জীবনকথা: চারুবাসনায় শিল্পী মমতা মণ্ডলের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম
সম্প্রতি চারুবাসনার সুনয়নী চিত্রশালায় শিল্পী মমতা মণ্ডলের অভিনব এক প্রদর্শনী দেখা গেল— ‘টারবুল্যান্স অব রিভার মাতলা’ এবং ‘স্রোত ও স্মৃতি’। কিউরেটর, শিল্পী তাপস কোনার।
মমতার শৈশব কেটেছে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মধুখালি গ্ৰামে, মাতলা নদীর ধারে। শিশুকাল থেকেই গ্ৰামের পুজো এবং বিভিন্ন ধর্মীয় পরব দেখে বেড়ে ওঠা মমতার কাজে অনায়াসেই চলে আসে শিব, রাবণ, দুর্গা, কালীর গাথা। এ ছাড়াও যাত্রা, পালা গান, কীর্তনের সঙ্গে অন্তরঙ্গ পরিচয় ছিল। কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার সুযোগ তিনি পাননি। কিন্তু তাঁর কাজ দেখে বোঝা যায়, শিল্পীর মননে সাধারণ জীবনযাপন ছাপিয়ে অন্য কোনও বোধ কাজ করেছে।
মমতার ছবি দেখে মনে পড়ে ‘নাইভ আর্ট’-এর কথা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইউরোপে এসেছিলেন হেনরি রুশো, বিংশ শতাব্দীতে এলেন পল ক্লি। সালভাদোর দালি এলেন তারও পরে। ফ্রয়েড বলেছিলেন যে, ক্লাসিক্যাল ছবিতে তিনি অবচেতন মন খোঁজেন এবং সাররিয়ালিস্ট ছবিতে খোঁজেন সচেতনতা। সে কথা মনে রেখে দালির অসাধারণ সব ছবিতে সমালোচকরা সচেতনতা সন্ধান করে বেড়িয়েছেন। এর আগে জাপানে ইডো যুগে শিল্পীরা বৌদ্ধ ধর্মের গল্প, মানুষ এবং পশুর ছবি সহজ-সরল লোকশিল্পের প্রণালীতে তুলে ধরতেন। আমাদের দেশেও বিংশ শতকের প্রথমে সুনয়নী দেবীর নিজস্ব আঙ্গিকে আঁকা ছবি বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল। কিন্তু মমতা সে সব কিছু দেখেননি। কোনও আর্ট-ইজ়মের সঙ্গেই তাঁর পরিচয় নেই। তবু শিল্পীর ছবিতে যেটা প্রথমেই চোখে পড়ে, সেটা হচ্ছে ঠিকঠাক ড্রয়িং এবং পরিপ্রেক্ষিত বা পারস্পেকটিভের অভাব। আর সেখানেই তাঁর স্বকীয়তা। কারণ মমতার রঙের ব্যবহার দর্শককে ভাবায়।
একটি ছবিতে অত্যন্ত শিশুসুলভ আঙ্গিকে কালীকে দেখিয়েছেন মমতা। পিছনের পটভূমিতে বেশ অসমতল ভাবে নিকষ কালো রং। সামনের জমিতে ডাকিনী-যোগিনী বসে গল্প করছে। কালীর পা শিবের বুকে চাপানো। এই ছবিতে রঙের বিন্যাস এবং স্পেস বিভাজন অত্যন্ত আকর্ষক। অপর একটি ছবিতে দেখা যায় একটি কাঠের বাড়ির ছাদে ভূতের আবির্ভাব। সামনে সাধারণ এক দম্পতির গ্ৰাম্য জীবনযাত্রার ছবি। গাছে সবুজ পাতা, ফুল এবং পাখির আনাগোনা। পটভূমি এখানে চড়া গোলাপি, কিন্তু রঙের প্রাচুর্য এবং টোনের ব্যবহার প্রশংসনীয়। সহজাত এক শিল্পবোধের অদ্ভুত পরিচয়।
আর একটি ছবিতে শিব-দুর্গা তাঁদের চার সন্তানসহ নৌকায় মাতলা নদী পেরিয়ে যেন মর্ত্যে আসছেন। অন্য একটি যাত্রা-ধর্মী ছবিতে সেই একই ভাবে মানুষ মাতলা নদী পার করছে হইহই করে। মমতার সূক্ষ্ম নিরীক্ষণ বা ‘দেখার চোখ’টির সন্ধান পাওয়া যায় এখানে। ‘টাইগার অ্যাটাকস আ ম্যান ইন সুন্দরবন’-এ দৈনন্দিন জীবনে বাঘের উৎপাতের ত্রাসের ছবি। এ ধরনের অপর একটি ছবিতে জঙ্গলের অলৌকিকতা দেখিয়েছেন শিল্পী। ক’টি মেয়ে যেন বেড়াতে গিয়ে এক দিকে মুখোমুখি হল শিবের, অন্য দিকে বাঘের নরভক্ষণ আর রক্তলোভী ভূতপ্রেত। নিরাপত্তাহীনতার চিত্রের সঙ্গে শিব যেন ভরসার প্রতিচ্ছবি। জীবনের এই দ্বৈত চেহারাও মমতা অপরূপ সব রঙের মাধ্যমে এঁকেছেন। ‘গডেস অব ফরেস্ট’ ছবি আলপনাধর্মী। বনদেবীর পুজোর আয়োজনে সাপ, শামুক, শুঁয়োপোকা ছাড়াও রহস্যময় নানা কীটপতঙ্গের দেখা পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ‘ফ্লুট প্লেয়ার’-এ কৃষ্ণ, ‘তাণ্ডব’-এ শিব... ইত্যাদি বিগ্ৰহের ছবি প্রদর্শনীতে ছিল। রাবণের শিবপুজোয় শিব সশরীর উপস্থিত। খুব ভাল ছবি। এখানে মমতার কল্পনা, দূরদর্শিতা, চিত্রকল্প গঠনের ক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে। ‘কালী, পিপিং অ্যাজ় আ ভিলেজ লেডি’ ছবিতে কালী লুকিয়ে যেন মানুষের জীবনের সঙ্গী হতে চান।
কত সহজে জীবন ও পারিপার্শ্বিকের গল্প এঁকেছেন মমতা। এতে ওঁর স্বতঃস্ফূর্ততা, রং ব্যবহারের সহজাত ক্ষমতা, টোনের স্বকীয়তা এবং পরিণত কল্পনাশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। শিল্পরসিকেরা ভবিষ্যতে ওঁর আরও ছবি দেখার অপেক্ষায় থাকবেন।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে