ইহুদিভূমিতে বসবে ছত্রপতি শিবাজির মূর্তি। চলতি বছরের ৬ জুন মুম্বইয়ের ইজ়রায়েলি কনস্যুলেট জেনারেল সে কথা ঘোষণা করতেই ভারত জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল। তেল আভিভের এ-হেন সিদ্ধান্তকে ‘গর্বের এবং ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করে এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করেছেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস। এতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও মজবুত হবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
ভারতের মরাঠা ইতিহাসে ৬ জুন তারিখটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৬৭৪ সালের ওই দিনে রায়গড় দুর্গে রাজ্যাভিষেক হয় ছত্রপতি শিবাজির। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, ৩৫০ বছর পর পশ্চিম এশিয়ার আরব দুনিয়ার ইহুদিভূমিতে তাঁর মূর্তি স্থাপনের কথা ঘোষণা করতে সেই ৬ জুনকেই বেছে নিল মুম্বইয়ের ইজ়রায়েলি কনস্যুলেট জেনারেল। ফলে এর কূটনৈতিক গুরুত্ব যে অপরিসীম, তা বলাই বাহুল্য।
সুপ্রাচীন কাল থেকে নিজেদের জন্মভূমি ছেড়ে ইউরোপ, আমেরিকা-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালাতে হয়েছে ইহুদিদের। সেখানেও যে সব সময় তাঁরা খুব সুখে ছিলেন, এমনটা নয়। ইউরোপে তো বার বার নিপীড়নের মুখে পড়তে হয়েছে এই সম্প্রদায়কে। আর এইখানেই ব্যতিক্রমী রাষ্ট্র হল ভারত। কোনও রকম অত্যাচার ছাড়া বছরের পর বছর ধরে এ দেশে বসবাস করছেন ইহুদিরা। নিজেদের ধর্মাচরণের ক্ষেত্রেও কোনও সমস্যা নেই তাঁদের।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে দুঁদে কূটনীতিকেরা মনে করেন, এর জেরেই মজবুত হয়েছে ভারত-ইজ়রায়েল সম্পর্ক। ইহুদিরা এ দেশের সমাজেও নিজেদের অবদান রাখতে পেরেছেন। আর তাই ছত্রপতি শিবাজির মূর্তি স্থাপনের মধ্য দিয়ে নয়াদিল্লির কাছে নিজেদের গুরুত্ব আরও বাড়াতে চাইছে তেল আভিভ। চিন-পাকিস্তানের মতো জোড়া শত্রুর মোকাবিলায় তাঁদের সঙ্গে কৌশলগত ‘বন্ধুত্ব’ যে জরুরি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ইতিহাসবিদদের কথায়, বহু বছর ধরে এ দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে ইহুদি বণিক সম্প্রদায়। তবে ষোড়শ শতাব্দী থেকে অন্য দিকে বাঁক নেয় দুই রাষ্ট্রের ‘বন্ধুত্ব’। বর্তমানে পশ্চিম ভারতের কোঙ্কন উপকূলে বসবাস করে মরাঠিভাষী ‘বেনে ইজ়রায়েল’ জনগোষ্ঠী। এদের এই উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ইহুদি সম্প্রদায় হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
উনিশ শতকের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও সরকারি আমলা এইচ এস কেহিমকারের লেখা ‘হিস্ট্রি অফ দ্য বেনে ইজ়রায়েল অফ ইন্ডিয়া (১৯৩৭)’ বইয়ে এই ইহুদি জনগোষ্ঠীর ভারতে আসার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে। তাঁর দাবি, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের গোড়ার দিকে সেলিউসিড শাসক অ্যান্টিওকাস এপিফেনেসের নিপী়ড়নের থেকে বাঁচতে বর্তমান ইজ়রায়েলের গ্যালিলি থেকে পালান বেশ কিছু ইহুদি। তাঁদেরই কয়েক জন আশ্রয় নেন পশ্চিম ভারতের কোঙ্কন উপকূলে।
কেহিমকারের বই অনুযায়ী, পালানোর সময় মুম্বইয়ের দক্ষিণ নাভাগাঁওয়ের কাছে ডুবে যায় গ্যালিলিবাসীদের জাহাজ। কোনও মতে কোঙ্কন উপকূলে পৌঁছোন কয়েক জন। লোকশ্রুতি রয়েছে, ওই দুর্ঘটনায় সাত পুরুষ ও সাত নারী মিলিয়ে প্রাণে বাঁচেন মোট ১৪ জন। তাঁরাই কোঙ্কনে ‘বেনে ইজ়রায়েল’ সম্প্রদায় গড়ে তোলেন। ধীরে ধীরে স্থানীয় সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যান ওই ইহুদিরা।
পরবর্তী বছরগুলিতে ‘বেনে ইজ়রায়েল’ সম্প্রদায়ভুক্তেরা তেল নিষ্কাশন এবং মুদি ব্যবসার পেশা গ্রহণ করেন। কেহিমকার লিখেছেন, প্রতি শনিবার অত্যন্ত কঠোর ভাবে ইহুদি বিশ্রাম দিবস পালন করতেন তাঁরা। আর তাই স্থানীয়েরা তাঁদের ‘শনিবার তেলি’ বলে ডাকতেন। অন্য দিকে হিন্দু ও মুসলিম তেল নিষ্কাশনকারীদের বলা হত ‘সোমবার তেলি’ ও ‘শুক্রবার তেলি’। কারণ, ওই দুই সম্প্রদায়ের ছুটির দিন ছিল সোম ও শুক্রবার।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই স্থানীয় মরাঠি ভাষা রপ্ত করে নেয় ‘বেনে ইজ়রায়েল’ সম্প্রদার। ভারতীয়দের সঙ্গে দুর্দান্ত ভাবে মিশেও যান তাঁরা। এ দেশের সংস্কৃতি গ্রহণ করতে খুব একটা সমস্যা হয়নি তাঁদের। ১৭ শতকে শিবাজির উত্থান হলে মরাঠা সেনাদলে যুক্ত হতে থাকে এই ইহুদি গোষ্ঠী। আঞ্চলিক কিছু ফৌজেও তাঁদের অন্তর্ভুক্তির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।
তবে ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন, ভারতীয় রাজাদের মধ্যে শিবাজিই সম্ভবত প্রথম ‘বেনে ইজ়রায়েল’ গোষ্ঠীর সামরিক দক্ষতা অনুধাবন করে তাঁদের মরাঠা সেনাবাহিনীর অংশ করে নিয়েছিলেন। ছত্রপতির মূল লড়াই ছিল দিল্লির মোগল বাদশা ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে। শক্তিশালী ‘স্বরাজ্য’ তৈরির স্বপ্ন দেখতেন তিনি। সেখানে সংঘর্ষে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে কোঙ্কন উপকূলের এই ইহুদি গোষ্ঠী।
সৈনিক হিসাবে ‘বেনে ইজ়রায়েল’ গোষ্ঠীর খ্যাতি অবশ্য মরাঠা যুগের পরও দীর্ঘ কাল টিকে ছিল। ‘ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বেনে ইজ়রায়েল সৈনিক’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্রে সে কথা স্বীকার করেন পশ্চিমবাংলার ইতিহাসবিদ কৌস্তভ চক্রবর্তী। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘‘এই ইহুদিদের সামরিক সক্ষমতা ছিল প্রশ্নাতীত। আর তাই দেশীয় এবং ব্রিটিশ ফৌজ, দু’জায়গাতেই সমান দক্ষতায় দায়িত্ব পালন করতে দেখা গিয়েছে তাঁদের।’’
একাধিক নথি থেকে জানা গিয়েছে, ভারতের পশ্চিম উপকূলের জঞ্জিরার সিদ্দি ও আংরিয়ার মতো আঞ্চলিক শক্তির সামরিক বাহিনীতে কাজ করতেন ‘বেনে ইজ়রায়েল’ গোষ্ঠীভুক্তেরা। শিবাজি আবার তাঁদের কয়েক জনকে মরাঠা নৌবাহিনীতে যুক্ত করেন। ২০ শতকে প্রকাশিত হয় ইংরেজ খ্রিস্ট ধর্মপ্রচারক রেভারেন্ড জেমস হেনরি লর্ডের লেখা বই ‘দ্য জিউস ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য ইস্ট’। সেখানে আবার নায়েক বা নৌ-সেনাপতি হিসাবে অ্যারন চুরিকারের নাম উল্লেখ রয়েছে।
জেমস হেনরি লর্ড জানিয়েছেন, ইহুদি অ্যারনের নৌ-রণকৌশলে যথেষ্ট খুশি ছিলেন মরাঠা ছত্রপতি। তাঁকে আলাদা করে জমিও দান করেন তিনি। এ ছাড়া ‘বেনে ইজ়রায়েল’ সম্প্রদায়ের স্যামুয়েল এবং আব্রাহাম নামের দু’জনকে নৌবাহিনীতে বড় পদ দেন তাঁরা। তাঁদের পরিবারের সদস্যেরা মরাঠা দুর্গের দায়িত্বও পেয়েছিলেন। ফলে ১৮ শতকে ইহুদিদের হাত ধরে তাদের নৌবহর পশ্চিম উপকূলের বিরাট অংশে আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়।
ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ‘বেনে ইজ়রায়েল’ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তি এবং চাকরি করার বিষয়টি ভাল ভাবে নথিবদ্ধ রয়েছে। ১৮ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বম্বে (অধুনা মুম্বই) প্রেসিডেন্সির ফৌজে যোগ দেয় কোঙ্কন উপকূলের এই ইহুদি সম্প্রদায়। এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন স্যামুয়েল ইজ়েকিয়েল দিভেকার। ১৭৮৬ সালে ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে তাঁকে বন্দি করে টিপু সুলতানের বাহিনী। পরে পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার পর মুক্তি পান তিনি।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ ভারতীয় সেনার ইতিহাস অনুযায়ী, ইঙ্গ-মহীশূরের পাশাপাশি ইঙ্গ-মরাঠা, ইঙ্গ-আফগান, ইঙ্গ-বর্মা, ইংরেজদের সিন্ধু অভিযান, পঞ্জাবের যুদ্ধ, এমনকি ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময়ও গুরুদায়িত্ব পালন করে এই বেনে-ইজ়রায়েল সম্প্রদায়। তাঁদের সাক্ষরতার হার ছিল অত্যন্ত বেশি। তা ছাড়া প্রথম থেকেই ঝরঝরে ইংরেজি বলতে পারতেন এই গোষ্ঠীর ইহুদিরা। ফলে বাহিনীতে উঁচু পদ পেতে সমস্যা হত না তাঁদের।
১৯৪৮ সালে আধুনিক ইজ়রায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হলে ভারত ছেড়ে ‘বেনে ইজ়রায়েল’ সম্প্রদায়ের বড় অংশ পাড়ি জমায় সে দেশে। গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকের শেষ দিকে ১২ হাজারের বেশি ইহুদি ফিরে যায় মাতৃভূমির গ্যালিলি, তেল আভিভ বা হাইফার মতো এলাকায়। বর্তমানে ইহুদিভূমিতে বসবাসকারী এই গোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। তবে মরাঠি সংস্কৃতি কখনওই ত্যাগ করেননি তাঁরা। ভারতীয় খাবার খেতেও পছন্দ করে এই সম্প্রদায়।
অন্য দিকে ভারতে বসবাসকারী ‘বেনে ইজ়রায়েল’ গোষ্ঠীর লোকসংখ্যা কমে পাঁচ হাজারের আশপাশে চলে এসেছে। তাঁরা মূলত মুম্বই, ঠাণে এবং কোঙ্কন উপকূলে থাকেন। এই এলাকাগুলিতেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাঁদের সিনাগগ এবং সমাধিক্ষেত্র। ইজ়রায়েলের ডিমোনা শহরে আবার প্রচুর ভারতীয়ের বাস। তাই ওই শহরকে ‘মিনি ইন্ডিয়া’ও বলা হয়ে থাকে।
মুম্বইয়ের কনস্যুলেট জেনারেল ছত্রপতি শিবাজির মূর্তি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করায় ‘বেনে ইজ়রায়েল’ গোষ্ঠীর মরাঠা বাহিনীতে অবদানের কথা প্রকাশ্যে চলে এসেছে। এই নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন ইহুদি রাষ্ট্রদূত ইয়ানিভ রিভ্যাক। তাঁর কথায়, ‘‘ভারতে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের মাহাত্ম্য এবং গুরুত্ব কতটা তা আমরা জানি। এখান থেকেই তাঁর মূর্তি ইজ়রায়েলে নিয়ে যাওয়া হবে।’’
ইজ়রায়েলের কোন শহরে ছত্রপতি শিবাজির মূর্তি বসবে, তা অবশ্য স্পষ্ট করেননি রিভ্যাক। সংবাদসংস্থা এএনআইকে তিনি বলেন, ‘‘এটা শুধুমাত্র একটা সাধারণ প্রকল্প নয়। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। এই মূর্তি স্থাপনের মাধ্যমেই নয়াদিল্লি এবং তেল আভিভের বাসিন্দাদের মধ্যে একটা সৌহার্দ্যের পরিবেশ গড়ে উঠবে।’’