Art Exhibition

প্রকৃতির অলঙ্কারে আত্ম-অন্বেষণ

বিদেশ থেকে স্বামীর আনা রঙের উপহার তাঁর জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

পিয়ালী গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০৯
Share:

চারুবাসনা গ্যালারিতে আয়োজিত মহুয়া ভট্টাচার্যের সাম্প্রতিক প্রদর্শনীতে প্রবেশ করলেই প্রথম যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়, তা দৃশ্যের নয়, পৃষ্ঠের। ছবিগুলিতে নিবিড় ভাবে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য বিন্দু ধীরে ধীরে এক আবহ নির্মাণ করে, যেন দেখার আগেই অনুভবের সূচনা। এই বিন্দুমালার ভিতর দিয়েই দর্শকের সামনে উন্মোচিত হয় এক স্বতন্ত্র চিত্রভাষা। প্রায় তিরিশটি কাজ নিয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে শিল্পী নির্মাণ করেছেন প্রকৃতি, স্মৃতি ও অলঙ্কারের এক অন্তর্মুখী জগৎ। শিল্পজীবনের সূচনা অপেক্ষাকৃত দেরিতে হলেও, শিল্পী মহুয়ার সাধনার গভীরতা ও আত্মবিশ্বাস এই প্রদর্শনীতে স্পষ্ট ভাবে প্রতিভাত।

মহুয়া ভট্টাচার্যের শিল্পজীবনের পটভূমি নিজেই এক নির্মাণপর্ব। একটি যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা— যেখানে তাঁর মা সংসারের দায়িত্ব সামলেও পড়াশোনা ও চিত্রচর্চা চালিয়ে গিয়েছেন। সেই দৃশ্যই তাঁর শিল্পমানসে প্রথম বীজ বপন করে। ছোটবেলার আঁকা ছবি বাবার হাতে বাঁধানো হয়ে ফিরে আসা সেই বীজকে আরও দৃঢ় করে। যদিও পরবর্তীতে তিনি সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। ১৯৭৬ সালে অডিয়ো মাধ্যমে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ফলত দীর্ঘ সময় ধরে চিত্রকলার সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিল না।

বিদেশ থেকে স্বামীর আনা রঙের উপহার তাঁর জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। মূলত স্বশিক্ষিত শিল্পী হলেও, শিল্প-ঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা তাঁকে অন্যান্য শিল্পীর সংস্পর্শে নিয়ে আসে। নিত্য কুণ্ডুর কাছে প্রাথমিক শিক্ষালাভ এবং ‘নিজস্ব স্টাইল’ খুঁজে পাওয়ার উৎসাহ তাঁর শিল্পীসত্তার দিক নির্দেশ করে। পরবর্তীতে পার্থপ্রতিম দেবের স্বীকৃতি তাঁকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং তাঁরই উদ্যোগে ২০১২ সালে ‘দ্য গ্রুপ’-এ অন্তর্ভুক্তি শিল্পজগতে তাঁর অবস্থানকে সুদৃঢ় করে। পাশাপাশি শ্যামশ্রী বসুর কাছ থেকে ফুলকেন্দ্রিক কাজের অনুপ্রেরণা এবং সমরেশ চৌধুরীর সংস্পর্শ তাঁর চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

এই প্রদর্শনীর কাজগুলিতে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে ডট বা বিন্দুর সুসংহত ব্যবহার। ছোট-বড় অসংখ্য বিন্দুর বিন্যাসে তৈরি হয় অলঙ্কারময় প্যাটার্ন, যা একই সঙ্গে ছন্দোময় ও ধ্যানমগ্ন। প্রথম দর্শনে এই বিন্যাস অস্ট্রেলীয় অ্যাবরিজিনাল ডট পেন্টিংয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার কোথাও তার সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায় জর্জ সুরা ও পল সিন্যাকের পয়েন্টিলিজ়মে। কিন্তু মহুয়ার ক্ষেত্রে এই প্রভাব অনুকরণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা, প্রকৃতিপ্রীতি ও অন্তর্মুখী ভাবনার সঙ্গে মিশে গিয়ে এক স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণ করেছে।

প্রদর্শনীর কয়েকটি কাজ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘অফারিং’-এ অলঙ্কারময় এক হাত ফুলের দিকে এগিয়ে যায়— যেন প্রকৃতির প্রতি এক নীরব নিবেদন। নীল ও ধূসর টোনের আবহে গোলাপি ফুলের উদ্ভাস ছবিতে এক সংযত দীপ্তি আনে। ডটের ঘনত্ব ও বিন্যাস ছবির গভীরতাকে এমন ভাবে নির্মাণ করে যে, দর্শক ধীরে ধীরে ছবির অন্তর্গত স্তরে প্রবেশ করে। ‘কম্পোজ়িশন ওয়ান’ কাজটিতে প্রায় মণ্ডলসদৃশ একটি বিন্যাস দেখা যায়, যেখানে পাখির মোটিফ কেন্দ্রকে ঘিরে জ্যামিতিক ভারসাম্য তৈরি করেছে। হলুদ, নীল ও কালোর সমন্বয়ে নির্মিত এই কাজটি অলঙ্কার ও কাঠামোর এক সুনিপুণ সমাবেশ— যেখানে প্রকৃতি ও নকশা পরস্পরের ভিতরে বিলীন।

অন্য দিকে ‘ফরেস্ট’ ছবিতে শিল্পী এক ভিন্ন মেজাজ সৃষ্টি করেছেন। সবুজ ও নীলের মৃদু স্তরবিন্যাস, গাছের কাণ্ড ও পাতার ভিতরে বিন্দুর সূক্ষ্ম বুনন— সব মিলিয়ে এটি যেন প্রকৃতির এক অন্তর্লীন সঙ্গীত। আবার ‘বার্ড অব প্যারাডাইস’-এ উজ্জ্বল হলুদ পটভূমির মধ্যে সবুজ গাছ ও পাখির উপস্থিতি এক উচ্ছল প্রাণশক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এখানে প্রকৃতি শুধু দৃশ্য নয়, এক সজীব, স্পন্দিত সত্তা।

মহুয়ার কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, তাঁর প্রক্রিয়া। প্রচলিত ব্রাশের ব্যবহার কমিয়ে তিনি দেশলাই কাঠি, টুথপিক বা পেনের মাধ্যমে সূক্ষ্ম কারুকার্য গড়ে তোলেন। এই শ্রমসাধ্য পদ্ধতি তাঁর ছবিতে এক বিশেষ টেক্সচার ও স্পর্শানুভূতি তৈরি করে। প্রতিটি কাজের আগে খাতায় ছোট আকারে কম্পোজ়িশন নির্মাণ তাঁর পরিকল্পনাকে সুসংহত করে।

লোকশিল্পের প্রতি তাঁর আকর্ষণও উল্লেখযোগ্য। মধ্যপ্রদেশের গোঁদ শিল্প এবং অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবরিজিনাল আর্টের সরলতা ও প্রতীকী ভাষা তাঁর চিত্রভাষায় প্রভাব ফেললেও, তিনি সেগুলিকে নিজস্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে এক নতুন ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করেন। ফলে তাঁর কাজ নিছক অনুকরণে পর্যবসিত হয় না।

সব মিলিয়ে, এই প্রদর্শনীতে মহুয়ার শিল্প এক নীরব আত্মান্বেষণের দিকেই ইঙ্গিত করে। তাঁর কাজে কোনও অস্থিরতা, অতিরঞ্জন নেই। অলঙ্কারময় প্যাটার্নের মধ্য দিয়ে যে জগৎ তিনি নির্মাণ করেন, তা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত এবং সর্বজনীন। সূচনা দেরিতে হলেও, মহুয়া তাঁর নিজস্ব ভাষা খুঁজে পেয়েছেন এবং তা ক্রমাগত পরিশীলিত করে চলেছেন। এই প্রদর্শনী নিঃসন্দেহে সেই যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।


আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন