সালটা ১৮৭১। সভ্যতা তখনও এত দূর গড়ায়নি। ভারত মহাসাগরের দক্ষিণের একটি ছোট্ট নির্জন দ্বীপে গিয়ে পৌঁছোন এক ফরাসি ব্যক্তি। সঙ্গে ছিল পাঁচটি গরু। সেই দ্বীপে বসতি স্থাপন করাই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য।
ফরাসি সেই ব্যক্তির নাম হিউরটিন। বসতি স্থাপনের জন্য তিনি যে দ্বীপটি বেছে নিয়েছিলেন, তার নাম আমস্টারডম। তবে সেই আগ্নেয় দ্বীপের অনুর্বর জমিতে হিউরটিনের বসতি স্থাপনের স্বপ্ন বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কিছু দিনের মধ্যেই তা ভেঙে যায়।
হিউরটিন সেখান থেকে চলে যান। কিন্তু সঙ্গে আনা পাঁচটি গরুকে তিনি নিয়ে যাননি। মায়া ত্যাগ করে তাদের সেই অঞ্চলেই ছেড়ে দিয়ে যান।
বেশ কয়েক দশক পর, আনুমানিক ১৯৮৮ সাল নাগাদ বিজ্ঞানীরা সেই দ্বীপে যান। গরুগুলির কোনও চিহ্ন দেখতে পাওয়ার আশা না নিয়েই সেই দ্বীপে পাড়ি দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীদল। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁরা যা দেখলেন, তাতে তাঁদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গিয়েছিল।
স্বাদুজলের অভাব, খাদ্যাভাব-সহ আবহাওয়ার প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেও বেঁচে ছিল অবোলা জীবগুলি। শুধু তা-ই নয়। পাঁচটি গরু থেকে বংশবিস্তার করে তারা ২০০০ গরুর পরিবারে পরিণত হয়েছিল। গোটা দ্বীপ জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল হিউরটিনের ছেড়ে আসা গরুদের বংশধরেরা।
হিউরটিন সেই দ্বীপে একটি ষাঁড়, দু’টি গরু এবং দু’টি বাছুর ছেড়ে এসেছিলেন। বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ রূপে বিচ্ছিন্ন ছিল প্রাণীগুলি। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই দুর্গম আগ্নেয় দ্বীপটিতে টিকে যায় তারা, যা বিজ্ঞানীদের অবাক করেছিল। আন্তঃপ্রজননের ফলে ঘটা রোগব্যাধি কী ভাবে গরুগুলিকে ছুঁতে পারল না সেটা ভেবে চমকেছিলেন বিজ্ঞানীরা।
শুরু হয় গবেষণা। সেখান থেকে মোট ১৮টি গরুর ডিএনএ-র নমুনা সংগ্রহ করে আনেন বিজ্ঞানীরা। সামনে আসে নানা অজানা, অবাক করা তথ্য।
বিজ্ঞানীরা দেখেন, আমস্টারডমের দ্বীপের সেই গরুগুলি বহু বার আন্তঃপ্রজননে লিপ্ত হয়েছে। বাধ্য হয়েই। নির্জন দ্বীপে বছরের পর বছর ধরে থাকতে থাকতে প্রাণীগুলি বন্য হয়ে উঠেছিল। গৃহপালিত প্রাণীর প্রায় কোনও স্বভাবই তাদের মধ্যে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
স্তন্যপায়ী প্রাণীকুলে আন্তঃপ্রজননের ঘটনা প্রায় বিরল বলা চলে। এই কারণে তাদের মধ্যে রূপান্তরের (মিউটেশন) যে সমস্ত সমস্যা দেখতে পাওয়া উচিত, সেগুলির কোনওটাই দেখতে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এমনকি গরুগুলির সন্তানধারণের ক্ষমতাও হ্রাস পায়নি।
‘মলিকিউলার বায়োলজি অ্যান্ড এভোলিউশন’ জার্নালে প্রকাশিত হওয়া গবেষণাপত্র অনুসারে, আমস্টারডমের আগ্নেয় দ্বীপের প্রায় ৫৫ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে ঘুরে বেড়ানো গরুগুলির পূর্বপুরুষেরা ছিল ভিন্ন প্রজাতির। ইউরোপীয় জার্সি গরু এবং ভারত মহাসাগরীয় এলাকার জেবু গরুর সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছিল তারা।
ভিন্ন প্রজাতির গরুদের মিশ্রণে সৃষ্টি হওয়ায় উভয়েরই নানা গুণ আগ্নেয় দ্বীপ দখল করে থাকা গরুদের মধ্যে বর্তমান। বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘হাইব্রিড ভিগর’ বলে। সেগুলির মধ্যে জার্সি গরুর উচ্চ প্রজনন ক্ষমতা যেমন রয়েছে, তেমনই ভারত মহাসাগরীয় জেবু গরুর কাছ থেকে তাপ এবং পরজীবী প্রতিরোধের ক্ষমতাও বর্তমান। এ সমস্ত ক্ষমতাই তাদের আমস্টারডমের সেই দুর্গম দ্বীপে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
‘মলিকিউলার বায়োলজি অ্যান্ড এভোলিউশন’ জার্নালে প্রকাশিত হওয়া গবেষণাপত্র অনুসারে, গরুগুলির মধ্যে দেখতে পাওয়া সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়টি ছিল তাদের স্নায়ুতন্ত্র। গরুগুলির পিটুইটারি, হাইপোথ্যালামাস এবং অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির অ্যাক্সিসের সঙ্গে যুক্ত জিনগুলিতে দেখা গিয়েছিল বিশাল পরিবর্তন। এর ফলে তাদের মধ্যে মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
মাঝের কয়েক দশকের মধ্যেই গরুগুলি তাদের গৃহপালিত স্বভাব ভুলে যায়। বাঁচার লড়াইয়ে টিকে থাকতে গরুগুলি নিজেদের শান্ত স্বভাব সম্পূর্ণ ভুলে যায়। উল্টে বন্য প্রাণীদের মতো সর্বদা সজাগ থাকতে শুরু করে, যা গরুগুলিকে সেই দুর্গম দ্বীপে প্রাণ বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলেও, এই গরুগুলি আমস্টারডমের সেই দ্বীপের জন্য ক্ষতিকারক হয়ে উঠেছিল। তারা দ্বীপের বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতি ডেকে আনছিল।
আমস্টারডমের সেই নির্জন দ্বীপ ফাইলিকা আর্বোরিয়া নামের এক বিশেষ প্রজাতির গুল্মজাতীয় গাছের বাসস্থান। সেই গাছের ঝোপে বাসা বানিয়ে থাকে বিপন্ন আলবাট্রস প্রজাতির সামুদ্রিক পাখি। কিন্তু গরুগুলি বিপুল পরিমাণে সে সমস্ত গাছ খেয়ে নেওয়ায় গাছগুলি যেমন নিঃশেষ হতে শুরু করে, তেমনই পাখিগুলিরও বাসস্থানের অভাব দেখা দেয়।
এমতাবস্থায় ফ্রান্সের সরকার সেই গবাদি পশুগুলিকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলার কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৮৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে পরিকল্পনামূলক পদ্ধতিতে গরুগুলিকে নির্মূল করা হয়। বর্তমানে বিবর্তিত হওয়া এই বিস্ময়ের কিছু ডিএনএ নমুনা আর হাড় গবেষণার জন্য সংগ্রহ করে রাখা রয়েছে।