ঝাঁ-চকচকে আধুনিক শহর বাণিজ্যনগরী মুম্বইয়ের শরীরেও রয়েছে কিছুটা দাগছোপ। হাজার রূপটানেও ঢেকে রাখা যায়নি সেই দুর্দশার চেহারা। ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা ড্যানি বয়েলের ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’-এ ধরা পড়েছিল মোহময়ী নগরীর সেই দিকটি। দেখা গিয়েছিল, বস্তির গোলকধাঁধার মধ্যে দিয়ে আবর্জনা, বর্জ্য এবং রেললাইনের পাশ কাটিয়ে খালি পায়ে ছুটে চলেছে দুই শিশু।
অস্কার বিজয়ী সিনেমার দুই শিশুশিল্পীকে খুঁজে বার করা হয়েছিল বান্দ্রার ‘গরিব’ নগরী থেকেই। বাণিজ্যনগরীর সবচেয়ে আলোকিত, বর্ণময় বান্দ্রা অঞ্চলেই রয়েছে মুম্বইয়ে ভাগ্যের ভোল বদলাতে আসা শয়ে শয়ে গরিবগুর্বোদের মাথা গোঁজার ঠাঁই। বহু ক্ষেত্রেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গজিয়ে উঠেছিল বস্তিগুলি।
রেলের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য এই ‘গরিব’ নগরীতেই গত সপ্তাহে ঢুকেছে বুলডোজ়ার। পশ্চিম রেলের চোখে আইনসম্মত বলে বিবেচিত ১০০টি ঘর ছাড়া বাকি সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ বান্দ্রা স্টেশনের আশপাশে ৫,২০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত প্রায় ৫০০টি ঘরবাড়ি ও দোকান সরিয়ে দিয়েছে। জমিটি অবশ্য বরাবরই পশ্চিম রেলের মালিকানাধীন।
১৯৮০ সাল থেকেই রেল বার বারই এই জমিটি নিজেদের দখলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। সেই সময় এই উচ্ছেদ অভিযান রুখে দিয়েছিলেন এক বলিউড তারকা। আজ যখন বুলডোজ়ারের আঘাতে ধূলিসাৎ হয়েছে ‘গরিব’ নগরী, তখন সেখানকার বাসিন্দাদের মুখে উচ্চারিত হয়নি কোনও নেতার নাম। তাঁরা শুধু মনে করেছিলেন তাঁদের রক্ষকের নাম। অভিনেতা, সাংসদ ও বান্দ্রার গরিবদের ‘ভগবান’ সুনীল দত্তের অভাবটা টের পাচ্ছিলেন ভিটে হারানো মানুষগুলি।
১৯৮০ সাল থেকে বান্দ্রার এই খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষগুলির কাছে সুনীল ছিলেন বটগাছের মতো। বান্দ্রার বস্তিবাসীদের কাছে তাঁর পরিচয় ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি ছিলেন পাঁচ বারের কংগ্রেস সাংসদ, যিনি রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব না কষেই শহরের সবচেয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এমনকি অনেক সময় নিজের রাজনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি নিয়েও তাঁদের স্বার্থ রক্ষায় আপসহীন ভূমিকা পালন করেছিলেন।
১৯৮৪ সালে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন। মুম্বই উত্তর-পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্র থেকে একাধিক বার জনপ্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত হন বলিউডের এই নায়ক। তারকা হয়েও মাটির কাছাকাছি নেমে এসে জনসংযোগ তৈরি করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি তিনি। বস্তিবাসীদের প্রতি তাঁর সমর্থন শুধুমাত্র নির্বাচনী রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী বস্তি সুরক্ষার জন্য উচ্ছেদ অভিযানের স্থগিত রাখার সময়সীমা প্রথমে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এবং পরে আরও বাড়ানোর দাবিতে সক্রিয় ভাবে সওয়াল করেছিলেন সুনীল। সমর্থকদের দাবি, এর ফলে মুম্বইয়ের লক্ষ লক্ষ বস্তিবাসী উচ্ছেদের ঝুঁকি থেকে আইনি সুরক্ষা পান।
বস্তি উচ্ছেদ রুখতে সুনীল প্রায়ই আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকতেন। সূত্র অনুযায়ী, তিনি কখনও বুলডোজ়ারের সামনে দাঁড়িয়ে, আবার কখনও ভারী উচ্ছেদকারী যন্ত্রের সামনে শুয়ে পড়ে ভাঙার কাজ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। শুধু তাই নয়, বস্তি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তিনি জেলা কালেক্টরের দফতর পর্যন্ত মিছিলের নেতৃত্বও দিয়েছিলেন।
সুনীল ব্যক্তিগত ভাবে সনিয়া গান্ধীকে রাজি করিয়েছিলেন, যাতে তিনি মহারাষ্ট্রের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিলাসরাও দেশমুখকে মুম্বইয়ের বস্তিগুলোতে বুলডোজ়ার চালানো বন্ধ করার নির্দেশ দেন। দরিদ্রদের মধ্যে, বিশেষ করে ভিন্রাজ্য থেকে আসা বস্তিবাসীদের কাছে অভিভাবকের মতো হয়ে উঠেছিলেন সুনীল।
১৯৮০-এর দশকে যখন তিনি কংগ্রেসের হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, তখন মুম্বই দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। কাপড়ের কলগুলির ব্যবসা একে একে ধসে পড়ছিল। শহরে অভিবাসন বাড়ছিল এবং জমির দাম আকাশছোঁয়া হচ্ছিল। দক্ষিণ মুম্বইয়ের তুলনায় বান্দ্রা, খার, সান্তাক্রুজ় ও কুরলার মতো মফস্সল শহরে সস্তায় বাসস্থান খুঁজে থাকতে শুরু করেন ভিন্রাজ্যের বাসিন্দারা। শহরতলি এলাকায় বস্তি বাড়তে শুরু করে।
১৯৮১ সালে সুনীলের স্ত্রী নার্গিস মারা যান। স্ত্রীর স্মৃতিতে, সুনীল বান্দ্রার কাছে একটি বস্তি এলাকার নামকরণ করেন, নার্গিস দত্ত নগর। শোকাহত স্বামীর এই পদক্ষেপ ছিল একেবারেই ব্যক্তিগত উদ্যোগ। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে, এই বস্তিটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি প্রসারিত হয়ে পড়ে। এটি মুম্বইয়ের অন্যতম রাজনৈতিক ভাবে সংবেদনশীল সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
১৯৯৪ সালে মাত্র ৪০টি ঝুপড়ি ঘর নিয়ে নার্গিস দত্ত নগরের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ২০১৩ সাল নাগাদ এটি বান্দ্রা দমকলকেন্দ্র থেকে শুরু করে লীলাবতী হাসপাতালের কাছের রঙ্গশারদা হোটেল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যায়। ২০১৩ সালে একটি সর্বভারতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে নার্গিস দত্ত নগরের পিছনে বান্দ্রা রিক্লেমেশনের কাছে প্রায় ৩০০টি অবৈধ ঝুপড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছিল এবং মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যেই সেগুলি পুনর্নির্মাণ করা হয়।
সুনীলের গরিব বস্তিবাসীদের প্রতি পক্ষপাতিত্বকে ভাল চোখ দেখেননি মুম্বইয়ের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজ। হরতলির মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বাসিন্দাদের একাংশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ জমা হচ্ছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বহু বাসিন্দার অভিযোগ ছিল যে তাঁদের আবাসন থেকে এক দিকে আরব সাগরের মনোরম দৃশ্য দেখা গেলেও, অন্য দিকে আশপাশে বিস্তৃত বস্তি এলাকাগুলি নগর পরিকল্পনা ও সৌন্দর্যায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নাগরিক সংগঠনগুলি সুনীলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল যে তিনি অবৈধ দখল, গণপরিসরের বিলুপ্তি এবং নাগরিক পরিকাঠামোর অবনতিকে উপেক্ষা করে প্রায় একচেটিয়া ভাবে বস্তিবাসীদের উপরই মনোযোগ দিয়েছেন।
যদিও এই সমস্ত সমালোচনা কানে তুলতে নারাজ ছিলেন সুনীল। বান্দ্রা-খার-জুহু অঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ ছিল, তিনি করদাতা নাগরিকদের অভাব-অভিযোগ শোনার সময় কানে তুলো গুঁজতেন ও চোখে ঠুলি পরে বসে থাকতেন। এর প্রভাব পড়েছিল সুনীলের ভোটব্যাঙ্কেও।
২০০৪ সালে টানা পঞ্চম বারের মতো মুম্বই উত্তর-পশ্চিম আসনে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও ‘মাদার ইন্ডিয়া’র অভিনেতার জয়ের ব্যবধান অর্ধেকে নেমে আসে। ১৯৯৯ সালের ৮৫,৫০০ ভোট থেকে কমে ২০০৪ সালে মাত্র ৪৭,০০০ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন বলিউড তারকা। এর পর ২০০৫ সালে তিনি মারা যান।
সুনীলের মৃত্যুর পর, তাঁর কন্যা প্রিয়া দত্ত বস্তি এলাকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে, বিশেষ করে বান্দ্রা পূর্ব ও সংলগ্ন এলাকার মুসলিম এবং নিম্ন আয়ের ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন ধরে রেখেছিলেন। তাঁর বাবার মতো তিনিও প্রায়শই নিজেকে পুনর্বাসন ও জনকল্যাণকারী সাংসদ হিসাবে তুলে ধরতেন।
বস্তিবাসীদের স্বার্থরক্ষার মূল্য দিতে হয়েছে মুম্বইকেই। জুহু, বান্দ্রার অধিকাংশ অধিবাসীই এই অভিযোগ তোলেন। বান্দ্রা রেললাইনের পাশে থাকা এই বস্তিটি কয়েক দশক ধরে একটি ঘন শহুরে গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছিল। ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ড ঘটত। যাতায়াতের রাস্তা সঙ্কীর্ণ। অবশেষে বম্বে হাই কোর্টের নির্দেশে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন।
মাথার ছাদ হারিয়ে তাই আজ সুনীলের অভাব অনুভব করছেন বাসিন্দারা। ১৯৮১ সাল থেকে গরিব নগরে বসবাসকারী এক বাসিন্দার কথায়, ‘‘আজ যদি সুনীল দত্ত এখানে থাকতেন, তা হলে কেউ আমাদের ছুঁতে বা এখান থেকে সরাতে পারত না।”