US on Iran’s Uranium

সোভিয়েত পতনে ৬০০ কেজি পরমাণু বোমার ‘মশলা’ নিয়ে চম্পট! ৩২ বছর পর পারস্যে চলবে ‘প্রজেক্ট স্যাফায়ার’?

১৯৯৪ সালে অত্যন্ত গোপনে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে জন্ম হওয়া কাজ়াখস্তানের ভিতর থেকে ৬০০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজের দেশে নিয়ে আসে আমেরিকা। ৩২ বছর পর ইরানের আণবিক বোমা তৈরির কাঁচামাল হস্তগত করতে একই রাস্তা নেবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ ১২:১০
Share:
০১ ২০

লাগাতার আলোচনা সত্ত্বেও অধরা শান্তিচুক্তি। আর তাই ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রক্তাক্ত হয়েই চলেছে পশ্চিম এশিয়া। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তেহরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির ‘কাঁচামাল’ হস্তগত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ইজ়রায়েল ও আমেরিকা। সেই লক্ষ্যে সাবেক পারস্যের ভিতরে ঢুকে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তুলে আনতে বিশেষ কমান্ডো অপারেশন চালাতে পারে দুই ‘সুপার পাওয়ার’, বলছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।

০২ ২০

সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, বিদেশ থেকে ইউরেনিয়াম তুলে আনার দুঃসাহসিক অভিযান মার্কিন ফৌজের কাছে নতুন নয়। প্রায় তিন দশক আগে তেমনই একটি অপারেশনে ১০০ শতাংশ সাফল্য পায় যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডো বাহিনী। ১৯৯৪ সালের সেই অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘প্রজেক্ট স্যাফায়ার’, যাতে কাজ়াখস্তানের পরমাণু বোমার ‘কাঁচামাল’ হস্তগত করতে সক্ষম হয় ওয়াশিংটন।

Advertisement
০৩ ২০

১৯৯১ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনে রাশিয়া-সহ জন্ম হয় ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের। সোভিয়েত ভাঙায় তার বিপুল পরমাণু অস্ত্রের প্রায় পুরো ভাগটাই পায় মস্কো। তবে ওই সময় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা নতুন দেশগুলিতেও এই গণবিধ্বংসী হাতিয়ারের কিছু কিছু কাঁচামাল ছিল। এর মধ্যে অন্যতম হল কাজ়াখস্তান।

০৪ ২০

সোভিয়েত ভাঙার কিছু দিনের মধ্যেই বিস্ফোরক তথ্য পায় মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা। ওয়াশিংটন জানতে পারে, কাজ়াখস্তানের উস্ত-কামেনোগোর্স্ক এলাকার ‘উলবা মেটালার্জিক্যাল প্ল্যান্টে’ মজুত রয়েছে ৬০০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। সেটা ব্যবহার করে যখন-তখন অনায়াসে ২৪-২৫টি পরমাণু বোমা বানিয়ে ফেলতে পারত আস্তানা। তা ছাড়া ওই তেজস্ক্রিয় পদার্থের উপর শত্রুদের নজর পড়াও অস্বাভাবিক নয়।

০৫ ২০

সোভিয়েতের পতন এবং আধুনিক রাশিয়ার জন্মের সময় বিশ্বে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের সংখ্যা ছিল ছয়। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, সেই সংখ্যা বৃদ্ধি পাক, তা কখনওই চায়নি আমেরিকা। মার্কিন গোয়েন্দারা জানতেন, আণবিক অস্ত্র তৈরির মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে উত্তর কোরিয়া (ডেমোক্র্যাটিক পিপল্‌স রিপাবলিক অফ কোরিয়া)। আর তাই উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তগত করার ব্যাপারে প্রবল আগ্রহী ছিল পিয়ংইয়ং।

০৬ ২০

এই পরিস্থিতিতে কাজ়াখস্তান থেকে পরমাণু বোমার ‘মশলা’ তুলে আনার পরিকল্পনা করে মার্কিন যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন। এর জন্য ৩১ সদস্যের একটি অনুসন্ধানকারী দল তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র। শুধু তা-ই নয়, ‘সি-৫ গ্যালাক্সি’ নামের একটি সামরিক মালবাহী বিমানে অত্যন্ত গোপনে তাঁদের পাঠানো হয় উস্ত-কামেনোগোর্স্কে।

০৭ ২০

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু নিরাপত্তা, জ্বালানি সুরক্ষা এবং গবেষণা সংক্রান্ত বিষয়গুলি দেখভাল করে সেখানকার শক্তি দফতর (ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি)। পেন্টাগনের তৈরি করা বিশেষ অনুসন্ধানকারী দলের সদস্য ছিলেন সেখানকার কয়েক জন। ১৯৯৪ সালের অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মধ্যে চার সপ্তাহের বেশি সময় কাজ়াখস্তানে চলে তাঁদের অপারেশন। ফলে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বার করে আনতে সক্ষম হয় আমেরিকা।

০৮ ২০

যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাজ়াখস্তানে পৌঁছে পরমাণু বোমার ‘মশলা’ চিহ্নিত করে তা বিশেষ ভাবে প্যাকেটজাত করে ৩১ সদস্যের পেন্টাগনের বিশেষ অনুসন্ধানকারী দল। এর পর ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা’ বা আইএইএ-র (ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি) সুরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে ওই উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমেরিকার টেনেসি রাজ্যের ‘ওয়াই-১২’ নামের একটি প্ল্যান্টে নিয়ে আসেন তাঁরা।

০৯ ২০

কাজ়াখস্তান থেকে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গী ছিল আইএইএ। কিন্তু তা সত্ত্বেও গোড়া থেকেই এই অভিযানকে গোপন রেখেছিল ওয়াশিংটন। ‘প্রজেক্ট স্যাফায়ার’-এর সাফল্যে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায় পেন্টাগনের আত্মবিশ্বাস। ‘সি-৫ গ্যালাক্সি’ সামরিক মালবাহী বিমানে ৬০০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে ৯,৯০০ কিলোমিটার উড়িয়ে এনে নিষ্ক্রিয় করা যে সম্ভব, তা বুঝতে পারে আমেরিকা।

১০ ২০

বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী কালে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যান্ডি ওয়েবার। তাঁর কথায়, ‘‘পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপাদানগুলি সরিয়ে ফেলতে পারলেই, বিনা যুদ্ধে অনেক সমস্যার সমাধান করা যায়। প্রজেক্ট স্যাফায়ার ছিল তার জ্বলন্ত প্রমাণ।’’ ওই ঘটনার পর আমেরিকা অবশ্য চুপ করে বসে থাকেনি। আরও দু’টি রাষ্ট্রে একই ধরনের অভিযান চালায় ওয়াশিংটন।

১১ ২০

সূত্রের খবর, ২০০৩ সালে পাকিস্তানের এ কিউ খান পরমাণু গবেষণাকেন্দ্র থেকে ৫৫,০০০ পাউন্ডের বেশি ওজনের নথি, যন্ত্রাংশ এবং আণবিক অস্ত্র তৈরির উপাদান অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যায় আমেরিকা। এর মধ্যে ছিল ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড, তেজস্ক্রিয় পদার্থটির সমৃদ্ধিকরণের যন্ত্র পি-২ ফেন্ট্রিফিউজ় এবং ১৩-১৭ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। ইসলামাবাদ অবশ্য আনুষ্ঠানিক ভাবে সে কথা কখনওই স্বীকার করেনি।

১২ ২০

তবে পরমাণু হাতিয়ার ইস্যুতে পরবর্তী বছরগুলিতে বার বার প্রশ্নের মুখে পড়ে পাকিস্তান। আণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ইসলামাবাদের হাতে নেই, গত কয়েক বছরে এ কথা বলতে শোনা গিয়েছে সেখানকার সাবেক কূটনীতিকদের একাংশকেই। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদসংস্থাগুলির দাবি, লিবিয়ার পূর্ণ সম্মতি পাওয়ার পরই এ কিউ খান গবেষণাকেন্দ্রে অভিযান চালায় মার্কিন ফৌজ। কারণ, আফ্রিকান রাষ্ট্রটির জন্যেই পরমাণবিক, রাসায়নিক এবং জৈবিক হাতিয়ার তৈরি হচ্ছিল সেখানে।

১৩ ২০

২০০৩ সালে পাকিস্তানে গণবিধ্বংসী হাতিয়ার তৈরির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন লিবিয়ার তৎকালীন সেনাশাসক কর্নেল মুয়াম্মর আল-গদ্দাফি। আর তাই এ কিউ খান গবেষণাকেন্দ্র থেকে পরমাণু বোমা তৈরির কাঁচামাল সরিয়ে ফেলতে আমেরিকার দ্বারস্থ হন তিনি। তত দিনে অবশ্য ত্রিপোলির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক দাঁড়িয়েছে আদায়-কাঁচকলায়। আণবিক বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সেটা কিছুটা মেরামত করার চেষ্টা করেন গাদ্দাফি।

১৪ ২০

লিবিয়ার সেনাশাসকের এই পদক্ষেপ অবশ্য শেষ পর্যন্ত কাজে আসেনি। ২০১১ সালে বিদ্রোহীদের হাতে উৎখাত হতে হয় তাঁকে। প্রাণ বাঁচাতে একটি নিকাশি নালায় আশ্রয় নেন গদ্দাফি। সেখান থেকে টেনে বার করে এনে তাঁকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় বিদ্রোহী ফৌজ। গোটা ঘটনার নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ।

১৫ ২০

চলতি বছরের জানুয়ারিতে সস্ত্রীক ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নিজের ঘর থেকে তুলে আনে মার্কিন ডেল্টা ফোর্স। ফলে ‘আরভি-১’ পরমাণু গবেষণাকেন্দ্রটি বন্ধ করতে বাধ্য হয় কারাকাস। গত ১০ মে সেখান থেকে ১৩.৫ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে দেশে নিয়ে এসেছে আমেরিকা। এই অভিযানেও পেন্টাগনের সঙ্গী ছিল আইএইএ।

১৬ ২০

সাবেক সেনাকর্তারা অবশ্য মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইরানে এই ধরনের অভিযান চালানো কঠিন। কারণ, কাজ়াখস্তান, পাকিস্তান, লিবিয়া বা ভেনেজ়ুয়েলার সম্মতি থাকায় সেখানকার উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামে হাত দিতে পেরেছে আমেরিকা। অন্য দিকে কোনও অবস্থাতেই পরমাণু অস্ত্র তৈরির ‘মশলা’ হাতছাড়া করতে রাজি নয় তেহরান। এর জন্য প্রয়োজনে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ।

১৭ ২০

দ্বিতীয়ত, গত বছরের (২০২৫ সাল) জুনে ইরানের পরমাণুকেন্দ্রগুলিতে নিশানা করে মার্কিন বিমানবাহিনী। তেহরানের ফোর্ডো ও নাতান্‌জ়-সহ একাধিক গবেষণাগারে আনুমানিক ১৪টি ‘বাঙ্কার বাস্টার’ (পোশাকি নাম গাইডেড বম্ব ইউনিট-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডিন্যান্স পেনিট্রেটর) বোমা ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ শ্রেণির বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমান। এই অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’।

১৮ ২০

আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের নজর এড়িয়ে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মাটির কয়েক ফুট গভীরে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার তৈরি করে পরমাণু কর্মসূচি চালাচ্ছিল ইরান। ২০২৫ সালের জুনে সেখানেই হামলা চালায় মার্কিন বিমানবাহিনী। তেহরানের দাবি, এর জেরে পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ওই সমস্ত গবেষণাকেন্দ্র। এর নীচে চাপা পড়ে আছে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম।

১৯ ২০

ইজ়রায়েল অবশ্য ইরানের দেওয়া এই তত্ত্ব মানতে নারাজ। ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সন্দেহ, বোমাবর্ষণের আগেই ওই সমস্ত কেন্দ্র থেকে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যায় তেহরানের আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)। আর তাই মার্কিন ফৌজের সঙ্গে যৌথ ভাবে সাবেক পারস্যভূমিতে কমান্ডো অপারেশনের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

২০ ২০

অন্য দিকে এ ব্যাপারে মুখ খুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। সম্প্রতি, স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘‘আমরা ইরান থেকে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বার করে এনে তা ধ্বংস করব। তেহরানকে সেই সমঝোতায় আসতে হবে।’’ শেষ পর্যন্ত এতে তিনি সফল হন কি না, তার উত্তর দেবে সময়।

ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement