Art Exhibition review

মধুর, তোমার শেষ যে না পাই

একবার এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে যোগেন চৌধুরী বলেছিলেন যে, সৌন্দর্যের কোনও সংজ্ঞা বা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নেই।

শমিতা বসু

শেষ আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৪
Share:

সুন্দরতমা: দেবভাষায় আয়োজিত যোগেন চৌধুরীর প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

সম্প্রতি শিল্পী যোগেন চৌধুরীর জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর রচনা সমগ্ৰের দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের সঙ্গে তাঁর একটি চিত্র প্রদর্শনীর‌ও আয়োজন করা হয়েছিল দেবভাষা, ব‌ই ও শিল্পের আবাসে।

যোগেন চৌধুরী সম্ভবত আমাদের দেশের একমাত্র শিল্পী যিনি তাঁর অগ্ৰজ, সমসাময়িক এবং অনুজ অনেক শিল্পীর কাজের মূল্যায়ন করে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। এর আগেও যখন তিনি বিদেশ থেকে ফিরে এক বছর ছবি আঁকতে পারেননি, সেই সময়কার শিল্পীমনের যত রকম দ্বন্দ্ব এবং সংশয় সেই সমস্ত তিনি নথিবদ্ধ করে রেখেছেন। এ যেন তাঁর চরম সাহসী স্বীকারোক্তি, যেখানে তিনি নিজের শিল্পীসত্তাকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন বিশ্ব দরবারে। অনবদ্য সেই সব লেখা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হবেন।

দেবভাষা-য় যে প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছিল, তার নাম ‘সুন্দরী’। একবার এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে যোগেন চৌধুরী বলেছিলেন যে, সৌন্দর্যের কোনও সংজ্ঞা বা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নেই। যেমন গোলাপ ফুলের সৌন্দর্য তার রঙে, না আকারে? যদি ব্যাখ্যা করে তার রং এবং পাপড়ির গড়নের কাছে পৌঁছনোও যায়, তবু কি নির্দিষ্ট করে বলা যায় গোলাপের সৌন্দর্য ঠিক কোথায়? গোলাপের গড়ন তো সূর্যমুখী ফুলের মতো সিমেট্রিকাল নয় একেবারেই। তবু সে সুন্দর। যোগেন চৌধুরী চিরকাল নারীর সৌন্দর্য দেখেছেন তার নিঁখুত রূপে নয়, বরং তার লাবণ্যে এবং মাধুর্যে। তাই তিনি বাংলার পটচিত্রের নারীর সুডৌল গড়নকে নিজের মতো করে এঁকেছেন সম্পূর্ণ এক মৌলিক ভাষ্যে। এখানে তিনি শিল্পপ্রেমী মানুষকে ২০২৫-এর ফসল হিসেবে ক্রেয়নে ২০টি ছবি উপহার দিলেন। নাম দিলেন ‘সুন্দরী’।

২০০০ সালে তিনি প্রথম ভেবেছিলেন যে, এত দিন স্কেচ খাতায় যে মূল অঙ্কন করে রেখে পরে তাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছেন আসল ছবিতে, তিনি আর সেটা না করে ছোট-বড় সব ড্রয়িংকেই ‘ছবি’ হিসেবে দেখে শেষ করবেন। শিল্পী তাঁর ২০০০ সালের নোটে লিখছেন, ‘নারী-পুরুষ উভয়ের শরীরকে দুমড়ে মুচড়ে যেমন ভাঙা যায় শিল্প সৃষ্টির প্রয়োজনে, এমনটা আর কিছুতে ঘটে না। তখন কত রূপ সে গ্ৰহণ করে এবং আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।’

ঠিক সেই ভাবেই ২৫ বছর পরে তিনি নারীর সৌন্দর্য এত দিন যেমনটি দেখেছেন নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর মনোনিবেশ করে, সেই ভাবেই গড়ে উঠেছে এক একটি ড্রয়িং, যেগুলো হয়ে উঠেছে ২০টি পূর্ণাঙ্গ ছবি। এক সময়ে পটচিত্রের নারীর অবয়বকে নিজস্ব এক ভাষ্য দান করেছিলেন তিনি, এ বার যেন সেই নারীকে এক অক্লান্ত আগুন হিসেবে দেখলেন শিল্পী। তার নিবিড় কালো চুলের অন্ধকারে বিদিশার নিশা চোখে পড়ল কখনও, অথবা মুখে তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য খুঁজে পেলেন শিল্পী। এর বিচার করবেন শিল্পরসিকরা।

একটি ছবিতে যেমন মধ্যবয়সি মহিলার পার্শ্বমুখে বিস্ময় দেখিয়েছেন। ক্রেয়নের ড্রয়িং। আপাতদৃষ্টিতে সে সুন্দরী হয়তো নয়, কিন্তু শিল্পীর চোখে তার ব্যক্তিত্বের নির্যাসটি ধরা পড়েছে।

আর একটিতে এক তরুণীর সযত্ন আঁচড়ে রাখা চুলের ফ্রেমে লাবণ্যময় এক সুন্দর মুখের ছবি। শুধুমাত্র একটা ক্রেয়নে করা কাজ।

আরও এক সুন্দরী, চুলে তার বড় বাহার। কিছুটা চুল মুক্ত, আবার কিছু চুল খোঁপায় আবদ্ধ। চোখে তার লীলায়িত ছায়া। ‘নয়নে তোমার অমর প্রাণের লাস্য’... সুধীন দত্তের লাইন মনে করায়।‌

আর একটি মুখে কোনও কারুকার্য নেই। এক অবিচ্ছিন্ন লাইনে সম্পন্ন করেছেন ড্রয়িং। কিন্তু চোখে তার মাতৃরূপ। সে যেন যুবতী এক মা এবং সেই সঙ্গে সাধ্বী স্ত্রী।

অপর একটি তরুণীর মুখের চারধারে কোঁকড়ানো চুল এবং চোখে অমান্য করা চ্যালেঞ্জ বা আহ্বান। যেন মন দিয়ে কারও কথা শুনলেও মতের অমিল হচ্ছে। সে নিজের মতামত ব্যক্ত করতে সক্ষম।

এ বার একটি ছবিতে দেখা গেল মাঝবয়সি এক রমণীর মুখাবয়ব। তিনি যেন নিজের বয়স অগ্ৰাহ্য-করা অলঙ্কারে ভূষিত, বক্ষ উন্মোচিত এক সুন্দরী। তার চুলের নকশা লক্ষণীয়। সে যেন সম্ভোগের জন্য শরীর সমর্পণ করতে উদ্যোগী।

আর এক সুন্দরীর মুখের তিন-চতুর্থাংশে মনে হয় তিনি যেন সংসারের অভিজ্ঞতার ভারে হারিয়েছেন সারল্য। দক্ষ একটি মুখের মধ্যে জ্ঞানী দু’টি চোখ।

আর এক সুন্দরীর পার্শ্বমুখে শুধুই সামান্য কৌতুক ভরা দু’টি চোখ। এ যেন সব নিতে চায়, আবার দিতেও সক্ষম। বিকশিত একটি গোলাপের মতো।

এর পরের প্রৌঢ় মহিলা আবার সংসারের ভারে বিপর্যস্ত এবং চিন্তান্বিত। এ বারের সুন্দরী তার ভাবে-ভঙ্গিতে পূর্বরাগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঠোঁটে সামান্য হাসি, চোখে নিবেদনের আগ্ৰহ এবং কৌতূহল।

এই ভাবে ২০টি ছবিতে শিল্পী আলাদা সব অভিব্যক্তি দেখিয়েছেন রমণীর অতনু আঁখিতে, ঠোঁটের কম্পনে, সাধ্বীর সততায়, কুঞ্চিত কুন্তলের কারুকার্যে। শিল্পীর প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের সেই পঙ্‌ক্তি মনে পড়ে— ‘আর তুমি ছিলে, তোমার মুখের রূপ কত শত শতাব্দী আমি দেখি না, খুঁজি না।’ কিন্তু শিল্পী যোগেন চৌধুরী খুঁজেছেন এবং নারীর মধ্যে এক অপরূপ সৌন্দর্যের ভাণ্ডার আবিষ্কার করেছেন।

তাঁর ছবিতে অবলুপ্ত সৌন্দর্যের চরম প্রকাশ ঘটেছে। ক্রেয়নের নরম ছোঁয়ায় শিল্পী যোগেন চৌধুরীর কাছ থেকে ২০টি অপরূপ ছবি উপহার পেলেন দর্শক ও শিল্পপ্রেমীরা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন