নারী চরিত্রে অবলীলায় গমন করছেন। গার্গী সুগায়িকা। তিনি অভিনয় করতে করতে গাইছেন। গাইতে গাইতে অভিনয় করছেন। কপালকুণ্ডলার মোতি বিবি চরিত্র করতে করতে গানে ভেঙে পড়ছেন— ‘ওরে বিধি হায় রে বিধি, তোর মনে কি ইহাই ছিল?’ তারাসুন্দরীর আত্মকথনের মধ্যেই গেয়ে উঠছেন— ‘উলটি পালটি নারীর তনুটি’। একই সঙ্গে তিনি তারাসুন্দরী অভিনীত ওথেলো নাটকের সংলাপ বলছেন। ওথেলো ও ডেসডিমোনা— দ্বৈত চরিত্রেই অভিনয় করছেন তিনি। অভিনয় ও গানেই বোঝা যায় যে গার্গী এই নাটকটির জন্য গভীর অনুশীলন করেছেন। তাঁর অভিনয় মেদহীন। গার্গীর এই একক অভিনয় বাংলার রঙ্গমঞ্চের অন্যতম সম্পদ হয়ে রইল।

‘তারাসুন্দরী’ নাটকে গানই চালিকাশক্তি। এই নাটকের জন্য যথোপযোগী সঙ্গীত (গান ও আবহ) পরিচালনা করেছেন প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়। ভাল লেগেছে সৌমিক-পিয়ালীর রুচিশীল মঞ্চ পরিকল্পনা। অভিষেক রায়ের পোশাক পরিকল্পনাও চমৎকার। পোশাকে রক্তিমবর্ণের প্রয়োগ ভাল লেগেছে। এই নাটকের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এর দৈর্ঘ্য। দীর্ঘ হলে এ নাটক শিথিল হয়ে যেত। তাই এটিকে স্বল্প দৈর্ঘ্যের মধ্যেই বেঁধে রাখা হয়েছে, যাতে মনে হয়, শেষ হইয়াও হইল না শেষ। শেষ দৃশ্যটি বড় চমৎকার লিখেছেন নাট্যকার, যেখানে বিনোদিনীর সঙ্গে তারাসুন্দরীর কথা হয়। তারাসুন্দরী জিজ্ঞেস করে, ‘দিদি, আমরা চলে গেলে আমাদের নিয়ে কেউ কিছু লিখবে?’ হৃদয়স্পর্শী সংলাপ! ‘তারাসুন্দরী’ নাটকটি বাংলার পুরাতন নাট্যজগৎ থেকে উড়ে আসা একটি পাতা, যার ভিতর জ্বলছে সে যুগের বহু তারাসুন্দরীর হৃদয়!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন