Mad Honey

মধুর ছদ্মবেশে মারাত্মক বিষ, বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক মধু ‘ম্যাড হানি’ ঘায়েল করেছিল গোটা সৈন্যদলকেও!

‘পাগলা মধু’ বা ‘ম্যাড হানি’র রাসায়নিক নাম গ্রায়ানোটক্সিন। নামের মধ্যেই উল্লেখ রয়েছে বিষের। পৃথিবীতে মাত্র দু’জায়গায় পাওয়া যায় এই অদ্ভুত মধু।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৪৩
Share:
০১ ১৬

মাত্র এক চামচ। তার বেশি এই মধু শরীরে প্রবেশ করলে দেখা দিতে পারে পাগলামি। স্নায়ু অবশ হয়ে প্রাণসংশয় হতে পারে যে কোনও মানুষের। মধু হলেও তা আদতে গরল। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক মধু। গাঢ়, লালচে মধু দেখে লোভ সামলাতে না পারলে প্রাণসংশয় হতে পারে।

০২ ১৬

নেপালের হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ের ৩ হাজার মিটার উঁচুতে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত রহস্য। তা হল ‘ম্যাড হানি’ বা ‘পাগলা মধু’। এই মধু সাধারণ কোনও খাবার নয়। এটি একটি নেশাজাতীয় দ্রব্য এবং ভুল মাত্রায় খেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে!

Advertisement
০৩ ১৬

এই মধুতে মিশে রয়েছে এক বিষাক্ত উপাদান। ‘ম্যাড হানি’র রাসায়নিক নাম গ্রায়ানোটক্সিন। নামের মধ্যেই উল্লেখ রয়েছে বিষের। মানুষ এবং অন্যান্য কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে গ্রায়ানোটক্সিন কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রভাব বিস্তার করে। রক্তচাপ কমিয়ে দেয়। হৃৎস্পন্দনেও অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

০৪ ১৬

এই মধুর মাধ্যমে শরীরে গ্রায়ানোটক্সিন প্রবেশ করলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। মাথা ঘোরা এবং শ্বাসকষ্ট অনুভূত হয়। কিছু ক্ষেত্রে রক্তচাপ বিপজ্জনক ভাবে হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে বমি বমি ভাব, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, পেশিতে পক্ষাঘাত এবং চেতনা হারানোর মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

০৫ ১৬

পৃথিবীর মাত্র দু’জায়গায় পাওয়া যায় এই অদ্ভুত মধু। একটি তুরস্কের কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে, অন্যটি হল নেপালের হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে। ‘ম্যাড হানি’ চেনার উপায় হল এর রং ও তীক্ষ্ণ সুগন্ধ। স্বাদ কিছুটা মেটে। গলায় ঢাললে মধুর মিষ্টতা ছাড়িয়ে একটি তিক্ত স্বাদ নেমে আসে।

০৬ ১৬

তুরস্কের আঞ্চলিক ভাষায় এই মধুকে ডাকা হয় ‘দেলি বাল’ নামে। ‘দেলি’ কথার অর্থ করলে দাঁড়ায় পাগল ও ‘বাল’ শব্দের অর্থ মধু। যাঁরা এই মধু মাত্রাতিরিক্ত খেয়েছেন তাঁদের মধ্যে পাগলামির লক্ষণ দেখা গিয়েছে।

০৭ ১৬

প্রধানত রডোডেনড্রন ফুলের মধুতেই থাকে এই উপাদান। তবে এরিকেসি গ্রুপের অন্যান্য গাছের মধুতেও পাওয়া যায় এই ধরনের বিষাক্ত উপাদান, যাকে বলে গ্রায়ানোটক্সিন পয়জনিং বা রডোডেনড্রন পয়জ়নিং। মূলত যে সব পাহাড়ি জায়গায় রডোডেনড্রন ফুলের প্রাচুর্য আছে, সে সব জায়গায় ‘ম্যাড হানি’ উৎপন্ন হয়।

০৮ ১৬

মার্কিন উদ্ভিদবিদ আসা গ্রে জাপানের লিউকোথোয়ি গ্রায়ানা নামের একটি গাছের নাম থেকে এই মধুর নাম দেন গ্রায়ানোটক্সিন। গ্রায়ানোটক্সিনের রাসায়নিক বিন্যাসের উপর ভিত্তি করে গ্রায়ানোটক্সিনকে অ্যাড্রোমেডটক্সিন, অ্যাসিটাইলল্যান্ড্রমেডল, রোডোটক্সিন এবং অ্যাসিবোটক্সিন— নানান ভাগে ভাগ করা যায়।

০৯ ১৬

ইতিহাস বলছে, আস্ত এক সেনাবাহিনীকে ঘায়েল করে দিয়েছিল এই মধুরূপী গরল। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে, কৃষ্ণ সাগরের উপকূলে ট্র্যাবজ়নের কাছে যুদ্ধ করতে যান গ্রীক যোদ্ধা জ়েনোফোন। সেই যুদ্ধ করতে গিয়ে তাঁর সৈন্যরা মাত্রাতিরিক্ত মধু পান করে নাস্তানাবুদ হয়ে গিয়েছিলেন। সেই মধু খেয়ে অনেকেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছিলেন না।

১০ ১৬

যাঁরা অল্প পরিমাণে খেয়েছিলেন, তাঁরাও মত্ত হয়ে বেসামাল হয়ে পড়েছিলেন। সৈন্যদের মধ্যে যাঁরা লোভ সামলাতে না পেরে প্রচুর পরিমাণে মধু গলাধঃকরণ করে ফেলেছিলেন, তাঁদের মধ্যে পাগলামির লক্ষণ দেখা দেয়। অনেকে মৃতবৎ অবস্থায় পড়ে ছিলেন মাটিতে।

১১ ১৬

একসময় শত্রুবাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে ব্যবহার করা হত এই মধু। এক বার শত্রুপক্ষকে খাইয়ে দিতে পারলেই কেল্লাফতে! গোটা বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ত। সহজ উপায়ে যুদ্ধজয়ের পরিকল্পনা সফল হত অন্য পক্ষের। ৬৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তৃতীয় মিথ্রিডাটিক যুদ্ধের সময় রাজা মিথ্রিডেটস গ্রিক উদ্ভিদবিদ কেটুয়াসের পরামর্শে রোমান সৈন্যদের পথে ‘পাগলা মধু’র পাত্র রাখতে বলেছিলেন। মধু খেয়ে রোমান সৈন্যেরা ‘পাগলা মধু’র নেশায় অচেতন হয়ে পড়েন এবং তাঁদের হত্যা করা হয়।

১২ ১৬

নেপালের গুরুঙ্গ উপজাতির অন্যতম পেশা হল পাহাড়ের খাঁজ থেকে এই মধু সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা। চিকিৎসাজগতে ড্রাগ হিসাবে ব্যবহৃত হয় এই গ্রায়ানোটক্সিন। স্থানীয় মানুষজনের মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অল্প পরিমাণে ‘ম্যাড হানি’কে ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করার চল রয়েছে। অনেকে আবার এই মধুর মাধ্যমে নেশাও করে থাকেন।

১৩ ১৬

পাহাড়ের ঢালে চাক চাক মধু তৈরি করেন মধুকরেরা। নেপালের গুরুঙ্গ উপজাতির মানুষেরা মধু সংগ্রহের জন্য সারা শরীরে মোটা চট বেঁধে পাহাড়ে চড়েন মধু সংগ্রহ করতে। নেপালের বাসিন্দারা বছরে দু’বার মধু সংগ্রহ করে থাকেন। বসন্ত এবং শরতের শেষাশেষি। মধু সংগ্রহকারীরা মৌচাকের নাগাল পাওয়ার জন্য কাঠের দড়ির সিঁড়ি ব্যবহার করেন মৌমাছিদের ধোঁয়া দিয়ে তাড়ানোর জন্য নীচে আগুন জ্বালানো হয়।

১৪ ১৬

তুরস্কের অনেক বাসিন্দাই এই ‘দেলি বাল’ চাষ করে থাকেন বাণিজ্যিক ভাবেও। জীবনকে বাজি রেখে হাতে বানানো মই বেয়ে চড়েন পাহাড়ের মাথায়। তার পর তা বিক্রি করেন স্থানীয় বাজারে। নেশার বস্তু হিসাবে মারাত্মক চাহিদা এই মধুর।

১৫ ১৬

মৌমাছিরা প্রায় ২০ দিনের মধ্যে একটি মৌচাক পূর্ণ করে ফেলতে পারে। তুরস্কের মৌমাছি পালনকারীদের মতে, মধু যত বেশি সময় মৌচাকে থাকে, তার গুণমান তত বেশি হয়। গুণমান ‘প্রোমিল’-এর মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। প্রোমিল বলতে মধুর ঘনত্বকে বোঝায়। প্রোমিলের মান যত বেশি, গুণমান তত উৎকৃষ্ট।

১৬ ১৬

তবে এই মধু নির্দিষ্ট মাত্রায় খেয়ে সাধারণত কেউ মারা যান না। মধু খাওয়ার তাৎক্ষণিক ফল হয় মারাত্মক। এর মধ্যে থাকে হ্যালুসিনোজেনিক উপাদানও। এর ফলে মারাত্মক ঝিম ধরা ভাব আসে। বিশ্বের দামি মধুগুলির মধ্যে অন্যতম এই মধু।

সব ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement