Elisa lam Death Mystery

কুখ্যাত হোটেলের লিফ্‌ট থেকে উধাও তরুণী, নগ্ন দেহ মেলে ১২ ফুট উঁচু ট্যাঙ্কে, খুন না আত্মহত্যা? দশক পেরোলেও জবাব মেলেনি

চিনা-কানাডীয় এক তরুণী একা ভ্রমণ করতে যান আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে। ২০১৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সিসিল হোটেল থেকে রাতারাতি উধাও হয়ে যান তিনি। শেষ ভিডিয়োয় তাঁর অসংলগ্ন আচরণ ধরা পড়ে। ১৯ দিন নিখোঁজ থাকার পর হোটেলের জলের ট্যাঙ্ক থেকে পাওয়া যায় দেহ। কী ভাবে তালাবন্ধ ছাদে উঠে উঁচু ট্যাঙ্কে পড়ে গিয়েছিলেন, সেই রহস্য খোলসা হয়নি আজও।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৬
Share:
০১ ২০

পৃথিবীতে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যার কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে বার করা সম্ভব হয় না। কিনারা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় তদন্তকারীদেরও। কিছু ধাঁধা রয়ে গিয়েছে, বহু জটিল সমীকরণে ফেলেও যেগুলির সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই সমস্ত ঘটনার জটিলতা এবং রহস্যময়তা আমাদের বিস্মিত করে।

০২ ২০

অস্বাভাবিক আর রহস্যে ঘেরা তেমনই একটি ঘটনা হল এলিসা লামের মৃত্যুরহস্য। মাত্র ২১ বছর বয়সে লস অ্যাঞ্জেলেসের সিসিল হোটেল থেকে উধাও হয়ে যান এলিসা। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ২০১৩ সালের ঘটনা। ৩১ জানুয়ারি তাঁকে হোটেলের লিফ্‌টে শেষ বারের মতো দেখা গিয়েছিল। নিখোঁজ হওয়ার ১৯ দিন পর খোঁজ মেলে এলিসার। ১৯ ফেব্রুয়ারি হোটেলের ছাদের একটি জলের ট্যাঙ্কে তাঁকে নগ্ন ও মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

Advertisement
০৩ ২০

এলিসা লাম ছিলেন ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ছাত্রী। নাগরিকত্ব চিনা-কানাডীয়। ২০১০ সাল নাগাদ এলিসা ‘ইথার ফিল্ডস’ নামের আড়ালে ব্লগ লিখতে শুরু করেন। পরের দু’বছরে তিনি কেতাদুরস্ত পোশাকে মডেলিংয়ের ছবি এবং নিজের জীবনের বিবরণ পোস্ট করতেন। মানসিক অসুস্থতা নিয়ে বার বার সরব হতেন নেটমাধ্যমে।

০৪ ২০

২০১৩ সালে তিনি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় একাকী ভ্রমণে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। ব্লগেও তিনি তাঁর পরিকল্পনার কথা ভাগ করে নিয়েছিলেন। সান দিয়েগো, লস অ্যাঞ্জেলেস, সান্টা ক্রুজ় এবং সান ফ্রান্সিসকোর মতো শহরের আনাচকানাচে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা ছিল এই ছাত্রীর। সেইমতো ২৬ জানুয়ারি তিনি লস অ্যাঞ্জেলেস পৌঁছোন।

০৫ ২০

দু’দিন পরেই আমেরিকার অন্যতম জনবহুল শহরে সিসিল (সাবেক নাম স্টে অন মেন) নামের একটি হোটেলের ছ’তলায় একটি ঘর ভাড়া নেন এলিসা। প্রথমে অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে ঘর ভাগ করে থাকা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাল কাটে এলিসার রুমমেটের অভিযোগে। তিনি হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে এলিসার নানা অস্বাভাবিক আচরণের বিরুদ্ধে নালিশ জানান। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি রুমমেটকে তালাবন্ধ করে রেখে চলে যেতেন। অদ্ভুত সব নোট লিখে রাখতেন ঘরে। দু’দিনের মধ্যেই এলিসাকে পৃথক একটি ঘর দেন হোটেল কর্তৃপক্ষ।

০৬ ২০

এলিসাকে শেষ দেখা গিয়েছিল ৩১ জানুয়ারি। সে দিন তিনি একটি বইয়ের দোকানে সময় কাটিয়েছিলেন। সিসিল হোটেল থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে ছিল দোকানটি। দোকানের ম্যানেজার কেটি অরফান পরে জানিয়েছিলেন নিখোঁজ হওয়ার দিন এলিসা পরিবারের জন্য উপহার কিনেছিলেন। সিসিলে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত এলিসার বুকিং ছিল। ৩১ জানুয়ারির আগে পর্যন্ত মা ও বাবার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলেন এলিসা।

০৭ ২০

পরের দিন এলিসার হোটেল ছেড়ে সান্তা ক্রুজ়ের দিকে রওনা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই দিনের পর পরিবারের কাছে এলিসার আর ফোন আসেনি। ৩১ তারিখের পর মেয়ের আর কোনও খবর পাননি বাবা-মা। এক সপ্তাহ পার হয়ে যাওয়ার পরও মেয়ের হদিস পাচ্ছিলেন না এলিসার অভিভাবকেরা। ফলে লস অ্যাঞ্জেলেসের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তাঁরা। নিজেরাও মেয়ের সন্ধানে আমেরিকায় ছুটে আসেন।

০৮ ২০

অন্তর্ধানের পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না এলিসার। তদন্তকারী আধিকারিকেরা হোটেলের সিসিটিভি থেকে কয়েকশো ঘণ্টার নজরদারি ফুটেজ পর্যালোচনা করতে শুরু করেন। এলিসা যে তলটিতে ছিলেন, সেখানে কোনও ক্যামেরা না থাকলেও, যে রাতে তিনি নিখোঁজ হন, সেই রাতে একটি ভিডিয়োয় তাঁকে শেষ বারের মতো দেখা গিয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে লস অ্যাঞ্জেলেসের পুলিশ রহস্যজনক একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করে। ভিডিয়োটি ছিল সিসিল হোটেলের নজরদারি ক্যামেরা থেকে তোলা একটি ফুটেজ।

০৯ ২০

ফুটেজে এলিসাকে লিফ্‌টের ভিতরে ঢুকে অদ্ভুত আচরণ করতে দেখা গিয়েছিল। লিফ্‌টের প্রায় প্রতিটি বোতাম টিপতে থাকেন তিনি। মাঝেমাঝে খোলা দরজার কোনার দিকে তাকাচ্ছিলেন। এলিসা বার বার লিফ্‌টটি বন্ধ করার চেষ্টা করলেও সেটি বন্ধ হচ্ছিল না। একসময় লিফ্‌টের বাইরে বেরিয়ে আসেন এলিসা। হাত-পা নেড়ে অদৃশ্য কারও সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।

১০ ২০

উদ্‌ভ্রান্তের মতো আচরণ করছিলেন তরুণী। বার বার লিফ্‌টের দিকে হাত দেখিয়ে যেন কোনও অদৃশ্য পক্ষকে কিছু একটা বলেই চলেছিলেন এলিসা। হাল ছেড়ে দিয়ে আবার লিফ্‌টে ঢুকে পড়েন। ভিতরে ঢুকে কোনায় জবুথবু হয়ে বসেছিলেন। তাতেও লিফ্‌টের দরজা বন্ধ হয়নি। এলিসা সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পরে লিফ্‌টটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। দরজা বন্ধও হয়ে যায়।

১১ ২০

তদন্তের স্বার্থে পুলিশ এই ভিডিয়োটি প্রকাশ করে। এলিসার অস্বাভাবিক আচরণ দেখে ইন্টারনেটে ঝড় উঠেছিল। নতুন সূত্র বেরিয়ে আসার পরিবর্তে ভিডিয়োটি গোয়েন্দা এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্ববিদদের নতুন নতুন তত্ত্ব উদ্ভাবনের খোরাক জোগাতে শুরু করে। এলিসার মৃত্যু নিয়ে ষড়যন্ত্রতত্ত্ববাদীদের একাংশের ধারণা হয় কেউ এলিসার পিছু নিয়েছিলেন। তাঁর হাত থেকে বাঁচতে লিফ্‌টে উঠে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন। অন্য পক্ষের যুক্তি ছিল কোনও কড়া মাদকের প্রভাবে অসংলগ্ন আচরণ করছিলেন এলিসা। তবে এই সমস্ত তত্ত্বের কোনওটাই পরে ধোপে টেকেনি।

১২ ২০

পুলিশ তখনও তন্ন তন্ন করে খুঁজে চলেছে এলিসাকে। এরই মাঝে হোটেলের অন্য বাসিন্দারা জল সম্পর্কে অভিযোগ জানাতে শুরু করেন। কল দিয়ে সরু হয়ে জল পড়ছিল। হোটেলের প্রায় প্রতিটি ঘরের কল দিয়ে লালচে রঙের জল আসছিল। কেউ কেউ আবার জানিয়েছিলেন জলের গন্ধও অস্বাভাবিক ছিল।

১৩ ২০

অভিযোগ পেয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারির সকালে কর্মচারীরা হোটেলের ছাদে জলের ট্যাঙ্কগুলি পরিদর্শন করতে যান। সেখানে ১০০০ গ্যালনের ৪টি ট্যাঙ্ক ছিল। তারই একটি ট্যাঙ্কে এলিসার দেহ খুঁজে পাওয়া যায়। ট্যাঙ্কের জলে চিত হয়ে তাঁর মৃতদেহটি ভাসছিল। শরীর ছিল সম্পূর্ণ নগ্ন। পরনের পোশাক পাশেই ভাসছিল। সেই পোশাকে শেষ বার এলিসাকে দেখা গিয়েছিল লিফ্‌টের ভিডিয়োয়। দেহটিতে সম্পূর্ণ পচন ধরেনি তখনও। দেহটি ফুলে যাওয়ায় ট্যাঙ্কের এক পাশ কেটে তা বার করতে হয়।

১৪ ২০

এলিসা কী ভাবে ছাদে পৌঁছোলেন তা এখনও অমীমাংসিতই রয়েছে। কী ভাবে ট্যাঙ্কে ঢুকলেন, তারও কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। কারণ জলাধারগুলি ১২ ফুট উঁচু ছিল এবং কেবল উপরের ঢাকনা খুলে ভিতরে ঢোকা যেত। কর্মীরা ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করার জন্য একটি মই ব্যবহার করতেন। প্রতিটি ট্যাঙ্কেই একটি ভারী ধাতব ঢাকনা ছিল। সেগুলি তালাবন্ধ রাখা হত। হোটেলের কর্মীরা যখন ছাদে আসেন, তখন তাঁরা দেখতে পান একটি ট্যাঙ্কের ঢাকনা খোলা রয়েছে। হোটেলের ছাদে ঢোকার দরজা এবং সিঁড়িগুলি তালাবন্ধই থাকত। কর্মীদের কাছে পাসকোড ও চাবি থাকত। তালা ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করলে অ্যালার্ম বাজত।

১৫ ২০

একমাত্র আপৎকালীন জানলা দিয়ে ছাদে পৌঁছোনো সম্ভব ছিল। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে এলিসা জলে ডুবে মারা গিয়েছেন। তাঁর শরীরে যৌননিগ্রহের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এমনকি ধ্বস্তাধ্বস্তি বা কোনও শারীরিক আঘাতেরও উপস্থিতি ছিল না। এমনকি তাঁর শরীরে মাদকের চিহ্নও ছিল না বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকেরা।

১৬ ২০

তদন্তে উঠে আসে ‘বাইপোলার ডিজ়অর্ডার’ এবং অবসাদে ভুগছিলেন এলিসা। এই রোগের চিকিৎসার জন্য তিনি বেশ কয়েকটি ওষুধ খেয়েছিলেন, যার মধ্যে অ্যান্টি-সাইকোটিকসও ছিল। তাঁর পরিবার জানত, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কারের কারণে তাঁরা এই বিষয়টি সম্পর্কে মুখ খোলেননি। তবে মাঝপথেই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন এলিসা। দেহ পরীক্ষার সময় তাঁর দেহে স্বল্প পরিমাণ অ্যালকোহলের সন্ধান মিলেছিল। বাইপোলার ডিজ়অর্ডার এবং অবসাদের জন্য তিনি যে ওষুধ নিতেন তার উপাদানও শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে ওষুধের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়নি। কোনও বিষ বা বিষাক্ত পদার্থের প্রমাণ খুঁজে পাননি চিকিৎসকেরা।

১৭ ২০

এলিসার অন্তর্ধানের আর একটি স্থায়ী রহস্য হল তাঁর ব্লগ। সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, এলিসা মৃত্যুর পরেও টাম্বলার নামের একটি সাইটে তাঁর ব্লগটি আপডেট হতে থাকে। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি জুড়ে এবং মার্চের শুরুতে কয়েকটি আপডেট ছিল। কয়েকটি নতুন পোস্টও প্রকাশিত হয়। এপ্রিলের শুরুতে একটি। এর পর এপ্রিলের শেষে দু’টি। জুনে একটি এবং ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ পোস্টটি প্রকাশিত হয় এলিসার ব্লগ থেকে।

১৮ ২০

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে, এলিসার বাবা-মা সিসিল হোটেলের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। তাঁরা অভিযোগ করেন যে অবহেলা এবং অপর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থার কারণে তাঁদের মেয়ের মৃত্যু ঘটেছে। এই দাবি নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন হোটেল কর্তৃপক্ষ।

১৯ ২০

১৯২৭ সালে তৈরি হওয়া সিসিল হোটেলটি লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি বিলাসবহুল হোটেল হিসাবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটি তার কৌলীন্য হারাতে থাকে। এর আশপাশের এলাকাগুলির জীবনযাপনের মান পড়ে যাওয়ার ফলে সিসিল তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলে। কয়েক দশক ধরে হোটেলটি আত্মহত্যার জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠে। এলাকায় অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হোটেলের ভিতরেও একাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছিল। হোটেলের বাসিন্দাদের অনেকেই অন্ধকার জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ।

২০ ২০

এলিসার মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে ২০০৫ সালে তৈরি ‘ডার্ক ওয়াটার’ নামের একটি সিনেমার বেশ মিল পাওয়া যায়। এই চলচ্চিত্রটি আবার ছিল একই নামের একটি জাপানি সিনেমার রিমেক। জাপানি ছবিটি ১৯৯৬ সালে লেখা একটি গল্পের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল। এলিসার মৃত্যুর রহস্য এখনও সঠিক ভাবে জানা যায়নি। কী ছিল তার মৃত্যুর কারণ? আত্মহত্যা, না কি খুন? না কি ভূতুড়ে কোনও ব্যাপারস্যাপার? সে বিষয়ে অনেক তত্ত্বই রয়েছে, কিন্তু তার সমাধান আজও অধরা।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement