অষ্টম বেতন কমিশনের সুপারিশে বাড়তে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের মাসমাইনে ও পেনশন। আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে অষ্টম বেতন কমিশন। কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে ছাড়পত্র মেলার পর এক ধাক্কায় বাড়তে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের বেতন। সুবিধা পাবেন পেনশনভোগী অবসরপ্রাপ্তেরাও।
সংশোধিত বেতনের ব্যাপারে মতামত জানানোর সুযোগ কর্মচারী সংগঠনগুলিকে দিয়েছিল কেন্দ্র। সে সব সুপারিশ বিশ্লেষণ করা হবে। তার পর সমষ্টিগত দিক থেকে কোন পরামর্শটি বেশি কার্যকর, তা বুঝে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেখানেই সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব রেখেছে সংগঠনগুলি।
আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, বেশ কয়েকটা ভিত্তির উপর নির্ভর করে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন (বেসিক পে) নির্ধারণ এবং সংশোধন করে কমিশন। একেই বলে ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’। নিয়ম অনুযায়ী, সংশোধিত মূল বেতন ঠিক করতে বর্তমান বেসিক পে-র সঙ্গে ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’কে গুণ করা হয়।
সংশোধিত বেতনে ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’ কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে ইতিমধ্যেই কমিশনকে একাধিক প্রস্তাব দিয়েছে কর্মচারী সংগঠনগুলি। সূত্রের খবর, সরকারের নিচুতলার কর্মীদের ক্ষেত্রে সেটা ৩-৩.২৫-এর মধ্যে রাখার অনুরোধ জানিয়েছে তারা। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের পেনশন, অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং গ্র্যাচুইটির নিয়মেও কিছু বদলের সুপারিশ করবে অষ্টম বেতন কমিশন।
যখন নতুন বেতন কমিশন কার্যকর হয়, তখন বর্তমানের মহার্ঘ ভাতা মূল বেতনের সঙ্গে মিশে গিয়ে শূন্য হয়ে যায় এবং এই ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর গুণ করে নতুন বেসিক পে তৈরি করা হয়। এর পর সেই নতুন বেসিক পে-এর উপর ভিত্তি করে আবার নতুন করে মহার্ঘ ভাতা, বাড়িভাড়া এবং যাতায়াত ভাতা হিসাব করা হয়।
এ সবের পাশাপাশি কর্মচারীদের বেতনবৃদ্ধি স্থির করার জন্য ‘৩৪৯০ ক্যালোরি’ সূত্র মেনে চলার প্রস্তাব দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলি। সরকার এই সুপারিশ মেনে নিলে কর্মচারীদের বেতনবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে এই সূত্র। কী এই ‘৩৪৯০ ক্যালোরি’ সূত্র, যা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, আগে বেতনবৃদ্ধির ক্ষেত্রে শুধু মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর দেখা হত। কিন্তু এ বার কর্মচারী সংগঠনগুলি দাবি তুলেছে যে, একটি পরিবারের পুষ্টি ও বেঁচে থাকার প্রকৃত খরচের উপর ভিত্তি করে বেতন নির্ধারণ করা হোক।
ভারতের জাতীয় পুষ্টি নিয়ামক সংস্থা বা এনআইএন ও ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর মেডিক্যাল বা আইসিএমআরের সাম্প্রতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, এক জন প্রাপ্তবয়স্ক কঠোর পরিশ্রমী মানুষের সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকার জন্য দৈনিক ৩৪৭০ থেকে ৩৪৯০ কিলোক্যালোরি শক্তির প্রয়োজন হয়। কর্মচারী ইউনিয়নগুলির দাবি, বেশির ভাগ সরকারি চাকরিরত কর্মীকেই দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে যাতায়াত এবং মানসিক চাপ। তাই বেতন নির্ধারণে কঠোর পরিশ্রমী বিভাগের আওতায় ফেলা উচিত কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের।
কর্মচারী সংগঠনগুলি যুক্তি হল, যদি এই নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি সরকারের তরফে গুরুত্ব দেওয়া না হয় এবং সরকার যদি সেই পুরনো ২৭০০ ক্যালোরির সূত্র বা কম ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ব্যবহার করা জারি রাখে, তবে ক্রমবর্ধমান বাজারমূল্যের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবেন না কর্মচারীরা। তাঁদের প্রকৃত আয় কমে যাবে। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে বেতন বাড়লেও, আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় তা আসলে কমে যাওয়ার শামিল হবে।
পুরনো অ্যাকরয়েড ফর্মুলায় পরিবারে মাত্র তিন জন সদস্য (স্বামী, স্ত্রী এবং একটি সন্তান) ধরা হত। কিন্তু ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় বৃদ্ধ বাবা-মা এবং দুই সন্তানের দায়িত্ব প্রায় প্রতিটি কর্মীর উপরই থাকে। তাই ৬ জনের হিসাব ছাড়া প্রকৃত খরচ বার করা অসম্ভব বলে মনে করছে কর্মচারী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ন্যাশনাল কাউন্সিল জয়েন্ট কনসালটেটিভ মেশিনারি বা জেসিএম।
সরকার এবং কর্মচারী সংগঠনগুলির মধ্যে আলোচনার জন্য কেন্দ্রের বিশেষ প্ল্যাটফর্মটির নাম ন্যাশনাল কাউন্সিল (জয়েন্ট কনসালটেটিভ মেশিনারি) বা এনসি-জেসিএম। কমিশনের কাছে কর্মচারীদের ন্যূনতম মূল বেতন (বেসিক পে) ৬৯,০০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে এনসি-জেসিএম। আর তাই স্মারকলিপিতে ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’ ৩.৮৩ শতাংশ রাখার সুপারিশ খসড়া কমিটিকে করতে দেখা গিয়েছে।
জেসিএমের মতে, পূর্ববর্তী বেতন কমিশনগুলিতে ২৭০০ ক্যালোরির উপর ভিত্তি করে বেতনকাঠামো পরিবর্তিত হত। ওয়ালেস অ্যাকরয়েডের সেই সূত্রটি সেকেলে হয়ে গিয়েছে। এখন পরিবারের পরিধি বেড়েছে। আগের সূত্রে শুধু বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম চাল-ডালের হিসাব ছিল। কিন্তু বর্তমান যুগে সুস্থ ভাবে কাজ করার জন্য প্রোটিন, ভিটামিন (দুধ, ফল, সব্জি) এবং উন্নত চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ অপরিহার্য। এই সমস্ত হিসাব আগের সূত্রে অনুপস্থিত।
পূর্ববর্তী বেতন কমিশন যে অন্যান্য নিয়ম মেনে চলত তার পাশাপাশি এ বার পরিবারের মাসিক পুষ্টি ও খাদ্যের প্রয়োজনীয়তাকে নির্ণায়ক হিসাবে ধরার দাবি উঠেছে। কর্মচারী সংগঠনগুলির যুক্তি, পুরনো নিয়মে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার প্রকৃত খরচ প্রতিফলিত হচ্ছে না। আর এই কারণেই ৩৪৯০ ক্যালোরির ফর্মুলাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত সরকারের। কর্মচারী সংগঠনগুলির দাবি, জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে এবং কর্মীদের কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে এই নতুন বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতিটি গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই।
সাধারণ মূল্যসূচক যে ভাবে হিসাব করা হয়, বাস্তব ক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম তার চেয়ে বহু গুণ গতিতে বাড়ে। এই ক্যালোরি ও খাদ্যসামগ্রীর বাজারমূল্যের উপর ভিত্তি করে অল ইন্ডিয়া এনপিএস এমপ্লয়িজ় ফেডারেশন এবং এনসি জেসিএম একটি হিসাবের সুপারিশ করেছে।
সেই হিসাব অনুযায়ী দেখা গিয়েছে বর্তমান বাজারে ৫ জনের পরিবারের শুধু ন্যূনতম খাবার ও পুষ্টির জন্য প্রতি মাসে বিপুল খরচ হচ্ছে। এর সঙ্গে শিক্ষা ও চিকিৎসা যোগ করলে ন্যূনতম বেসিক পে বর্তমানের ১৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ৫০,০০০ থেকে ৬৯,০০০ টাকা করা উচিত।
ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ জয়েন্ট কনসালটেটিভ মেশিনারির শীর্ষকর্তাদের মতে, সপ্তম বেতন কমিশনের পর কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের বেতনের ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ২.৫৭ স্থির করা হয়। অষ্টম বেতন কমিশনে এটিকে বাড়িয়েই ২.৮৬ করার চিন্তাভাবনা চলছে। সেই অনুমান মিলে গেলে সব মিলিয়ে ২৯ বেসিস পয়েন্ট বৃদ্ধি পাবে ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর।
সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের প্রতি মাসের ন্যূনতম মূল বেতন বেড়ে দাঁড়াবে ৫১৪৮০ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হবে মহার্ঘ ভাতা (ডিয়ারনেস অ্যালাউন্স বা ডিএ) এবং বাড়িভাড়া ভাতা (হাউস রেন্ট অ্যালাউন্স বা এইচআরএ)-সহ আনুষঙ্গিক আরও কিছু আর্থিক সুযোগ-সুবিধা। ফলে এক জন চতুর্থ শ্রেণির (গ্রুপ ডি) কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীর ন্যূনতম বেতন ৬০ হাজার টাকা ছাড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সপ্তম বেতন কমিশনে ন্যূনতম মূল বেতন ১৮,০০০ টাকা করা হয়। সর্বোচ্চ বেসিক পে ২.৫ লক্ষ টাকা ধার্য করে সরকার। ১০ বছর আগে এর ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ২.৫৭ রেখেছিলেন কমিশনের কর্তা-ব্যক্তিরা।
এনসি-জেসিএমের খসড়া কমিটির স্মারকলিপিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বছরে ছ’শতাংশ করে বেতনবৃদ্ধির সুপারিশ করেছে তারা। এটি বর্তমান হারের চেয়ে অনেকটাই বেশি। মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এই ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ন্যাশনাল কাউন্সিল জয়েন্ট কনসালটেটিভ মেশিনারি।