Khan Sir Controversy

গ্রেফতারির আশঙ্কা, মানহানির মামলা থেকে ব্যবসায় ক্ষতি! ধসে যাবে খান স্যরের কোচিং সাম্রাজ্য? কেজিএসের ভবিষ্যৎ কী?

গ্রেফতারি থেকে সাময়িক স্বস্তি পেলেও দেশ জুড়ে খ্যাতি পাওয়া খান স্যরের জন্য সময়টা বেশ কঠিন। বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, মামলা আরও গড়ালে তাঁর বিশাল কোচিং ব্যবসার ওপর গুরুতর প্রশাসনিক, পরিচালনগত এবং ব্যবসায়িক প্রভাব পড়তে পারে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১০ জুন ২০২৬ ১৭:১৬
Share:
০১ ২০

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে জনপ্রিয় শিক্ষক ফয়জ়ল খান, যিনি ‘খান স্যর’ নামেই অধিক পরিচিত। পটনায় তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘খান গ্লোবাল স্টাডিজ়’ (কেজিএস) এবং একটি প্রতিদ্বন্দ্বী কোচিং সেন্টারের মধ্যে গত ২ জুন ঘটা এক হিংসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

০২ ২০

কেজিএসের সঙ্গে বিতর্কে জড়ানো কোচিং সেন্টারটির নাম জ্ঞান বিন্দু জিএস অ্যাকাডেমি। সেখানে পড়ান অন্য এক জনপ্রিয় শিক্ষক রোশন আনন্দ। বিহারের পটনায় দুই কোচিং সেন্টারের মধ্যে অশান্তির ছ’দিন পরেও বিতর্ক প্রশমিত হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। বিবাদের জল বহু দূর গড়িয়েছে।

Advertisement
০৩ ২০

পটনার কিসান কোল্ড স্টোরেজ এলাকা বিহারের কোচিং হাব। মুসল্লপুরে এই কিসান কোল্ড স্টোরেজ এলাকায় ২০১৮-১৯ সাল থেকে ২০টিরও বেশি কোচিং সেন্টার চলছে। এখানেই রয়েছে খান এবং রোশন স্যরের কোচিং সেন্টার। কোভিডের সময় বেশ কয়েকটি কোচিং সেন্টার বন্ধ হলেও খান এবং রোশন স্যরের কোচিং সেন্টার রমরমিয়ে চলছিল। তবে এই দু’জনের গন্ডগোলের সূত্রপাত হঠাৎ করে হয়নি। গত তিন-চার বছর ধরেই দুই স্যরের মধ্যে টানাপড়েন চলছিল বলে স্থানীয় সূত্রে খবর।

০৪ ২০

এর মধ্যেই গত ২ জুন ১৫-২০ জন ব্যক্তি খান স্যরের কোচিং সেন্টারে ভাঙচুর চালান বলে অভিযোগ। ইট, পাথর ছোড়া হয় বলেও দাবি। সে ঘটনাকে ঘিরে হুলস্থুল পড়ে যায় গোটা পটনায়। হামলার পরদিন খান স্যরের কোচিং সেন্টারের দুই রক্ষীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে। আগ্নেয়াস্ত্রগুলি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। সেগুলি ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। একটি এফআইআর দায়ের হয় কদমকুঁয়া থানায়। খান স্যরের অভিযোগ, তাঁর কোচিং সেন্টারে হামলা চালিয়েছেন ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ রোশন আনন্দ।

০৫ ২০

কোচিং সেন্টারের বাইরে গুলি চলার ঘটনায় গ্রেফতারি থেকে আপাতত স্বস্তি পেয়েছেন খান স্যর। মঙ্গলবার পটনা জেলা আদালত নির্দেশ দিয়েছে, তাঁকে গ্রেফতার করা যাবে না। মঙ্গলবার পটনার জেলা আদালতে মামলার শুনানি হয়। গ্রেফতারি রুখতে আগাম জামিনের আবেদন করে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন খান স্যর। তার পরই তাঁর অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচের আবেদন মঞ্জুর করেছে আদালত।

০৬ ২০

স্বস্তি দিলেও আদালত নির্দেশ দিয়েছে, তদন্তকারীদের সব রকম ভাবে সহযোগিতা করতে হবে খান স্যরকে। তাঁকে গ্রেফতার করা যাবে না ঠিকই, কিন্তু তদন্তকারীরা জেরা করতে পারবেন। খান স্যরের বিরুদ্ধে বলপূর্বক কোনও পদক্ষেপ করা যাবে না বলে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সূত্রের খবর, শুনানির সময় আদালত পুলিশকে নির্দেশ দেয় যে, এই ঘটনার কেস ডায়েরি এবং তথ্যপ্রমাণ আদালতে পেশ করতে হবে। খান স্যরকে রক্ষাকবচ দিলেও তাঁর ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ কোচিং সেন্টারের মালিক তথা এই মামলার অন্য অভিযুক্ত রোশন আনন্দের জামিন হবে কি না, সে বিষয়ে রায়দান স্থগিত রেখেছে আদালত।

০৭ ২০

গ্রেফতারি থেকে সাময়িক স্বস্তি পেলেও দেশ জুড়ে খ্যাতি পাওয়া খান স্যরের জন্য সময়টা কঠিন। বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, মামলা আরও গড়ালে তাঁর বিশাল কোচিং ব্যবসার ওপর গুরুতর প্রশাসনিক, পরিচালনগত এবং ব্যবসায়িক প্রভাব পড়তে পারে। তা হলে কি খান স্যরের কোচিং সাম্রাজ্য ধসে পড়বে? এখন এই প্রশ্নই ঘোরাফেরা করছে পটনার কোচিং জগতের অলিন্দে।

০৮ ২০

আইনি জটিলতা তৈরি হলে কোন কোন সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে খান স্যরকে? জননিরাপত্তার বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর এক্তিয়ারভুক্ত। হিংসার ঘটনার পর ডিআইজি মনোজ কুমার সতর্কবার্তা দিয়েছেন, কোনও কোচিং সেন্টার যদি গ্যাং-কেন্দ্রিক বিরোধ বা সংঘাতের আখড়ায় পরিণত হয়, তবে পুলিশ সেগুলির কার্যক্রম সাময়িক ভাবে স্থগিত বা কেন্দ্রগুলি বন্ধ করে দেবে।

০৯ ২০

এ ছাড়াও, খান স্যরের কেজিএসে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার ত্রুটি থাকার অভিযোগে বিহার দমকল বিভাগ একটি পৃথক নোটিস জারি করেছে কোচিং সেন্টারটিকে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির অফলাইন কেন্দ্রগুলি প্রশাসনিক ভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

১০ ২০

খান স্যরকে গ্রেফতারি থেকে সাময়িক সুরক্ষার নির্দেশ আদালত বাতিল করে এবং তদন্তের প্রয়োজনে তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন পড়ে, তবে খান স্যারের অনুপস্থিতিও সরাসরি তাঁর কোচিং সেন্টারগুলির উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

১১ ২০

পটনা এবং দিল্লিতে কেজিএসের একাধিক শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। সেখানে গিয়ে মাধেমধ্যেই ক্লাস নেন খান স্যর নিজে। যেহেতু তাঁর এই ব্র্যান্ডটি মূলত তাঁর নিজস্ব পড়ানোর পদ্ধতি, ব্যক্তিত্ব এবং সরাসরি উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল, তাই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে সেখানকার ব্যাচগুলির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে তাঁর ওই কোচিং সেন্টারগুলিতে ভর্তি হওয়া হাজার হাজার শিক্ষার্থীর উপরও সরাসরি প্রভাব পড়বে।

১২ ২০

খান স্যরের ব্যবসায়িক মডেলটি মূলত স্বল্প অর্থের বিনিময়ে বিপুল সংখ্যক পড়ুয়াকে শিক্ষাদানের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ফলে নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ তাঁর কোচিং সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। স্বাধীনতা বজায় রাখার স্বার্থে অতীতে ১০৭ কোটি টাকা মূল্যের কর্পোরেট এডটেক বিনিয়োগের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি।

১৩ ২০

ফলে এখন যদি খান স্যরের গ্রেফতারির কারণে বা অন্য কোনও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কেজিএসের কোচিং সেন্টারগুলি বন্ধ হয়ে যায়, তা হলে ওই ব্যবসায়িক মডেলটিও ভেঙে পড়তে পারে। ভবিষ্যৎ এডটেক সহযোগিতা বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্প্রসারণের প্রক্রিয়াও ব্যাহত হতে পারে।

১৪ ২০

এমনকি খান স্যরের কোচিং সেন্টারের ব্র্যান্ড অস্থিতিশীল বলে মনে হলে নতুন অনলাইন কোর্স সাবস্ক্রিপশনের হারও কমে যেতে পারে। পরিকাঠামোগত উন্নয়নের পরিবর্তে আইনি লড়াই বা আত্মপক্ষ সমর্থনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হতে পারে ওই ব্যবসা।

১৫ ২০

সমস্যা রয়েছে আরও। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিধিনিষেধ এবং বিজ্ঞাপন-রাজস্বের ঝুঁকিও রয়েছে। ইউটিউব চ্যানেলে (খান জিএস রিসার্চ সেন্টার) ২ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি সাবস্ক্রাইবার থাকায় তাঁর ডিজিটাল কন্টেন্ট থেকে প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় হয়।

১৬ ২০

যদি আইনি বিরোধটি এমন পর্যায়ে পৌঁছোয় যেখানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার বা উস্কানি দেওয়ার দায়ে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন, তবে ইউটিউবের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলো হিংসা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কঠোর ‘কমিউনিটি গাইডলাইন’ বা নীতিমালা প্রয়োগ করবে।

১৭ ২০

ফলে খান স্যরের ইউটিউব চ্যানেলের উপর কোনও বিধিনিষেধ আরোপ, সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা ‘মনিটাইজ়েশন’ (আয় বন্ধ হওয়া) বন্ধ করে দিলে অনলাইন শিক্ষার্থী সংগ্রহের প্রধান মাধ্যমটিই অকার্যকর হয়ে পড়বে।

১৮ ২০

এই পরিস্থিতির অবনতি কেবল পটনার গুলিবর্ষণের ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্যের জেরে দিল্লি হাই কোর্টে ২ কোটি টাকার মানহানি মামলা দায়ের করেছেন সাংবাদিক অঞ্জনা ওম কশ্যপ।

১৯ ২০

গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ এবং হাই প্রোফাইল কর্পোরেট মামলার বিষয়গুলি একই সঙ্গে সামলাতে গেলে কোচিং সেন্টারে আর সে ভাবে মনোযোগ দিতে পারবেন না খান স্যর, যা তাঁকে পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা থেকে দূরে সরিয়ে নেবে। তেমনটাই আশঙ্কা করছেন অনেকে।

২০ ২০

তবে ব্যবসায় এ সব ঝুঁকি সত্ত্বেও নিজের লক্ষ্যে অবিচল খান স্যর। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, তাঁর কোচিং সেন্টারটি বন্ধ হয়ে গেলেও কঠোর পরিশ্রম ও শিক্ষার্থীদের সমর্থনের মাধ্যমে তিনি তা পুনরায় গড়ে তুলবেন।

সব ছবি: পিটিআই, সংগৃহীত এবং ফাইল থেকে।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement