অর্ডার দেওয়ার পর থেকে ৩০ মিনিট অপেক্ষা। তার ব্যতিক্রম হলে পিৎজ়ার জন্য টাকা দিতে হবে না গ্রাহককে। অর্ডার পাওয়ার আধ ঘণ্টায় পিৎজ়া বাড়ির দরজায় পৌঁছে যাবে, এমনই একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের নজর কেড়েছিল বিখ্যাত এক পিৎজ়া প্রস্তুতকারী সংস্থা।
ভারতে ওই সংস্থার ব্যবসায়িক সাফল্যের নেপথ্যে ‘৩০ মিনিট’ স্লোগানটি একটি বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছিল। বিজ্ঞাপনী কৌশলটি ভারতে তাদের ব্যবসার মডেলকে আমূল বদলে দিয়েছিল। এ দেশ ধুঁকতে থাকা পিৎজ়া ব্যবসাকে দিয়েছিল নতুন দিশা।
পিৎজ়ার অর্ডার দিলে তা আধ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে। এর বেশি সময় লাগলে খাবারটি বিনামূল্যে পেতে পারেন গ্রাহক। তবে এর জন্য কিছু শর্ত প্রযোজ্য।
একসময় ভারতে পিৎজ়া ডেলিভারি মানেই ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা। যদিও তখনও ঘরে ঘরে সান্ধ্য জলখাবার বা রাতের খাবারের বিকল্প হয়ে ওঠেনি পিৎজ়া। পার্টি বা অনুষ্ঠানের দিনগুলিতেই সীমাবদ্ধ ছিল ইতালীয় এই খাবারটি। মধ্যবিত্তের বসার ঘরেও তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি পিৎজ়া।
মনে করা হয় এরাই ভারতের প্রথম সংস্থা যারা সময়ের গুরুত্ব দিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করাতে পেরেছিল। ৩০ মিনিটে খাবার আসবেই— এই নিশ্চয়তা মানুষকে অলস সময়ে বা চটপট খাবারের প্রয়োজনে ওই সংস্থাকে বেছে নিতে বাধ্য করে। এমনিতেই এখন মানুষের হাতে সময় কম। তার উপর খিদে পেলে অপেক্ষা করতে পারেন না অনেকেই।
গ্রাহকদের এই তাড়াহুড়োকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায় বাজিমাত করে বিখ্যাত ওই আমেরিকান পিৎজ়া রেস্তরাঁ চেনটি। তা-ও আবার এমন এক সময়, যখন এ দেশে পিৎজ়া ব্যবসা একেবারেই ভাল চলছিল না। ক্রেতাকে আধ ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা না করানোই হল তাদের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ও ডেলিভারি কৌশল। ভারতে সংস্থাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছোতে এই একটি সাহসী সিদ্ধান্ত সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিল।
পিৎজ়ার জগতে বিখ্যাত এই সংস্থা। দেশ জুড়ে প্রায় ১০০০টিরও বেশি শাখা রয়েছে তাদের। ১৯৯৬ সালে ভারতে ব্যবসা শুরু করে সংস্থা। নয়াদিল্লিতে তাদের প্রথম পিৎজ়া আউটলেটটি চালু হয়েছিল।
প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য সংস্থা তাদের আউটলেটের অবস্থান এবং রান্নাঘরের ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনে। ৩০ মিনিটের ডেলিভারি মডেলটি শুধু একটি বিপণন কৌশল ছিল না। এর সাফল্যের নেপথ্যে আরও কিছু গভীর কৌশল কাজ করেছিল।
৩০ মিনিটের ডেলিভারির এই ‘যুদ্ধ’ রাস্তায় নয়, রান্নাঘরেই জিতেছিল সংস্থা। রান্নাঘরের স্ক্রিনে অর্ডার ভেসে আসার সঙ্গে সঙ্গে রুটি বেলে, সস মাখিয়ে এবং তার উপর নির্দিষ্ট টপিং-সহ চিজ় ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে লেগে পড়েন পিৎজ়া প্রস্তুতকারক। এই পুরো প্রক্রিয়াটি মাত্র ৪ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়।
রান্না করতে আরও ৬ মিনিট সময় লাগে। এর পর ডেলিভারির অর্ডারটি রাউটিং টেবিলে চলে আসে। এখানকার ৬-৭ জন কর্মী পিৎজ়াগুলি ডেলিভারি বাক্সে প্যাক করেন। এগুলি ‘ওয়ার্ম ব্যাগ’ নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়ায় আরও ৫ মিনিট সময় লাগে। এর পর আসে ডেলিভারি, যাতে সাধারণত ৮ মিনিটের বেশি সময় লাগে না। এর পরেও হাতে থাকে ৭ মিনিট।
সংস্থার ভিতরে একটি অলিখিত নিয়ম চালু আছে। সেটি ৪-৬-৫-৮ নিয়ম। কী ভাবে কাজ করে এই নিয়ম? ৪ মিনিট (অর্ডার করে অভেনে দেওয়া), ৬ মিনিট (অভেনে রান্না করা), ৫ মিনিট (কাটা, প্যাকিং, সংগ্রহ) এবং সবশেষে ৮ মিনিট (ডেলিভারি) অর্থাৎ মোট ২৩ মিনিট লাগে অর্ডার করা থেকে খাবার পৌঁছে যেতে। অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির কারণে সংস্থাটি তাদের কর্মীদের জন্য বাকি ৭ মিনিট অতিরিক্ত বরাদ্দ করে রেখেছে। এই নিখুঁত সময় ব্যবস্থাপনাই তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
তাদের মেনু এমন ভাবে নকশা করা হয়, যাতে পিৎজ়া তৈরিতে খুব বেশি সময় না লাগে। ময়দার তাল আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে। টপিংসগুলি এমন ভাবে কাটা থাকে যা দ্রুত ছড়ানো যায়। সব পিৎজ়া একই তাপমাত্রায় তৈরি হয়। ফলে বার বার অভেনের তাপমাত্রা বাড়াতে বা কমাতে হয় না।
সংস্থা এমন ভাবে তাদের স্টোরগুলি খোলে, যাতে প্রতিটি স্টোর থেকে ডেলিভারি এলাকা স্বল্প দূরত্বের (সাধারণত ৩-৪ কিমি ব্যাসার্ধ) হয়। পিৎজ়া তৈরির সময় কমিয়ে কখনও ৭-৮ মিনিটে নিয়ে আসা হয়, যাতে ডেলিভারি কর্মীর হাতে একটু বেশি সময় থাকে।
কোন পথে গেলে যানজট কম হবে, কোন এলাকা থেকে কত অর্ডার আসতে পারে— এই সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সংস্থা ডেলিভারির সময় নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের অ্যাপ এবং ট্র্যাকিং ব্যবস্থা গ্রাহকদের পিৎজ়ার অবস্থান দেখার সুযোগ দিয়ে এক ধরনের উৎসাহ তৈরি করে।
অন্যান্য ফুড চেন যখন ডাইনিং বা রেস্তরাঁর ভিতরের সাজসজ্জায় নজর দিচ্ছিল, ওই সংস্থা তখন ‘ডেলিভারি এক্সপার্ট’ হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে। প্রতিযোগীরা আসার আগেই তারা বাজারের একটি বিশাল অংশ দখল করে নেয়।
যে কোনও জিনিস বিনামূল্যে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরকাল। যদি ডেলিভারি দেরিও হত, গ্রাহক খুশি হতেন এই ভেবে যে তিনি বিনামূল্যে খাবার পাচ্ছেন। আবার অনেক সময় দেরি হলে ডেলিভারিকর্মীরা স্বেচ্ছায় বিনামূল্যে পিৎজ়া দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও অনেক গ্রাহক অপরাধবোধে ভুগে তা প্রত্যাখ্যান করতেন। তবে পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সংস্থার ৯৯ শতাংশ ডেলিভারিই সময়ের মধ্যে সফল হয়।
২০২২ সালে আধ ঘণ্টা নয়, বরাত দেওয়ার মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে খাবার পৌঁছে দেওয়ার পরিষেবা চালু করে সংস্থা। আরও ১০ মিনিট কমিয়ে ২০ মিনিটের মধ্যে খাবার পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ওই পিৎজ়া প্রস্তুতকারী সংস্থা। ক্রেতাদের চাহিদা দেখে ৩০ মিনিট থেকে সরবরাহের সময় কমিয়ে ২০ মিনিট করা হয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি।
সংস্থার দাবি, তারা সরবরাহ কর্মীদের কখনওই ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটারের গতিসীমা অতিক্রম করার অনুমতি দেয় না। তা ছাড়া দেরিতে ডেলিভারির জন্য কর্মীদের জরিমানাও করা হয় না। ভারী বৃষ্টি বা দুর্যোগের সময় এই ৩০ মিনিটের শর্ত শিথিল করে দেওয়া হয়। এমনকি কোনও গ্রাহক যদি একসঙ্গে একাধিক পিৎজ়া অর্ডার করেন, তবে ৩০ মিনিটে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয় না সংস্থা।